আমার-আপনার আয় বাড়েনি। সাদা চোখে গত এক বছরে আমরা তেমন কোনো শিল্পকারখানাও তৈরি হতে দেখলাম না। বিনিয়োগও নেই। যা দেখছি, দেশে ধনবৈষম্য ক্রমেই বাড়ছে। কিছু মানুষ রাতারাতি ব্যাঙ থেকে গণ্ডারে পরিণত হচ্ছে। দেশে চাকরি নেই। শিল্প নেই। বেকাররা একটা চাকরির জন্য জুতোর সুখতলি ক্ষয় করতে করতে জুতোর দাম বাড়িয়ে দিচ্ছে। আয়ের সঙ্গে ব্যয়ের সামঞ্জস্য বিধান করতে হিমশিম খাওয়া দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ নিদ্রাহীনতায় ভুগছে। সবার মধ্যে ক্ষোভ অসন্তোষ, কেমন একটা তিরিক্ষি ভাব। কাউকে ভাই বললেও প্রত্যুত্তরে ‘স্ত্রীর ছোটভাই’ হিসেবে সম্বোধন করছে। কৈফিয়ত চাইলে সজোরে থাপ্পর কষিয়ে দিচ্ছে। এমন একটা দমবন্ধকরা উত্তেজনাকর পরিস্থিতির মধ্যেই আমরা আমাদের মাননীয় অর্থমন্ত্রীর কাছে শুনলাম নতুন তথ্য, দেশের নাগরিকদের মাথাপিছু আয় বেড়ে নাকি এক হাজার ৯০৯ ডলারে দাঁড়িয়েছে। ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বর মাসে মাথাপিছু আয় ছিল এক হাজার ৭৫১ মার্কিন ডলার। সেই হিসেবে গত ছয় মাসের ব্যবধানে দেশের মানুষের মাথাপিছু আয় বেড়েছে ১৫৮ মার্কিন ডলার।
অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তাফা কামাল আরো জানিয়েছেন, বর্তমান অর্থবছর শেষে জিডিপির প্রবৃদ্ধি ছাড়াবে ৮ দশমিক ১৩ শতাংশে। গত অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধির এই হার ছিল ৭ দশমিক ৮৬ শতাংশ। মূলত শিল্প খাতের হাত ধরে নাকি প্রবৃদ্ধির আকার বেড়েছে।
আমরা বলছি না যে অর্থমন্ত্রী মহোদয় উল্লিখিত তথ্যগুলো বানিয়ে বলেছেন। তথ্যগুলো নিশ্চয়ই ঠিক। তবে এই তথ্যগুলো নিয়ে উল্লসিত হওয়ার কিছু নেই। মাথাপিছু আয় কিংবা প্রবৃদ্ধি যতই বাড়ুক, আমি আপনি যে তিমিরে ছিলাম সেখানেই থাকব। কারণ এগুলো হচ্ছে ‘পরিসংখ্যান।’ পরিসংখ্যানকে বিশ্বাস করা কঠিন। পরিসংখ্যানে অনেক ফাঁকি আছে। গোজামিল আছে। কীভাবে? সেই প্রসঙ্গেই আসছি।
পরিসংখ্যানকে অনেক রসিকজনই মিথ্যের সঙ্গে তুলনা করেন। মিথ্যে কয় প্রকার? ইংরেজ স্টেটসম্যান ও লেখক বেঞ্জামিন ডিসরেইলি (Benjamin Disraeli) মিথ্যেকে ভাগ করেছেন তিনভাগে: মিথ্যে, ডাহা মিথ্যে ও পরিসংখ্যান।
পরিসংখ্যান জিনিসটা আসলে খুবই গোলমেলে। এর দ্বারা অনেক সময় মিথ্যেকে সত্যে রুপান্তরিত করা যায়। আবার কঠিন সত্যও মিথ্যে হয়ে যায়। যেমন ধরা যাক, একজন লোকের মাসিক বেতন ৫ লাখ টাকা, আর এক জনের ২০ হাজার টাকা; পরিসংখ্যান মতে, দুজনের গড় বেতন লাখ টাকার ওপরে। গড় বা অ্যাভারেজকে পরিসংখ্যানে ব্যাপকভাবে ব্যবহার করা হলেও এ থেকে আসল ঘটনা বোঝা কষ্টকর: যদি একজন লোকের মাথা হিমশীতল বরফে এবং পা গনগনে আগুনে রাখা হয়, তবে তার অ্যাভারেজ বডি টেম্পারেচার হবে নরমাল।
পরিসংখ্যান নিয়ে এবার একটা পুরোনো কৌতুক।
এক বন্ধু অপর বন্ধুকে বলছে, পরিসংখ্যান জিনিসটা আছে বলে আমরা কুমিরের হাত থেকে রেহাই পাচ্ছি। দ্বিতীয় বন্ধু বলে, সেটা কীভাবে? এবার প্রথম বন্ধু বলে: পরিসংখ্যান অনুযায়ী, পৃথিবীতে প্রতিবছর কুমিররা চার কোটি ২০ লাখ ডিম পাড়ে। এগুলোর মধ্যে কেবল দুই ভাগের এক ভাগ ডিম ফুটে বাচ্চা বের হয়। এসব বাচ্চার চার ভাগের তিন ভাগই আবার জন্মের প্রথম ৩৬ দিনে শিকারি প্রাণীর হাতে মারা পড়ে। বাকিগুলোর মধ্যে শতকরা পাঁচ ভাগ কেবল এক বছর বেঁচে থাকে। এবার নিশ্চয়ই স্বীকার করবে, পরিসংখ্যান কতই না বিস্ময়কর!
দ্বিতীয় বন্ধু: এখানে বিস্ময়ের কী আছে?
দূর, তুমি এখনো ব্যাপারটা ধরতে পারোনি। পরিসংখ্যান না থাকলে বুঝতে, কী হতো। তোমার পশ্চাদ্দেশটা এখন কুমিরের ওপরই রাখতে হতো।
আমার এক বন্ধু পরিসংখ্যানের বুজরুকি সম্পর্কে বোঝাতে গিয়ে বলেছেন, মনে করুন এক ভদ্রলোক একটি আস্ত মুরগী একা খেয়েছেন, তার বাড়ির পাশেই আর এক ভদ্রলোক অভাবের কারণে কিছু না খেয়ে মারা গেছেন। এখন অর্থনীতির পরিসংখ্যান অনুযায়ী পাশের বাড়ির লোকটি গরীব নন, কারণ হিসেবে উনি অর্ধেক মুরগী খেয়েই মারা গেছেন। মাথাপিছু গড় আয়ের ব্যাপারটা ঠিক এমনই।
বলা হয়ে থাকে, বাংলাদেশের মানুষের গড় আয়ু বেড়েছে। যেটা পরিসংখ্যানে বলা হচ্ছে। অথচ আমরা যদি আশেপাশে তাকাই, দেখা যাবে আগে দাদা/নানা রা ৭০/৮০ বছর বয়সে মারা যেত, এখন অনেকে ৫০ এর আগেই মারা যাচ্ছে। ৬০/৬৫ হলে তো মাশাআল্লাহ্ বলি।
পরে হিসেব করে দেখা গেল, আগে জন্মের সময় মৃত্যুহার অনেক বেশি ছিল তাই গড় আয়ু হয়ে যাচ্ছিল কম, এখন শিশুমৃত্যুহার অনেক কমে গেছে তাই গড় আয়ু বেড়ে গেছে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যশাস্ত্রের শিক্ষক অ্যারন লেভেনস্টাইন পরিসংখ্যানকে তুলনা করেছিলেন বিকিনির সঙ্গে৷ যা প্রকাশ পায় সেটি ইঙ্গিতময়, যা আচ্ছাদিত সেটিই গুরুত্বপূর্ণ৷ বলা অসঙ্গত হবে না, পরিসংখ্যান ও বাস্তবের এই নিরন্তর ফারাকটি আমাদের দেশের প্রশাসনিক কাঠামোর মজ্জাগত অসুখ৷ যে দলই ক্ষমতাসীন হোক, পরিসংখ্যান যখন উন্নয়নের একমাত্র মাপকাঠি, তখন দায়িত্বপ্রাপ্ত সরকারি কর্মচারীরাও যেনতেন প্রকারে উজ্জ্বল চিত্রাঙ্কনেই উৎসাহী৷ ফলে সরকারি নথিপত্রে দেখা যায় বহু বিদ্যালয় তৈরি হয়েছে, কিন্তু এটি অনুক্তই থাকে যে সেই বিদ্যালয়গুলিতে যথোচিত সংখ্যায় শিক্ষক নেই৷ বলা হয় যে গ্রামে গ্রামে প্রাথমিক চিকিৎসাকেন্দ্র গড়ে উঠেছে, কিন্তু সেগুলিতে ওষুধপত্র ও চিকিৎসাকর্মীর সরবরাহ আছে কি না সেই জরুরি তথ্যটি উহ্যই থাকে৷ পুলিশ থানা উদ্বোধনের খবর প্রকাশিত হয় সংবাদমাধ্যমে, কিন্তু অতঃপর সেখানে যথেষ্ট পুলিশ মোতায়েন হয় কি না, সেই খবর রাখে শুধু ভুক্তভোগীরা৷ প্রচার করা হয় যে বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে পড়ুয়ার হার উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, কিন্তু তারা আদৌ কর্মসংস্থানের যোগ্য হয়ে উঠতে পারছে কি না, সেটি অজ্ঞাত থাকে৷ উন্নয়ন অবশ্যকাম্য, কিন্তু যখন সেটি কেবলই পরিসংখ্যানে সীমাবদ্ধ, বাস্তব তার বিপরীত, আদতে সেটি তখন অর্ধসত্য৷
পরিসংখ্যান, অন্তত আমাদের দেশে, সব সময় সঠিক চিত্র তুলে ধরে না-এ-কথা সত্য। কিন্তু তাই বলে ‘পরিসংখ্যান’ শব্দটিকে মিথ্যের সমার্থক মনে করা বোধকরি ঠিক ন্যায়সঙ্গত হবে না। তবে, এ-নিয়ে অযথা বিতর্কে লিপ্ত হতে চাই না। তারচে বরং অন্য আরেক ধরনের মিথ্যের কথা বলি। বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শ্রদ্ধেয় শিক্ষক আমাদের পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন ‘সাদা মিথ্যে’ বা ‘নির্দোষ মিথ্যে’-র সঙ্গে। ইংরেজিতে একে বলে White Lie। ‘এলাম আমি কোথা থেকে?’-ধরনের প্রশ্নের জবাবে আমাদের দেশের মায়েরা খোকাখুকুদের যা বলে থাকেন, তাকে হোয়াইট লাই বা সাদা মিথ্যে বলা যেতে পারে। অনেকে অবশ্য বলেন যে, মিথ্যে মিথ্যে-ই। একে ভিন্ন ভিন্ন নাম দেয়ার কোনো অর্থ হয় না। বরং মিথ্যেকে ‘ছোটো’, ‘বড়’, বা ‘সাদা’ হিসেবে আখ্যায়িত করে, প্রকারান্তরে, মিথ্যে বলাকে উৎসাহিত করা হয়ে থাকে। সুতরাং, তাদের মতে, মিথ্যে ‘মিথ্যে’ হিসেবেই সর্বক্ষেত্রে এবং সর্বাবস্থায় পরিত্যাজ্য।
মিথ্যে বলার সঙ্গে যখন বিশ্বাসযোগ্যতার প্রশ্নটি জড়িত, তখন এ-ব্যাপারে সবচে বেশি সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত রাজনীতিবিদদের। কারণ, জনগণের কাছে তাদের ভোট চাইতে হয়। তাদের কোনো কথা বা বক্তব্য মিথ্যে বা মিথ্যেমিশ্রিত বলে প্রমাণিত হবার সম্ভাব্য পরিণাম কী হতে পারে তা তো সহজেই অনুমেয়। আর সরকারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সকলের উচিত এ-ব্যাপারে ডাবল সাবধানতা অবলম্বন করা। দেশের প্রকৃত হাল-চাল সম্পর্কে জনগণকে জানানোর দায়িত্ব সরকারের। মনে রাখতে হবে, তারা জনপ্রতিনিধি, জনগণের ভোটে নির্বাচিত (তা সে সত্য ভোটেই হোক আর মিথ্যে ভোটেই হোক)। সেই জনপ্রতিনিধিদের নিয়ে গঠিত সরকার যখন মিথ্যেচারে লিপ্ত হয়, তখন তা ডাবল অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হবার যোগ্য। আগেই বলা হয়েছে, সত্য সব সময় সুন্দর বা প্রিয় হয় না। আমাদের মতো দরিদ্র ভূখণ্ডে ‘দেশ উন্নয়নের জোয়াড়ে ভেসে যাচ্ছে’-ধরনের ডাহা মিথ্যে বলার চেয়ে, দেশের প্রকৃত চেহারাটি দেশবাসীর সামনে তুলে ধরে, সে ‘চেহারাটি’ কীভাবে আরো সুন্দর করা যায় তার বিশ্বাসযোগ্য ও বাস্তবায়নযোগ্য পরিকল্পনা পেশ করলেই বরং দেশবাসী বেশি খুশি হবে। কোদালকে কোদাল বলা-ই তো সবচে নিরাপদ, নয় কি?
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)







