রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র নিয়ে বিএনপির আন্দোলনের পেছনে গভীর ষড়যন্ত্র রয়েছে। এ বিদ্যুৎকেন্দ্র সুন্দরবনের কোনো ক্ষতি করবে না বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। শনিবার রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র নিয়ে গণভবনে সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা একথা বলেন।
এসময় প্রধানমন্ত্রী আরো বলেন, কোম্পানী থেকে বছরে সিএসআর ফান্ডে ৩০ কোটি টাকা জমা হবে, সেই টাকা সেখানকার দরিদ্র মানুষের জীবন মান উন্নয়নের ব্যয় করা হবে।
সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আরো বলেন, দেশের বিদ্যুৎ চাহিদা পূরণে সরকার বেশ কয়েকটি বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। এতদিন এসব নিয়ে অনেকে ভিত্তিহীন, মনগড়া অভিযোগ করে আসছিলো। এতদিন অন্তরালে থেকে ইন্ধন যোগালেও এবার বিএনপি নেত্রী সংবাদ সম্মেলনে সরাসরি বিরোধিতা করেছেন। আজকে তথ্য উপাত্ত উপস্থাপন করে প্রমাণ করে দেয়া হয়েছে বিদ্যুৎকেন্দ্র হলে সুন্দরবনের কোনো ক্ষতি হবে না।
অতীতের ইতিহাস টেনে বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ৯১ সালের পর বিএনপি ২ বার ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় তারা কতটুকু বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পেরেছে? ৯৬ সালে উৎপাদন হতো ১৬শ মেগাওয়াট। ৫ বছরের মধ্যে আওয়ামী লীগ সরকার ৪ হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত বিদ্যুৎ উৎপাদন করেছে। পরে আবার ক্ষমতায় এসে তারা কেবল খাম্বা বানিয়েছে আর লুটপাট করেছে। ২০০১ সালে এসে দেখা যায় বিদ্যুৎ উৎপাদন আরো কমে গেছে। পরে এক ভয়াবহ ঘটনার কথাতো আপনারা জানেনই। ২০০৬ সালে বিদ্যুতের দাবিতে কানসাটের আন্দোলনে ১৪ জন মানুষকে গুলি করে হত্যা করা হয়।
এর আগে কুইক রেন্টাল নিয়েও যথেষ্ট আলোচনা সমালোচনা হয়েছে বলেও উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ২০০৯ সালের পরে চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়। কুইক রেন্টাল নিয়ে বহু সমালোচনা হয়েছে। গত সাড়ে সাত বছরে ১৫ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হয়েছে। কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন এখন অবশ্য করণীয়। পরমাণু বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে। কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য প্রয়োজন সস্তা পরিবহন ব্যবস্থা। রামপাল, মাতারবাড়ি, খুলনা, মুন্সিগঞ্জে এসব বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। এসব প্রকল্পে বিদেশী বিনিয়োগও আসছে। এসব বিষয় নিয়ে যখন বেগম জিয়া যখন কথা বলেন, তখন মনে হয় মায়ের চেয়ে মাসীর দরদ বেশী।
আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর সুন্দরবন ইউনেস্কো স্বীকৃত আন্তর্জাতিক ঐতিহ্য নির্বাচিত হয়। সুন্দরবন থেকে ৬৫ কিলোমিটার দূরে রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র। আর সেখানে বাতাসের গতি সুন্দরবনের বিপরীত দিকে। তা না হলে আমরা বাতাস পেতাম না। আর ওই বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে যদি কোনো দূষিত পদার্থ বেরও হয় তাহলে সেটা বাতাসের গতির কারণে অন্যদিকে চলে যাবে। সুন্দরবনের দিকে যাবে না।
সুন্দরবনে ফসলী জমি নষ্ট হবে এবং ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় জীবন যাপন ব্যহত হবে এমন কথা বলেছেন বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। এর জবাবে তিনি বলেন, তিনি কখনো সেখানে যাননি। রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র এলাকার জমিকে বলা হয় নাল জমি, অনেক নিচু। পশুর নদী থেকে মাটি এনে সেখানকার নীচু জমি ভরাট করা হয়েছে। তাতেও হয়নি, বাইরে থেকে মাটি আনতে হয়েছে। যারা মাছ ধরতো তারা ওই জমি ব্যবহার করতো। সেখানে যাদের বসতি তাদের পুনর্বাসন করা হয়েছে। নীচু জমি ভরাট করে ভূমি উত্তোলন করা হয়েছে। পশুর নদীর পানি লবণমুক্ত করে ব্যবহার করা হবে। ২০০০ ভাগের এক ভাগ পানি ব্যবহার করা হবে। নদীর নাব্যতা ঠিক রাখতে নিয়মিত ড্রেজিং করতে হবে। ফলে নদীতে আরো বাড়বে পানির প্রবাহ। বিষাক্ত বর্জ্য ওই নদীতে ফেলা হবে না।
সুন্দরবন এলাকায় শব্দ বা আলো দূষণ সম্পর্কে বাংলাদেশ সজাগ। কয়লা বহন করতে ব্যবহৃত হবে ঢাকনাযুক্ত ইঞ্জিন। সেখানে শব্দ দূষণ হবে না। যেখান দিয়ে কয়লা পরিবহন করা হবে সেখান থেকে ১৪ কিলোমিটার দূরে সুন্দরবনে শব্দ যাবে কীভাবে প্রশ্ন প্রধানমন্ত্রীর।
আমেরিকার ৪০ শতাংশ বিদ্যুৎ কয়লাভিত্তিক। বিদ্যুতের দাম ধরা হয় পাওয়ার প্লানের জ্বালানীর দাম কত তার ভিত্তিতে। কয়লার দামের ভিত্তিতে রামপালের বিদ্যুতের দাম। ৭০ শতাংশ ঋণের ব্যাংক গ্যারান্টার হবে বাংলাদেশ। এটা নিয়েও ভুল ব্যাখ্যা করা হচ্ছে। একটা ব্যক্তিগত ঋণ নিতেও গ্যারান্টার লাগে। যেহেতু স্থাপনা বাংলাদেশে তাহলে কেন ভারত গ্যারান্টার হবে।
বিদ্যুৎকেন্দ্র তৈরি হলে ওই এলাকার মানুষের জীবনমান আরো বিপন্ন হবে বলে মনে করছেন অনেকে। এই প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিদ্যুৎ হলে এই অঞ্চলে কর্মসংস্থান হবে। ওই অঞ্চলের মানুষ গাছ কাটতে যেয়ে বাঘের পেটে যায়। বিদ্যুৎকেন্দ্রের কর্মযজ্ঞে তারা জীবন জীবিকা খুঁজে পাবে। কোম্পানি থেকে ৩০ কোটি টাকা বছরে সিএসআর ফান্ড হিসেবে জমা হবে।
এটা বিশ্বের সবচেয়ে আধুনিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। সবচেয়ে গুণগত মান সম্পন্ন কয়লা অস্ট্রেলিয়া, আফ্রিকা থেকে আমদানি করা হবে। রামপালের ছাই সিমেন্ট কারখানায় ব্যবহৃত হবে। ২৭৫ মিটার চিমনি ব্যবহৃত হবে। এই চিমনি থেকে বের হওয়া ধোঁয়া থেকে কার্বন তৈরি করা যাবে। আধুনিক ফেসিয়াল মাস্কেওতো কার্বন ব্যবহৃত হয়। সেটা মুখ পরিষ্কারেও কাজে আসে।
পরিবেশ ও প্রতিবেশ এর ক্ষতি হয় বলে যারা অভিযোগ করেন তাদের বড়পুকুরিয়া দেখে আসার পরামর্শ প্রধানমন্ত্রীর। ঘনবসতি জায়গায় দিনাজপুরে ৩ ফসলি জমিতে ফসল ঠিকই হচ্ছে। আম গাছ আছে, সেখানে ভালো আমও হচ্ছে। ফুলবাড়িতে ওপেন বিট কয়লা খনি করতে যাওয়া হয়েছিলো সেখানে মানুষের ওপর গুলি চালিয়েছিলো বিএনপি সরকার।
সাব ক্রিটিক্যাল প্লান্ট ব্যবহার করলেও সেখানে জনজীবনে প্রভাব পড়েনি। যেকোনো ক্ষেত্রে পোকামাকড় দূর করতে ছাই ছিটানো হয়। ধানের খড় পোড়ানো হয় এবং সেটাকে সার হিসেবে ব্যবহার করা হয়। বিদ্যুৎকেন্দ্রে উৎপাদিত ছাই সঠিক উপায়ে অন্য জায়গায় নিয়ে যাওয়া হবে এবং ব্যবহার হবে নানান কাজে।
তার উপর বিশ্বাস রাখার দাবি করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, পরিবেশের নূন্যতম ক্ষতি হলে রামপালে বিদ্যুৎ কেন্দ্র করা হতো না। যুক্তরাষ্ট্র, ভিয়েতনাম, তাইওয়ান, জার্মানিতে জনবহুল এলাকায় বিদ্যুৎ কেন্দ্র করা হয়েছে।
এরপর মজার ছলে প্রধানমন্ত্রী হুমকি দেন, আরো কথা হলে সব বিদ্যুৎ কেন্দ্র বন্ধ করে দিব। তখন কুপি জালিয়ে বসে থাকবেন।
দেশে বরাবর সবুজায়নে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সুন্দরবনে শুধু নয় দেশের দক্ষিণাঞ্চলে সবুজ বেষ্টনী তৈরি করা হচ্ছে। কক্সবাজারের ঝাউবন বঙ্গবন্ধুর নির্শেনায় তৈরি করা হয়। যার কারণে বার বার জলোচ্ছাস থেকে কক্সবাজার রক্ষা পায়।
পায়রা বন্দর নির্মাণের সঙ্গে সঙ্গে কৃত্রিম ম্যানগ্রোভ তৈরির কাজ শুরু হয়েছে। পুরো বাংলাদেশেই সবুজ বেষ্টনী হচ্ছে। বাংলাদেশে সবুজ এলাকা বাড়ছে। বনায়ন রক্ষাই আমাদের প্রধান উদ্দেশ্য। সরকার বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে আইন করেছে। জীববৈচিত্র্য রক্ষায় সংবিধানে পরিবর্তন আনা হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে পরিবেশ রক্ষায় এ্যাকশন প্লান হয়েছে, এক হাজার কোটি টাকা বাজেট রাখা হয়েছে। পরিবেশ সংরক্ষণে সরকার সবসময় সচেতন।








