ব্রিটিশ তথা ইউরোপীয় রাজনীতিতে একটা বিপ্লব ঘটানোর সম্ভাবনা জাগিয়েও শেষ পর্যন্ত লেবার দলের নেতা জেরেমি করবিন সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলেন না। কিন্তু একটা বড় ‘ঝড়’ তিনি তুলেছেন ঠিকই! আগাগোড়া একজন ব্যতিক্রমী ব্রিটি রাজনীতিক তিনি। নিরামিশ খাবার খান। মদ স্পর্শ করেন না। নিজের গাড়ি নেই। সাইকেল করে যাতায়াত করেন। বেড়াল পোষেন। ৬৮ বছর বয়সী লেবার পার্টির এই ‘বামপন্থী’ নেতা জেরেমি করবিন ব্রিটেন কাঁপিয়ে দিয়েছেন!
শেষ পর্যন্ত সংখ্যাগরিষ্ঠতা তিনি পাননি বটে, তবে ক্ষমতাসীন টেরেসা মের ঘুম হারাম করে দিয়েছেন। করপোরেট দুনিয়া করবিনকে ঠোকাতে জান দিয়ে চেষ্টা করেছে। টেরেসা মের পক্ষে করপোরেটদের পাশাপাশি রক্ষণশীলরাও জীবন বাজি রেখে লড়েছেন। শেষ পর্যন্ত নিজের দিকে ঝোল টেনে থেরেসা মে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের কাছাকাছি পৌঁছেছেন, কিন্তু কাঙ্ক্ষিত ৩২৬টি আসন নিশ্চিত করতে পারেন নি। সেক্ষেত্রে ঝুলন্ত পার্লামেন্টই হতে যাচ্ছে ব্রিটেনের রাজনৈতিক ভবিতব্য।
গত দুই বছরে ব্রিটিশ রাজনীতিতে অনেক উত্থান-পতন ঘটেছে। ব্রিটেন ইউরোপীয় ইউনিয়নের শরিক থাকবে, নাকি জোট ছেড়ে বেরিয়ে যাবে, সেই প্রশ্নে কার্যত দু’ভাগ হয়ে যান ব্রিটিশ রাজনীতিকরা। ইইউ ছেড়ে বেরিয়ে আসার প্রস্তাব ‘ব্রেক্সিট’ নিয়ে গণভোট হয় গত বছর জুনে এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটার ব্রেক্সিটের পক্ষে রায় দেন। তার নৈতিক দায় স্বীকার করে পদত্যাগ করেন ব্রেক্সিট বিরোধী প্রধানমন্ত্রী ক্যামেরন। টোরিরা সংসদে নতুন নেতা নির্বাচিত করে টেরেসা মে কে।
এরপর নির্বাচন এগিয়ে আনার সিদ্ধান্ত নেন প্রধানমন্ত্রী মে, যেহেতু ১৯ জুন থেকে ব্রাসেলসে শুরু হবে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ছেড়ে বেরিয়ে আসার মূল প্রক্রিয়া। ইইউ নেতাদের সঙ্গে সেই দর কষাকষি এবং তাতে ব্রিটেনের স্বার্থরক্ষার জন্য টেরেসা মের মতো একজন মজবুত নেতারই ক্ষমতায় এবং দায়িত্বে থাকা দরকার এটাই মূল যুক্তি। যদিও ব্রেক্সিটের পরের এক বছরে ব্রিটেনে একের পর এক জঙ্গি নাশকতার ঘটনায় সাধারণ নাগরিকদের নজর পড়েছে অভ্যন্তরীণ সুরক্ষা ব্যবস্থার গাফিলতিতে এবং সামগ্রিকভাবে মে সরকারের নিরাপত্তা নীতিতে।
গত এক মাসে তিনটি সন্ত্রাসবাদী হামলা হয়েছে ব্রিটেনে। নির্দিষ্ট গোয়েন্দা তথ্য থাকা সত্ত্বেও আক্রমণ ঠেকাতে পারেনি টেরেসা মে প্রশাসন। নির্বাচনী প্রচারে এই বিষয়টাই বড় করে তুলে ধরেছে লেবার পার্টি। এতে ক্রমশ বিরোধীদের সঙ্গে সরকার পক্ষের জনসমর্থনের ব্যবধান কমলেও চূড়ান্ত বিচারে ব্রেক্সিটপেন্থীরাই বেশি আসন পেয়েছেন।
রাজনীতিবিদ হিসেবে থেরেসা মের কৌশল সফল হয়নি। ব্রেক্সিট হাওয়ায় ভর রেখে বা বলা ভালো বাজি রেখেই টেরেসা মে হঠাৎ ঘোষণা করে দেন জুনের আট তারিখ দেশের সংসদ নির্বাচন হবে। বেশ বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে তড়িঘড়ি করে নির্বাচন সেরে ফেলার আর একটি কারণ ছিল লেবার দলের চেয়ে রক্ষণশীলদের প্রতি মানুষের বেশি সমর্থন আর লেবার এমপিদের নিজেদের মধ্যেও করবিনকে নিয়ে ভাগাভাগি রয়েছে। কারণ করবিন হলেন ‘মার্কসের’ ভক্ত, ‘কট্টরপন্থী’ লেবার মানুষ। উল্টোদিকে বেশিরভাগ লেবার এমপিই মুক্ত অর্থনীতির উদারবাদে নিজেদের নিমজ্জিত করেছেন।
করবিন স্রোতের বিপরীতে দাঁড়ানো এক নেতা। দলের মধ্যে সংগ্রাম করেছেন নীতি-আদর্শ সমুন্নত রাখতে। ১৯৮০-র দশকে লেবার দলে দক্ষিণপন্থী ঝোঁকের শুরু এবং ১৯৯৪-তে ব্লেয়ারের নেতা নির্বাচনের মাধ্যমে তা পরিপূর্ণতা পায়। গত তিরিশ বছরে লেবার দল দক্ষিণ থেকে আরও দক্ষিণে ঝুঁকেছে। সম্পূর্ণ আলিঙ্গন করেছে নয়া উদারবাদকে। নেতৃত্ব দিয়েছেন ব্লেয়ার এবং ব্রাউন। মুক্ত বাজার অর্থনীতির ঘোর সওয়াল করে এরা বস্তুত লেবার দলের চরিত্রই পালটে দিয়েছিলেন। কিন্তু করবিন হচ্ছেন সেই ঝোঁকের তীব্র বিরোধী অংশের নেতা। গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্রী।
লেবারদের নিজস্ব বৈশিষ্ট্য ফিরিয়ে আনতে আন্তঃপার্টি সংগ্রাম করেছেন বছরের পর বছর। অবশেষে নেতৃত্বে। পার্টি সদস্য ও সমর্থকদের মধ্যে বিপুল জনপ্রিয়। যদিও দলের অনেক এমপির কাছে তিনি অজনপ্রিয়। কারণ, করবিনের সাফ বক্তব্য ইরাক, আফগান, সিরিয়া যুদ্ধের বিরুদ্ধে। ইরাকে যুদ্ধের বিরুদ্ধে লন্ডনের রাস্তায় লক্ষ লক্ষ মানুষের যে মিছিল বেরিয়েছিল তার উদ্যোক্তা ও সভাপতি ছিলেন করবিন। তিনি সোচ্চার প্যালেস্টাইন রাষ্ট্রের পক্ষে।
১৯৮৪ থেকে তিনি একটানা সংসদ সদস্য। ব্রিটেন সংসদে মাত্র গুটিকয় এমপির মধ্যে তিনিই একমাত্র লাগাতার সমস্ত রকম বেসরকারিকরণের বিরোধিতা করে এসেছেন। ব্যয় সংকোচন ও শ্রমিকবিরোধী বিলগুলির বিরুদ্ধে জোরালোভাবে তার বক্তব্য পেশ করেছেন। তিনি গণতন্ত্রে বিশ্বাসী, রাজতন্ত্রে নন। তাই রানিকে এড়িয়ে চলেন, লং লিভ দ্য কিং/কুইন সংগীতে গলা মেলান না, চুপ করেই থাকেন! অনেকে তরুণ-তরুণী তার এই বিপ্লবী মেজাজের জন্য গত এক বছরে লেবার সদস্য হয়েছেন।
প্রথমদিকে বিপক্ষ এই নেতাকে কোনও আমলই দেননি টেরেসো মে। কিন্তু করবিন আন্তরিকতার সঙ্গে নির্বাচনের প্রচার কাজ করে গেছেন। দেশের আনাচে-কানাচে ঘুরেছেন, যে কেন্দ্রগুলো শক্ত লেবার ঘাঁটি সেখানে একাধিক বার গিয়েছেন, আবার যে কেন্দ্রের ভোটাররা কনজারভেটিভ-পন্থী বলে পরিচিত, সেখানেও সময় দিয়েছেন প্রচুর। বাচ্চাদের পার্কে গিয়ে সময় কাটিয়েছেন, দিনের পর দিন সাধারণ মানুষের দরজায় কড়া নেড়ে প্রচার চালিয়েছেন।
মে মাসের মাঝামাঝি লেবার পার্টির ইস্তেহার প্রকাশের সময়ে আরও স্পষ্ট হয়ে যায়, জনমোহিনী নীতির পথেই হাঁটছেন করবিন। বিশ্ববিদ্যালয়ের ফি মওকুফ শুধু নয়, ২ থেকে ৪ বছরের বাচ্চাদের জন্য বিনামূল্যে শিশু পরিষেবা, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যকে পুরোপুরি সরকারের দায়িত্বে নিয়ে আসা, এ রকম বিস্তর প্রতিশ্রুতি ছিল লেবার ইস্তেহারে। তার দল জিতলে উচ্চবিত্ত ও কর্পোরেট সংস্থার উপরে আরও কর চাপিয়ে এই বিপুল বাড়তি খরচের জোগান দেবেন তিনি, এ রকম আশ্বাসও দিয়েছেন করবিন। তিনি প্রশ্ন তুলে দিয়েছেন ন্যাটোর প্রাসঙ্গিকতা নিয়েও। বলেছেন ওরকম যুদ্ধবাজ গোষ্ঠীতে ব্রিটেনের থাকার কোনও প্রয়োজন নেই।
ম্যানচেস্টারের সাম্প্রতিক সন্ত্রাসী হামলা নিয়ে সরাসরিই বলেছেন সিরিয়া, ইরাক প্রভৃতি যুদ্ধে ব্রিটেন নিজেকে জড়িয়েছে বলেই আজ বারবার এই সন্ত্রাসী হামলা চলছে, মানুষের প্রাণ যাচ্ছে। করবিনের কথা ও ঘোষণায় ব্রিটেনের করপোরেটরা ভীষণ ভীত হয়ে পড়ে। কারণ একটাই, যুগ যুগ ধরে চলে আসা মুনাফার পরিমাণ হ্রাস হয়ে যাবে। তাই তারা সর্বশক্তি দিয়ে টেরেসা মে-র পাশে থেকে চেষ্টা করেছে করবিনকে হারাতে। ঘরে বাইরে প্রবল প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াই করতে হয়েছে করবিনকে।
ব্রিটিশরা যেন সন্ধিক্ষণে কাটাচ্ছেন। রাষ্ট্রের জীবনধারায় কখনও এমনি করেই আসে ক্রান্তিলগ্ন, ইতিহাসের এক অমোঘ সন্ধিক্ষণ। একেই তো অভিবাসন নিয়ে জেরবার ব্রিটিশ সমাজ। তার ওপরে গত কয়েক বছর ধরে ব্রেক্সিট নিয়ে বিস্তর চেঁচামেচিতে ওলট–পালট হয়ে যাচ্ছে সমাজের সুস্থিতি। একটা ঘোরের মধ্যেই বোধহয় গত বছরের ব্রেক্সিটের ভোটটা দিয়ে ফেলেছে ব্রিটিশরা।
আর তার পরের ঘটনাপ্রবাহ পুরোটাই তাদের হাতের বাইরে। বদলে গেল প্রধানমন্ত্রী। ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন থেকে বের হওয়ার প্রক্রিয়ার অর্থনৈতিক আর সামাজিক সুনামিতে তাদের যেন ঘুম ভেঙেছে। কিন্তু স্বাভাবিক হতে পারছে না কিছুতেই। তার ওপরে দু বছরের মধ্যে এই তৃতীয় গণভোট, তার মধ্যে দুটো আবার সাধারণ নির্বাচন। তবে ব্রিটিশরা এবার শক্তিশালী বিরোধী দল পেতে চলেছে।
গণতন্ত্রের স্বার্থে শক্তিশালী বিরোধী দল যে দরকার, এ বিষয়ে কোনও দ্বিমত নেই কারও। বিশেষ করে সঙ্কটকালে। সত্তর বছরের মধ্যে এটাই ব্রিটিশদের সব চাইতে বড় সঙ্কটের সময়। এই সংকট লগ্নে টেরাসা মের সবচেয়ে বেশি আসনে জয়, আর জেরেমি করবিন শক্তিশালী বিরোধী নেতা হিসেবে আবির্ভাব ব্রিটিশদের জন্য কোন সমাধানসূত্র নিয়ে আসে, না সংকটকে আরও ঘণীভূত করে, এখন সেটাই দেখার বিষয়।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে)







