প্রভাত ফেরির গান হয়ে ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি’ বয়ে চলেছে অযুত থেকে অযুততর কন্ঠে। যার রূপকার হিসেবে অমরত্বের দাবিদার আলতাফ মাহমুদ। মহান এ সুর স্রষ্টার জন্মদিনে ফেসবুক স্ট্যাটাসে স্মরণ করেছেন শাওন মাহমুদ ও মোস্তফা মাহমুদ।
তারা ফেসবুক স্ট্যাটাসে লিখেছেনঃ “আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি
আমি কি ভুলিতে পারি।”
মহান একুশের গান। একটি জাতিসত্তার সঞ্জীবনী শক্তি।
আর এই শক্তির ভিত্তি গড়বেন বলে একজন জন্ম নিয়েছিলেন এই বাংলায়। তিনি আলতাফ মাহমুদ।
একজন ক্ষণজন্মা-প্রবাদ পুরুষ, মহান সুর সৈনিক।
কী আশ্চর্য অমোঘতায় সঙ্গীতের প্রতি আজন্ম ভালোবাসা, দেশের প্রতি, মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকে মাত্র বিশ বছর বয়সেই সৃষ্টি করলেন পৃথিবীর শ্রেষ্ট শ্রদ্ধাঞ্জলির গান-আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি।।
যে গানের সুর বাঙালীকে উদ্বুদ্ধ করে মুক্তির সংগ্রামে, আন্দোলিত করে, অনাদি ভবিষ্যৎতেও বাঙালীকে উদ্বুদ্ধ করবে।
একুশের সর্বজনীনতা প্রতিষ্ঠার জন্য যে প্রতীকের প্রয়োজন ছিল তার একটা জোগান দিল শহীদ মিনার আর একটি- ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো’ সংগীত,
প্রভাত ফেরির গান হয়ে যা বয়ে চলেছে অযুত থেকে অযুততর কন্ঠে, যার রূপকার হিসেবে অমরত্বের দাবিদার হলেন আলতাফ মাহমুদ।
ইতিহাস সেই রাজটিকা এঁকে দিয়েছে আলতাফ মাহমুদের কপালে, মুছে ফেলার সাধ্য নেই কোনো বর্বর শক্তির, তিনি নজরুল-নন্দিত সেই বিদ্রোহী বীর, চির উন্নত যাঁর শির।
আলতাফ মাহমুদের জন্ম ১৯৩৩ সালে।
বরিশালের মুলাদি উপজেলার পাতারচর নামক গ্রামে।
গানের সাথে সখ্য শৈশব থেকেই।
বরিশাল জেলা স্কুলের ছাত্র থাকা অবস্থায়
ছবি আঁকা ও গান গাওয়া এই দুই শিল্পসাধনায় আপন মগ্নতার পরিচয় রাখেন বরিশালের সাংস্কৃতিক আবহে।
ছবি আঁকা আর গান গাওয়ার পাশাপাশি বেহালা খুব ভালো বাজাতে পারতেন। বাঁশি বাজাতেন সুমধুর, তবলাতেও হাত ছিল বেশ। অভিনয়ও করেছেন কখনো কখনো।
কিন্তু পাঠ্যপুস্তকের পড়ায় মন ছিলনা অতটা। পিতা নাজেম আলী হাওলাদার চেয়েছিলেন ছেলে আর কিছু না হোক অন্তত মেট্রিকুলেশনটা যেন খুব ভালোভাবে পাশ করে, লেটারসহ প্রথম বিভাগে।
যথারীতি ১৯৪৮ সালে কোলকাতা বোর্ডের অধীনে ম্যাট্রিক পরীক্ষার ফলাফল যেদিন প্রকাশ হলো, দেখা গেলে পিতার আশানুরুপ ফলাফল নিয়ে ছেলে পাশ করেনি।
হতাশ বাবা বিকেলের পর থেকে রাগে ঝড় তুলেছেন বাড়িতে। এই শুনে আলতাফ মাহমুদ ভয়ে বাড়িতে যাননি।
সন্ধ্যার পর থেকে শুরু হয় ছেলের খোঁজ।
দিশেহারা বাবা চারিদিকে ছেলের খোঁজ করতে লোক লাগালেন। অনেক খোঁজাখুঁজির পর অবশেষে রাত ৯ টার দিকে আলতাফ মাহমুদকে পাওয়া গেলো বরিশাল সদর বেলপার্কের কাছে কীর্তনখোলা নদীতীরের রাস্তার পাশে এক বেঞ্চিতে বসে দরাজ গলায় গাইছেন_ সায়গলের গাওয়া একটি বিখ্যাত গজল -দুনিয়া মে হু দুনিয়াকী তলবগার নহি হু বাজার সে গুজরা হুয়া থরিদ্দার নহি হু ‘ সঙ্গে তাঁর এক বন্ধু।”
যে জীবন গানের, সংগ্রামের_তাকে কি করে আটকানো যায়। সাধ্য নেই কারো। মাত্র ৩৮ বছর জীবনের ইতিহাস, পনেরো বছর বয়সে প্রথম আন্দোলন।
১৯৪৮ সালের পরে তিনি গণসঙ্গীতের প্রতি ঝুঁকে পড়েন।
তারপর তো শুরু।
যে গানের ভাষা মানুষের স্বাধিকার আন্দোলনের কথা, অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের কথা, মানুষের কথা বলত সেই গান আর গানের ভাষাই কন্ঠে তুলে নিলেন তিনি।
গ্রামে-গঞ্জে, মাঠে ময়দানে, নগরে-বন্দরে অসংখ্য জনসভা আর সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে গণসঙ্গীত পরিবেশন করে মানুষের চেতনাকে শাণিত করেছেন। চারনের মতো ঘুরে বেড়িয়েছেন মানুষকে জাগানোর জন্য।
এরকম কিছু গণসঙ্গীত-
১)হুনছনি ভাই দেখছনি, দেখছনি ভাই হুনছনি স্বাধীনতার নামে আজব দেইখছনি
২)স্বর্গে যাব গো স্বর্গে যাব গো।
৩)মোরা উজিরে নজিরে বাঁচায়ে রাখিতে চির উপবাসী হবে।
৪)মরি হায়রে হায় দুঃখ বলি কারে পাঁচশ টাকার বাগান খাইল পাঁচ সিকার ছাগলে।
৫)ম্যায় ভুখা হু অনাথ হামারা লাড়কা..
আরো কত কত গান।
বিষ্ময়ের অবধি থাকে না।
ষাটের দশকের শেষাশেষি কোন এক কাব্যগীতি আলেখ্যের আয়োজনে অনুষ্ঠিত অনুষ্ঠানে আলতাফ মাহমুদ গেয়েছিলেন-নজরুলের বিদ্রোহী-
“উঠিয়াছি চিরবিস্ময় আমি বিশ্ব বিধাত্রির।”
কখনো গেয়েছেন -আমি ভাই ক্ষ্যাপা বাউল।
বড় দরদ দিয়ে তিনি গাইতেন-
১)আমি মানুষের ভাই স্পার্টাকাস..
২)ঘুমের দেশের ঘুম ভাঙাতে ঘুমিয়ে গেলো যারা..
৩)ঢাকার শহর রক্তে ভাসাইলি..
৪)ধন্য আমি জন্মেছি মা গো তোমার ধূলিতে..
৫)বিচারপতি তোমার বিচার করবে যারা, আজ জেগেছে সেই জনতা..
৬)নওজোয়ান নওজোয়ান/বিশ্বে জেগেছে নওজোয়ান..
৭)নাকের বদলে নরুন পেলাম/তাক ডুমা ডুম ডুম..
৮)এসো মুক্ত করো এসো মুক্ত করো/অন্ধকারের এই গান..
৯)পথে এবার নামো সাথি/পথেই হবে পথ চেনা..
১০)ও আলার পথযাত্রী এ যে রাত্রি/এখানে থেমো না..
১১)কৃষ্ণকলি আমি তারেই বলি /কালো যারে বলে গাঁয়ের লোক..
আরো কত কত গান।
নাট্যব্যক্তিত্ব মঞ্চ কুসুম পরম শ্রদ্ধেয় শিমুল ইউসুফ তাঁর একটি লেখায় স্মৃতির পাতা খুলে বলেছেন-” এই তো সেদিন ভাইয়া-আমি তোমার হাত ধরে ৬৯ এর গণআন্দোলনে শহীদ মিনারে গান গাইতে গেছি। তুমি আমাকে ৭০-এর ভয়াল ঘূর্ণিঝড়ে ক্ষতিগ্রস্তদের ত্রানের জন্য বিক্ষুব্ধ শিল্পীসমাজের মিছিলে নিয়ে গিয়েছিলে। তোমার গলার সঙ্গে গলা মিলিয়ে সেই মিছিলে টাকা তুলেছি জনতার কাছ থেকে আর গান গেয়েছি ‘এ ঝঞ্ঝা মোরা রুখবো’ তোমার দেওয়া সুরের গণসঙ্গীত। এই তো সেদিন ৭১ এর ২১ ফেব্রুয়ারি, তোমার পায়ে পা মিলিয়ে তোমার সুর দেওয়া সে গান-আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারী_কন্ঠে তুলে, ভোরের ধূসর কুয়াশার ভিতর প্রভাতফেরিতে গিয়েছিলাম। পায়ে পায়ে এগিয়ে গেছি বাঙালীর আত্মপ্রত্যয়ের স্মৃতিবিজরিত সেই শহীদ মিনারে। “
ছবি: বাবা মায়ের সঙ্গে শাওন
সংগীতজীবনের গোড়া থেকেই, জীবনের পুরোটা সময় আলতাফ মাহমুদ অন্যায়ের প্রতিবাদ আর দেশের ডাকে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন।
তবে সকল কাজের মূল সূত্র ছিল সংগীত।
১৯৫০ সালের গোড়ার দিকের কোনো একটা সময় তিনি বরিশাল থেকে ঢাকায় এসেছিলেন। শুরু হয় জীবনের আর এক অধ্যায়।
আলতাফ মাহমুদকে একান্ত করে পায়নি কেউ, অথচ তিনি সবার জন্যই ছিলেন। পূূর্ববাংলার চলচ্চিত্রধারায় সংগীতের উচ্চমান রচিত হওয়ার পিছনে তাঁর অবদান অন্যতম।
এর পাশাপাশি ধারাবাহিকতায় তিনি কাজ করতে থাকেন দেশ ও মানুষের জন্য।
১৯৫৩ সালে কুমিল্লায় অনুষ্ঠিত সাহিত্য ও সংস্কৃতি সম্মেলনের সংগীত পরিচালনা, কাগমারী সম্মেলন থেকে রংপুরে অনুষ্ঠিত যুব সম্মেলন, একের পর এক গীতনাট্য, নৃত্যনাট্য জুড়ে তাঁর উপস্থিতি মানুষককে উদ্বেলিত করেছে। দরাজ গলায় পরিবেশিত গণসংগীত মানুষের মনকে নাড়িয়ে দিতে থাকে।
১৯৬৭ সালের অক্টোবরে মহান অক্টোবর বিপ্লবের পঞ্চাশ বছর পূর্তি উপলক্ষে পল্টন ময়দানে অনুষ্ঠিত দুদিনের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের সংগীত পরিচালনা করেছেন তিনি। ছায়ানটের এযাবৎকালের সার্থকতম নজরুল জয়ন্তীর অনুষ্ঠান আলতাফ মাহমুদের পরিচালনা, প্রযোজনায় অনুষ্ঠিত।
এভাবেই বাংলাদেশ পৌঁছে গিয়েছিল মুক্তিযুদ্ধে। শিশুকন্যা শাওন মাহমুদ ও স্ত্রী সারা আরা মাহমুদকে নিয়ে আলতাফ মাহমুদের সংসার তখন ৩৭০, আউটার সার্কুলার রোডে।
ছোট্ট সংসার হলেও পরিবারটি বৃহৎ, সারা মাহমুদের ভাইবোন ও মা আলতাফ মাহমুদের আপন ভাইবোন ও মায়ের মতো মিশে ছিলেন সেই জীবনে। সবাই মিলে প্রত্যক্ষ করলেন ২৫ মার্চের কালরাত্রির ভয়াবহতা, রাজারবাগ পুলিশ লাইনের অসামান্য প্রতিরোধ এবং পাকিস্তানি বাহিনীর অপরিমেয় নিষ্ঠুরতা।
এই পটভূমিতে এটা অনিবার্য ছিল যে, মুক্তিযুদ্ধে আলতাফ মাহমুদ সম্পৃক্ত হয়ে যাবেন।
এবার শুধু সঙ্গীত নয়, সক্রিয় যুদ্ধে তিনি হাজির হলেন। আত্মবিলাপী বিনম্রতায় ভিতরে ভিতরে তিনি কাজ করতে শুরু করেন একটি স্বাধীন স্বদেশ, স্বাধীনতার জন্য। সাম্যবাদী ধ্যানধারণা যা আলতাফ মাহমুদের রক্তের মধ্যে মিশে ছিলো তাই তিনি সমাজ বিপ্লব ও স্বাধীনতার ডাকে জীবন উৎসর্গ করতে পিছপা হননি।
কেউ জানতো না-পাহাড়সম দৃঢ়তা নিয়ে মানুষটি ভিতরে ভিতরে স্বাধীনতার জন্য কাজ করে যাচ্ছেন।
ক্রমে আলতাফ মাহমুদের বাড়িটা একাত্তরের দূর্গ বাড়ি হয়ে ওঠে। সেখানে ঢাকা শহরের একাধিক ছোট ছোট গেরিলা গ্রুপের যোদ্ধারা এসে জড়ো হতেন। তাঁরা এখানে বসে এ্যাকশনের আগে-পরে অনেককিছুই আলাপ করে নিতেন। ধীর স্থির আলতাফ মাহমুদ ছিলেন ঐ কেন্দ্রের প্রাণ। সমুদ্রের মৌন নিয়ে তিনি কাজ করে যাচ্ছিলেন।
যুদ্ধের ভয়াবহতার মধ্যেই যে মুক্তিযুদ্ধের গান লেখা হচ্ছে গাওয়া হচ্ছে-এটা সকলকে জানানো প্রয়োজন ছিল। তাই তিনি প্রকান্ড বধ্যভূমিতে সমগ্র অস্তিত্ব দিয়ে মৃত্যুর সঙ্গে যুদ্ধ করেন- গলায় গান, হাতে অস্ত্র।
তখন স্বাধীন বাঙলা বেতার কেন্দ্র ভালোভাবে চলছিল। রোজ প্রায় একই গান বাজাত। আলতাফ মাহমুদ এ কারণেও নতুন গানের প্রয়োজন অনুভব করতেন।
দূর্গ বাড়িটার জানালা দরজা বন্ধ করে ঘরের মধ্যই গান লিখতেন আবদুল লতিফ, সুর দিতেন আলতাফ মাহমুদ। রেকর্ড শেষে গানের পাতা ছিঁড়ে ফেলা হতো। মাঝে মাঝে গানও লিখতেন তিনি কিন্তু গলা খুলে গাইতে পারতেন না।
এভাবেই চলছিল সব।
কিছু কিছু গান তিনি দুবার রেকর্ড করান। প্রথমদিকে আলতাফ মাহমুদের ১২ খানা গানের একটি স্পুল নিয়ে সীমান্ত অতিক্রম করার সময় একজন ধরা পড়লে তাঁর মৃত্যু হয়। সেই স্পুলটি আর পাওয়া যায় নি। জুলাইয়ের শেষের দিকে তিনি আবার অনেকগুলো গান রেকর্ড করে দুটো বড় স্পুল তিনি স্বাধীন বাঙলা বেতারকেন্দ্রের জন্য পাঠান।
আগস্টের প্রথম থেকে তিনি ঢাকার ক্র্যাক প্লাটুন-এর সঙ্গে পুরোপুরি যুক্ত হোন।
তারপর..
৩০ আগস্ট, ভোর ৫ টায় ট্রাকবোঝাই পাকিস্তানি সৈন্যদল এসে ঘেরাও করে আলতাফ মাহমুদের বাসা।
ধরে নিয়ে যায় আলতাফ মাহমুদকে।
এরপর..
আর খুঁজে পাওয়া যায়নি স্বাধীন বাংলাদেশের এক অকুতোভয় বীর সন্তানকে।
তবে তিনি আছেন, থাকবেন।
সুরে, বিপ্লবে..
সমাজমুক্তি ও স্বাধীনতার জন্য এমন সর্বৈব নিবেদিত প্রাণ বাংলাদেশ বিরল।
শুভ জন্মদিন হে মহান।
বিনম্র শ্রদ্ধা..







