শনিবার সকালে রাজধানীর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে ম্যাজিস্ট্রেট রবীন্দ্র চাকমা যখন প্রয়াত শিল্পী মুক্তিযোদ্ধা লাকী আখান্দকে গার্ড অব অনারে নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন, তখন দূরের পাহাড়ি জনপদে একটি মৃত্যুর ঘটনায় প্রতিবাদ জানাচ্ছিলেন চাকমারা। সেই প্রতিবাদ-বিক্ষোভের খবর আমরা খুব কম জেনেছি। যেমন যে ঘটনায় চাকমাসহ অন্য পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর এ প্রতিবাদ সেই ঘটনার খবরও ছেলেটির মৃত্যুর আগে আমাদের প্রায় অজানাই ছিল। গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, এইচএসসি পরিক্ষার্থী রমেল চাকমার মৃত্যুর জন্য তার উপর সেনা সদস্যদের নির্যাতনের অভিযোগ এনেছে তার পরিবার এবং রমেল যে সংগঠনের সঙ্গে জড়িত ছিল সেই পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ। দেশী-বিদেশী সংবাদ মাধ্যম যখন এ বিষয়ে আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর)-এর বক্তব্য জানতে চেয়েছে তখন তারা বলেছে: ‘গত ৫ এপ্রিল তাকে ট্রাক পোড়ানো এবং বাস লুটের মামলায় সেনা সদস্যরা আটক করে। ওই দিনই তাকে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়৷ এরপর পুলিশের তত্ত্বাবধানে রমেল ১৪ দিন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন৷ চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১৯ এপ্রিল তিনি মারা যান৷ সেনাবাহিনীর নির্যাতনে তিনি মারা গেছেন বলে যে অভিযোগ করা হচ্ছে তা সঠিক নয়, সত্য নয়৷’ রাঙামাটির নানিয়ারচর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আব্দুল লতিফ অবশ্য দাবি করেন: ‘আমরা রমেলকে আটক করিনি এবং হাসপাতালেও ভর্তি করিনি৷ আমরা পাঁচলাইশ থানা পুলিশের দেয়া তথ্যের ভিত্তিতে ১৯ এপ্রিল চট্টগ্রামে গিয়ে লাশের সুরতহাল ও ময়না তদন্তের পর লাশটি গ্রহণ করি৷ চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল সিএমপির পাঁচলাইশ থানা এলাকায়৷ কিন্তু রমেল চাকমার বাড়ি নানিয়ারচরে হওয়ায় লাশ আমাদের নানিয়ারচরে নিয়ে আসতে হয়েছে৷’পাহাড়ি ছাত্র পরিষদের কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক অনিল চাকমার অভিযোগ: ‘রমেলের বাবা শান্তি চাকমাসহ তার পরিবারের লোকজন এই ঘটনায় হত্যা মামলা দায়ের করতে নানিয়াচর থানায় গেলেও পুলিশ মামলা নেয়নি৷ আর এ ধরনের ঘটনা এই প্রথম নয়, এর আগেও নির্যাতন এবং হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে৷ কল্পনা চাকমা’র খোঁজ আজও পাওয়া যায়নি।’ নানিয়ারচর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা অবশ্য দাবি করেছেন, কেউ থানায় মামলা করতে যায়নি৷ রমেল চাকমার মৃত্যু নিয়ে বিভিন্ন কর্তৃপক্ষ এবং মহল থেকে পরস্পরবিরোধী বক্তব্য পাওয়া গেলেও একটি বিষয় স্পষ্ট যে তার মৃত্যুর সঙ্গে তার সাংগঠনিক পরিচয়ের বিষয়টি জড়িত। তিনি পাহাড়ি ছাত্র পরিষদের ওই ধারাটির সঙ্গে জড়িত ছিলেন যারা শান্তিচুক্তিবিরোধী ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্র্যাটিক ফ্রন্ট বা ইউপিডিএফের ছাত্র সংগঠন এবং যে ইউপিডিএফের ‘নাশকতামূলক’ কর্মকাণ্ডের জন্য পার্বত্য চট্টগ্রামে এখনও সেনাবাহিনীর উপস্থিতি দরকার বলে ধরে নেওয়া হয়। পাহাড়ে সেনা উপস্থিতি প্রমাণ করে, দেড় যুগ আগে শান্তিচুক্তি হলেও পুরোপুরি শান্তি ফেরেনি। তবে, সেই অশান্তি মোকাবেলায় মানবাধিকারের লঙ্ঘন কোনভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। রমেল চাকমা কিংবা অন্য কেউ যদি রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকে, তাহলে অবশ্যই আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। কিন্তু, এইচএসসি পরিক্ষার্থী একজন অর্ধ-দৃষ্টিবন্ধী ছেলের এমন করুণ মৃত্যু যেমন সভ্য সমাজ মেনে নিতে পারে না তেমনি এরকম ঘটনা সেখানে আরো বেশি অশান্তি সৃষ্টি করতে পারে বলে আমরা আশঙ্কা করি। রমেল চাকমা বাংলাদেশের একজন নাগরিক এবং তিনি কোন অন্যায় করলে তাকে বাংলাদেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী বিচারের মুখোমুখি করা ন্যায়সঙ্গত ছিল। তা না করে ভিন্ন কোন ব্যবস্থায় তাকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়ায় আমরা ওই অঞ্চলের অন্য মানুষদের নিয়ে শঙ্কা বোধ করছি। এরকম অবস্থায় পাহাড়ের মানুষদের আশ্বস্ত করতে আমরা এ ঘটনায় উপযুক্ত তদন্ত এবং ব্যবস্থা দেখতে চাই। একজন বাংলাদেশীও যেন তার জাতিগত পরিচয় কিংবা ধর্মীয় বিশ্বাসের কারণে নিজেকে বাংলাদেশের বাইরের কেউ মনে না করেন সেই নিশ্চয়তাবোধও খুব জরুরি।







