‘বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী’ বাংলাদেশের বৃহত্তম সাংস্কৃতিক সংগঠন। শিল্পী-সাহিত্যিক-সাংবাদিক ও গণ-মানুষের অধিকার আদায়ের সংগ্রামের পথ-প্রদর্শক সত্যেন সেন স্বপ্ন দেখেছিলেন সাম্য আর অসাম্প্রদায়িক বাংলার। তিনি ছিলেন বিপ্লবী ও কৃষক আন্দোলনের সংগঠক। মানুষের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ন্যায় প্রতিষ্ঠার দাবিতে লড়াই সংগ্রামের মধ্য দিয়ে তিনি হয়ে ওঠেন সময়ের দর্পণ।
সত্যেন সেন ১৯০৭ সালের ২৮ মার্চ তারিখে বিক্রমপুর (বর্তমান মুন্সীগঞ্জ) জেলার টঙ্গীবাড়ী উপজেলার সোনারং গ্রামের সেন পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। ছোটোবেলায় তাঁর ডাক নাম ছিলো লস্কর। তাঁর পিতার নাম ধরনীমোহন সেন এবং মাতার নাম মৃণালিনী সেন। চার সন্তানের মধ্যে সত্যেন ছিলেন সর্বকনিষ্ঠ। সোনারং গ্রামের সেন পরিবার ছিলো শিক্ষা ও সংস্কৃতি চর্চার এক অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত। সত্যেন সেনের কাকা ক্ষিতিমোহন সেন ছিলেন বিশ্বভারতীর উপাচার্য।
তাঁর আরেক কাকা মনোমোহন সেন ছিলেন শিশু সাহিত্যিক। এই পারিবারিক পরিবেশের মধ্য থেকেই তিনি তাঁর মনোজগতের বিকাশ ভিত্তি রচনা করেন। তিনি ঠিক বুঝেছিলেন, মানুষের সত্যিকারের মুক্তি কখনোই সাংস্কৃতিক আন্দোলন ছাড়া সম্ভব নয়। ১৯৬৮ সালে রণেশ দাশগুপ্ত, শহীদুল্লাহ কায়সারসহ কয়েকজন তরুণের উদ্যোগে সত্যেন দা’র নেতৃত্বে পথ চলা শুরু করে বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী। চামেলিবাগে মহড়া চলে গণসঙ্গীতের, সভ্য হন শিল্পী সংগঠক এবং তাঁদের পরিবারের সদস্যরা। সেই থেকে শুরু গণসঙ্গীত দিয়ে গণ-মানুষকে অধিকার সচেতন করে তোলা এবং তা আদায়ের জন্য মানুষের ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের পথ নির্মাণ করা।
উদীচীর পরিচয় গণ-সঙ্গীতের সংগঠন হিসেবে; যদিও শিল্পকলার প্রতিটি মাধ্যমে সমান বিচরণ আছে এই সংগঠনের শিল্পীদের। উদীচী লোকসঙ্গীত উত্সব, নাট্যোত্সব, আবৃত্তি উত্সবসহ দেশব্যাপি নানা সাংস্কৃতিক আয়োজন করলেও ২০০৯ সালে শিল্পী-সংগ্রামী সত্যেন সেনের জন্মদিবসকে উপলক্ষ করে তাঁরই নামানুসারে শুরু হয় দেশের প্রথম গণ-সঙ্গীত উত্সব ও প্রতিযোগিতা— ‘সত্যেন সেন গণ-সঙ্গীত উত্সব’।

এই উত্সবের একটি বড় অংশ প্রতিযোগিতা। তবে সাধারণত প্রতিযোগিতা বলতে যা বোঝায়, সে অর্থে এই প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয় না। গণ-মানুষের সম্পৃক্ততায় গণ-সঙ্গীতের কথা, সুরে ও আদর্শে নিজেদের শাণিত করে তোলাই এ আয়োজনের লক্ষ্য। সাধারণত এই উত্সবে প্রগতিশীল গণচেতনাসম্পন্ন জাগরণমূলক গান, শ্রমিক-কৃষক-মেহনতি মানুষের দুঃখ-দুর্দশা এবং অধিকার সম্পন্ন সচেতনতামূলক গান, মুক্তিযুদ্ধের চেতনাসমৃদ্ধ গান, স্বাধীনতা সংগ্রামের গান, সমাজের অন্যায় অত্যাচার নিপীড়ন অবসানের দিক নির্দেশনামূলক গান, মৌলবাদ-সাম্প্রদায়িকতাবিরোধী গান, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির গান, যুদ্ধবিরোধী-স্বৈরাচারবিরোধী গান, বিশ্ব শান্তির পক্ষে গান, শোষণের বিরুদ্ধে গান, মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে গানগুলোকেই গণসঙ্গীত হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
এছাড়াও, প্রতি বছরের উত্সবে বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে আগ্রাসন ও সহিংসতার বিরুদ্ধে রচিত ও সুরারোপিত নতুন গণসঙ্গীতসমূহ বেশি গুরুত্ব পায়।
হয়তো প্রতিযোগিতার সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয় বা নানা সম্মানজনক অবস্থান তৈরি করা হয়; কিন্তু এটাই শেষ কথা নয়। সারাদেশের তৃণমূল পর্যায় থেকে আসা প্রতিটি অংশগ্রহণকারীর মাঝে শোষণমুক্ত সমাজ ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার বিকাশ ঘটানোই মুখ্য।
দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের নানা বয়সী শিল্পীরা এই প্রতিযোগিতা উপলক্ষে গণ-সঙ্গীত চর্চায় নিজেদের নিয়োজিত করেন। সত্যেন সেন গণ-সঙ্গীত উত্সবের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক দেশের প্রখ্যাত গণ-সঙ্গীত শিল্পী ও সংগঠনসমূহের মিলনমেলা। তাঁদের গান শোনার সুযোগও ঘটে এই অনুষ্ঠানের মাধ্যমে। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের বিশিষ্ট গণ-সঙ্গীত শিল্পীদের আমন্ত্রণ জানানো হয়। সঙ্গীতের মাধ্যমে ভাব ও আদর্শের বিনিময় সেতু তৈরি হয়।

২০০৯ সালে সত্যেন সেন গণ-সঙ্গীত উত্সবে অতিথি হিসেবে আসেন ভারতের বিখ্যাত গণ-সঙ্গীত শিল্পী অজিত পাণ্ডে। ২০১০ সালে এ উত্সবের অতিথি ছিলেন গণ-সঙ্গীত শিল্পী প্রতুল মুখোপাধ্যায়। ২০১১ সালে আসেন মৌসুমি ভৌমিক, যাঁর সাথে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক গবেষণার সম্পর্ক অনেকদিনের। ২০১২ সালে প্রখ্যাত শিল্পী, সঙ্গীত পরিচালক কল্যাণ সেন বরাটের নেতৃত্বে আসে ভারতের অন্যতম গণ-সঙ্গীতের দল ‘ক্যালকাটা কয়্যার’। ২০১৩ সাল ছিলো শাহাবাগ আন্দোলনের উত্তাল সময়। বিশিষ্ট লোকসঙ্গীত গবেষক শুভেন্দু মাইতির সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও ঐ সময়ে যুদ্ধাপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিতে গড়ে উঠা শাহাবাগ আন্দোলনকেই অধিক গুরুত্ব দিয়েছে উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী। ফলে ওই বছর সত্যেন সেন গণ-সঙ্গীত উত্সব আয়োজন করা হয়নি।
২০১৪ সালে শুভেন্দু মাইতি এসেছেন অতিথি শিল্পী হিসেবে। ২০১৫ সালে গণ-সঙ্গীত উত্সবের অতিথি শিল্পী ছিলেন শুভপ্রসাদ নন্দী মজুমদার এবং তাঁর কন্যা শিল্পী শবনম সুরিতা। এ বছর মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের মাধ্যমে মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মুখ সমরে অনুপ্রেরণা দেয়া ১০ জন কণ্ঠ সৈনিককে উদীচীর পক্ষ থেকে সম্মাননা জানানো হয়। ২০১৬ সালের উত্সবে উদীচী আমন্ত্রণে আসেন গণ-সঙ্গীত শিল্পী বিপুল চক্রবর্তী ও অনুশ্রী চক্রবর্তীকে। ২০১৭ সালের গণসঙ্গীত উত্সবের অতিথিশিল্পী ছিলেন পূরবী মুখোপাধ্যায় ও অমিতাভ মুখোপাধ্যায়। ২০১৮ সালের গণসঙ্গীত উত্সব আলোকিত করেছিলেন শিল্পী-সংগ্রামী বিমল দে।
বিদেশি অতিথিরা ছাড়াও প্রত্যেক বছর সর্বজন শ্রদ্ধেয় শিল্পী অজিত রায়, সুধীন দাশ, সন্জীদা খাতুন, শিমুল ইউসুফ, কামরুদ্দীন আবসার, স্বপন কুমার হালদার, গৌরাঙ্গ আদিত্যের মতো দেশের বরেণ্য শিল্পীরা সত্যেন সেন গণ-সঙ্গীত উত্সবের উদ্বোধক হিসেবে উপস্থিত থেকেছেন। এ বছর দশম সত্যেন সেন গণ-সঙ্গীত উত্সব ও উদীচীর একবিংশ জাতীয় সম্মেলনের উদ্বোধন করবেন বরেণ্য শিক্ষাবিদ অজয় রায়।
এবারের দশম সত্যেন সেন গণ-সঙ্গীত উত্সব ও জাতীয় সম্মেলনের স্লোগান নির্ধারণ করা হয়েছে— “সময়ের ভ্রান্তিতে টলো না, লড়াইটা কখনোই ভুলো না”।
সত্যেন সেন গণ-সঙ্গীত উত্সব দেশের শিল্পীদের, বিশেষত তরুণ শিল্পীদের গণ-সঙ্গীত চর্চায় উদ্বুদ্ধ করেছে। গণ-সঙ্গীতের প্রচার, প্রসার এবং একে একটি স্বতন্ত্র সঙ্গীতের ধারা হিসেবে প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যেই এই আয়োজন করে আসছে উদীচী। ফলে বর্তমানে আমরা সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে গণ-সঙ্গীতের প্রচার ও প্রসারে কিছু উদ্যোগ লক্ষ্য করছি।
যে অসাম্প্রদায়িক চেতনার সংগ্রামী আদর্শ আমাদের সামনে রেখে গেছেন সত্যেন সেন, রণেশ দাশগুপ্তের মতো মহত্প্রাণ মানুষেরা, সে আদর্শই উদীচীর পথচলার প্রেরণা।

শিল্পী-সংগ্রামী সত্যেন সেনের ১১২ তম জন্মবার্ষিকীতে তাঁরই নামে আয়োজিত দশম সত্যেন সেন গণ-সঙ্গীত উত্সব ও জাতীয় গণ-সঙ্গীত প্রতিযোগিতা এবং বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর একবিংশ কেন্দ্রীয় সম্মেলন শুরু হতে যাচ্ছে আজ থেকে। সংগ্রামের এই পথ ধরেই উদীচী অসাম্প্রদায়িক ও শোষণমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়ে লড়াই করে যাবে জয় উদীচী।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)







