ক্যান্সার, লিভার সিরোসিস এবং স্ট্রোকে প্যারালাইজড হয়ে যাওয়া গুরুতর রোগীদের চিকিৎসা সহায়তা হিসেবে দেশব্যাপী সমাজসেবা মন্ত্রণালয় সাহায্য দিয়ে থাকে। সমাজসেবা অধিদপ্তর থেকে সব জেলা-উপজেলায় সাহায্যপ্রাপ্তির আবেদনের ফরম পাঠানো হয়েছে। সংশ্লিষ্ট রোগীরা সেখান থেকে আবেদনের ফরম সংগ্রহ করে কেউ জেলায়, কেউ আবার অধিদপ্তরে জমা দিয়ে যাচ্ছেন।
জেলায় আবেদন করতে গেলে তারা বলছে, আবেদনগুলো তিনমাস পরপর মিটিংয়ে উত্থাপিত হয়ে তারপর চূড়ান্ত হবে। অধিদপ্তরে কিংবা মন্ত্রণালয়ে জমা আবেদনগুলোর সাহায্য অনুমোদনেও চলছে দীর্ঘসূত্রতা। মাসের পর মাস পেরিয়ে যাচ্ছে সংশ্লিষ্ট রোগীদের ভাগ্যে জুটছে না সাহায্য। এই দীর্ঘসূত্রতায় অনেক রোগী মৃত্যুবরণ করে চলছে। হয়তো সাহায্যের চেক প্রদানে দীর্ঘসূত্রতা না হলে তারা বেঁচে যেত। ক্যান্সার, লিভার সিরোসিস ও স্ট্রোকে প্যারালাইজড খুবই গুরুতর ও জটিল ব্যাধি। সরকারি ফান্ড হতে যেহেতু তাদের সাহায্য দেয়া হচ্ছে সাহায্যগুলো যথাসময়ে ও দ্রুত সংশ্লিষ্ট রোগীদের কাছে পৌঁছে দেয়া মানবিক নয় কি? সমাজসেবা মন্ত্রণালয় নেবে কি এই মানবিক ভূমিকা?
জেলাওয়ারী কতজনের জন্য এই ফান্ড? সিটি কর্পোরেশনগুলোতে কতজনের জন্য এই ফান্ড?কোন জেলা কত টাকার সাহায্য পেল? এসব তত্ত্ব ও তথ্য পরিস্কার করা উচিত। আবেদন নিস্পত্তিতে দীর্ঘসূত্রতায় যেসব রোগী মৃত্যুমুখে পতিত হচ্ছে তার দায়ও সমাজসেবা অধিদপ্তরকেই নিতে হবে। কোন রোগীকে অ্যাম্বুলেন্সে করে নিতে হলে ড্রাইভারের বিলম্বিত করণ যেমন কাম্য নয়, তেমনই কাম্য নয় মৃত্যুযন্ত্রণায় পতিত হওয়া রোগীদের সাহায্যের চেক বিতরণে দীর্ঘসূত্রতা। আবেদন জমা দেয়া রোগীদের মধ্যে সাহায্যের চেক প্রাপ্তির আশা নিয়ে কতজন মারা গেল তার সঠিক পরিসংখ্যান দরকার। তাদের মৃত্যুর দায় কি সমাজ সেবা অধিদপ্তরের উপর বর্তায় না?
ইতোমধ্যে সমাজসেবার সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে ব্যাপক অনিয়ম দুর্নীতির রীতি চালু রয়েছে। বয়স্ক ভাতা, প্রতিবন্ধী ভাতাতে চলছে অনিয়ম, দুর্নীতি ও উৎকোচ বাণিজ্য। এসব কার্ড পেতে দিতে হচ্ছে ৩ হাজার ৫ হাজার কোন কোন ক্ষেত্রে ১০ হাজার টাকা। এই সব দুর্নীতির সাথে জড়িত থাকে স্থানীয় চেয়ারম্যান, মেম্বার ও উপজেলা, জেলা সমাজসেবা কার্যালয়। সকলের যোগসাজশেই এই উৎকোচ বাণিজ্যটা চলে আসছে। ব্যাংক হতে কোন কার্ডধারী টাকা উঠাতে গেলে ব্যাংকের গেটে দাঁড়িয়ে থাকে এসব উৎকোচ সিন্ডিকেটের লোকেরা। রোগীর চেকবিতরণেও এমনটি কোথাও হচ্ছেনা এর নিশ্চয়তা কি? এব্যাপারেও নজরদারি দরকার।
টাকার বিনিময়ে কার্ড নেওয়ার সামর্থ না থাকায় অনেক প্রকৃত অস্বচ্ছল/প্রতিবন্ধীরা কার্ড বঞ্চিত হচ্ছে। কার্ড পেয়ে যাচ্ছে স্বচ্ছল ব্যক্তিরা। এই মন্ত্রণালয়টির একসময়কার মন্ত্রী ছিলেন ফাঁসিতে মৃত্যুবরণকারী যুদ্ধাপরাধী আলী আহসান মুহাম্মদ মুজাহিদ। তিনি মন্ত্রী থাকাকালীন অনেক শিবির নেতাকে সমাজসেবার বিভিন্ন, কর্মকর্তা, কর্মচারী হিসেবে নিয়োগ প্রদান করেছেন। এসব কর্মকর্তা, কর্মচারীরা কি সরকারের সুনাম বৃদ্ধিতে কাজ করবে না কুনাম বৃদ্ধিতে? মৃত্যুপথযাত্রী রোগীদের সাহায্য নিয়ে এই দীর্ঘসূত্রতা কারা করছে? কেন করছে? সমাজসেবা মন্ত্রণালয়টি নিতান্তই দুঃস্থ মানুষদের সাথে সম্পৃক্ত। এর উদাসীনতা ও অবহেলায় মানবতা আর্তনাদ করে ওঠে। অথচ দেশব্যাপী রয়েছে সমাজ সেবার সম্পত্তি। রয়েছে পতিত বিল্ডিং। এরশাদের আমলে স্থাপিত প্রতি ইউনিয়নেই সমাজ সেবার কার্যালয় স্থাপিত হয়েছিল। এর রয়েছে সরকারি পতিত জায়গা। যা ক্রমশ বেদখল হয়ে চলে যাচ্ছে অবৈধ দখলদারদের হাতে। সমাজ সেবা কি পারেনা এসব পতিত জায়গা উদ্ধার করে আর্ত মানবতার কাজে লাগাতে?এগুলোতে হতে পারে আর্তমানবতার সেবা কেন্দ্র, প্রতিবন্ধী শিশুদের পরিচর্যা কেন্দ্র, বয়স্ক ও প্রতিবন্ধীদের নামের তালিকা ও তাদের অভিযোগ কেন্দ্র।
বাংলাদেশে কতজন ক্যান্সার রোগী, কতজন লিভার সিরোসিস রোগী ও কতজন স্ট্রোকে প্যারালাইজড। উপজেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের মাধ্যমে সমাজসেবা অধিদপ্তর খুব সহজেই তার একটা সঠিক পরিসংখ্যান করতে পারে। পরিসংখ্যান ছাড়া কি ফান্ড দাবি করা যায়?এটি না করলে অনেক জেলা অনুদান বঞ্চিত হবে। কিংবা কোন জেলা পাবে কোন জেলা বঞ্চিত হবে। অনেক মৃত্যুপথযাত্রী রোগী পাবেনা সাহায্য। আর এসব সাহায্যের চেকবিতরণে দীর্ঘসূত্রিতা পরিহার করে প্রয়োজন একটি ইমার্জেন্সি সেল চালু করা। আরও দরকার আবেদন ফরমগুলো সহজলভ্য ও অধিকতর সংক্ষিপ্ত করা। আবেদন ফরম নিয়ে ছোটাছুটি করতে করতে জমা দেয়ার আগেই অনেক রোগী মারা যাচ্ছে এমন ঘটনা অহরহ ঘটছে।
নেত্রকোনা জেলার জীবন চন্দ্র সরকার ২ মাসের বেশি সময় আগে আবেদন জমা দিয়েছে। তার পরিবার সুদের উপর টাকা এনে রোগীর চিকিৎসা করিয়ে এখন ঋণভারে জর্জরিত। সমাজসেবার চেকের আশায় থাকতে থাকতে ক্যান্সারে আক্রান্ত জীবন চন্দ্র সরকার মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়লো। লিভার সিরোসিসে আক্রান্ত একই জেলার আরেক রোগী স্বপ্না আক্তার। একমাসের বেশি সময় আগে জেলা সমাজসেবায় সাহায্যের আবেদন জমা দিল। স্বপ্না আক্তার বেঁচে থাকতে থাকতে এ সাহায্য পাবে কিনা স্বামী আক্কাস আলীর এব্যাপারে রয়েছে সংশয়। অর্থের অভাবে স্ত্রীর সঠিক চিকিৎসা করাতে পারছেন না তৃণমূলের এই তরুণ আওয়ামী লীগ নেতা। সমাজ সেবায় সাহায্যের চেক বিতরণের দীর্ঘসূত্রতায় দেশব্যাপী বিনাচিকিৎসায় মারা যাচ্ছে শতশত রোগী। আবেদনের দ্রুত নিষ্পত্তি ও এর সত্যতা যাচাইয়ের জন্য প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকের সাথে ফোনে কথা বলে নিশ্চিত হতে পারে রোগীদের ইমার্জেন্সী সেল। এব্যাপারে সমাজসেবা মন্ত্রণালয় নজর দেবে কি?
মৃত্যুপথ যাত্রী রোগীদের আবেদন ফরম নিয়ে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা খুবই অমানবিক ও অনাকাঙ্ক্ষিত। আবেদন জমা হবে জেলায়। জেলায় পড়ে থাকবে মাসের পর মাস। এরপর জেলা হতে যাবে সমাজসেবা অধিদপ্তরে। সেখানেও পড়ে থাকবে মাসের পর মাস। এর মাঝে মারা পড়বে রোগী। এই মৃত্যুরোধে একটি পন্থা বের করা হোক। মৃত্যুব্যাধি ক্যান্সার, লিভার সিরোসিস স্ট্রোকে প্যারালাইজড রোগীদের আবেদন অনলাইনে গ্রহণ করা হোক ও এগুলো খুবই স্বল্পসময়ে অর্থাৎ ২/৩ দিনের মধ্যে নিস্পত্তি করা হোক। বর্তমানে রোগীর স্বজনরা দুই সেট আবেদনের ফরম পূরণ করতে করতেই এক সপ্তাহ পার করে দিতে বাধ্য হচ্ছে। এরপর আরও রয়েছে ফাইল চালাচালির দীর্ঘসূত্রতা। জীবন মৃত্যুর মাঝখানে থেকে মৃত্যুযন্ত্রণায় কাতরানো এইসব মানুষদের নিয়ে প্রচলিত দীর্ঘসূত্রতা পরিত্যাজ্য হবে কি? এই প্রশ্নটা সমাজ সেবা মন্ত্রণালয়, মন্ত্রিপরিষদ ও ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর প্রতি রইলো।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)








