সিলেট থেকে: প্রবল চাপে ছিলেন। খুবই হতাশ হয়ে পড়েছিলেন তামিম ইকবাল। ব্যাটে রান নেই অথচ নামের পাশে ডট বল অসংখ্য। স্ট্রাইক রেট কমে যাওয়ায় সমালোচনার তীর বিদ্ধ করছিল এ ওপেনারকে। ব্যাট করার ধরণ নিয়েও উঠেছিল প্রশ্ন। তামিম উত্তর দিয়েছেন ব্যাট হাতে, ১৫৮ রানের অসাধারণ ইনিংস খেলে। জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে মঙ্গলবার দ্বিতীয় ওয়ানডেতে তামিম ফিরে পেয়েছেন নিজেকে। হারানো আত্মবিশ্বাস পুনরুদ্ধার করার আত্মতৃপ্তি নিয়ে মুখোমুখি হলেন সংবামাধ্যমের। জানালেন বাংলাদেশের ব্যক্তিগত সর্বোচ্চ রানের ইনিংসটি খেলার পেছনে অবদান আছে বিসিবি সভাপতি নাজমুল হাসান পাপনসহ টিম ম্যানেজমেন্ট, সতীর্থদের।
প্রশ্ন: আপনার নিজের কাছে এই ইনিংস কেমন ছিল, এটা খেলার পর চাপমুক্ত অনুভব করছেন কিনা?
তামিম: অবশ্যই। চাপে তো ছিলাম। এটা না বললে মিথ্যে কথা বলা হবে। কিন্তু আমার কাছে মনে হয় যে একটা ভালো জিনিস ছিল যে আমি ব্যাটিং খুব ভালো করছিলাম। আমি হয়তো অতো বড় রান করতে পারছিলাম না। টেস্টে যেমন ৪১ রান করলাম। পাকিস্তানে ৩৫/৩৬ রানের একটা ইনিংসও খেললাম। আমার মনে হয়ে গতকাল (মঙ্গলবার) আমি খুব ভালো ব্যাটিং করেছি। এমনকি অনুশীলনেও আমি খুব ভালো ব্যাটিং করছিলাম।
প্রশ্ন: চাপ কাটিয়ে ওঠার পথ খুঁজছিলেন কীভাবে?
তামিম: অনেককেই এটার পেছনে কৃতিত্ব দেওয়া উচিত। টিম ম্যানেজমেন্ট বলেন বা আমার টিমমেটরা বলেন। তারা আমার ওপর বিশ্বাস রেখেছে। কোনো সময় একটা মিনিটের জন্যেও তারা বিশ্বাস হারায়নি। হয়তোবা আমিও যখন একটু হতাশ হয়ে যাচ্ছিলাম তখন তারাও আমাকে নিজের ওপর বিশ্বাস ধরে রাখতে সাহায্য করেছে। সাধারণত এরকম সময় গেলে আশেপাশে খুব কম মানুষকেই খুঁজে পাওয়া যায়। কিন্তু যারা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আমার জন্য… সতীর্থ আর ম্যানেজমেন্ট… ওরা সবসময় আমাকে সমর্থন দিয়েছে। এমনকি বোর্ড থেকেও। এটা না বললেই নয়, শেষ খেলার আগের দিন আমাকে বিসিবি সভাপতিও ফোন করেছেন। উনি অনেক সুন্দর কিছু কথা আমাকে বলেছেন- যা আসলে ভালো লাগার মতো।

প্রশ্ন: সীমিত ওভারের খেলায় আপনি নিজের ব্যাটিংয়ের ধরণ কিছুটা বদলেছিলেন। দীর্ঘক্ষণ উইকেটে থেকে ইনিংস টেনে নেয়ার ভূমিকায় দেখা গেছে। শুরুতে ধরে, শটস কম খেলে বড় ইনিংস খেলার জন্য। কিন্তু ইনিংস বড় হচ্ছিল না। আগের ম্যাচে আবার দেখা গেল আপনার সেই পুরনো মেজাজ ফিরে এসেছে। তো আপনি কি মাঝখানে কিছুটা সময় একটু দ্বিধা-দ্বন্দে ছিলেন?
তামিম: সত্যি কথা বলতে আমি কিন্তু কালকে ব্যাটিংয়ে ভিন্ন কিছুই করিনি। একটা জিনিস পক্ষে গেছে। সেটা যে আমি প্রথমে দুই-তিনটি বাউন্ডারি বেশি পেয়ে গেছি। আপনি যদি দেখেন একটা ওভারে দুইটা বল আমার পায়ে ছিল যেটা আমি ফ্লিক করে চার মেরে দিয়েছি। তাছাড়া আপনি কিন্তু এমন পুরা ইনিংসে কখনো দেখবেন না (এগিয়ে মারা), সেঞ্চুরির পর হয়তোবা দেখেছেন। একশর আগে কোনো সময় এমন দেখবেন না যে আমি সামনে যেয়ে বড় শটস খেলেছি অথবা কিছু। আমি সব কিন্তু ক্রিকেটিং শটস খেলেছি। কালকে হয়তোবা গ্যাপ খুঁজে পেয়েছি। বল বাইরে চলে গেছে সব, বাউন্ডারি হয়ে গেছে। তার আগের দিন গ্যাপে যায়নি বলে বাউন্ডারিগুলো হয়নি। কিন্তু কাল শুরু থেকেই বল আর রানের প্রায় সমান সমান ছিল। দেখে মনে হয়েছে যে আমি অনেক কিছু পরিবর্তন করে ফেলেছি। এটা আসলে ঠিক না। আমি সবসময় যে ধরণের মাইন্ডসেটে ব্যাটিং করি আমি আগের ম্যাচেও ওই একই ধরণের মাইন্ডসেট নিয়ে ব্যাটিং করেছি।

প্রশ্ন: আপনার ব্যাটিং দেখে মনে হচ্ছিল ডাবল সেঞ্চুরি হবে। যেটা আমাদের নেই। তখন আপনি আপনার ২০০ করার সম্ভাবনা কতটুকু দেখছিলেন?
তামিম: ২০০ তো… ৪২ রানের দূরত্ব ছিল। তবে সত্যি কথা তখন ওরকম কিছু ভাবিনি। আরো ৫ ওভার যখন ছিল তখন একটা ওভারে যদি আমি ১৫/২০ রান করে নিতে পারতাম তাহলে একটা সুযোগ থাকলে থাকতে পারতো। কিন্তু যেহেতু এটা ৪৮ রান দূরে ছিল তাহলে এখন যদি আমি বলি ‘না, ভেবেছিলাম’ তাহলে সেটা বলা তো ঠিক হবে না। ওটা ৪৮ রান দূরে। হ্যাঁ, যদি আমি ২০ রান দূরে থাকতাম, ১৫ রান দূরে থাকতাম, তাহলে অবশ্যই বলতাম যে ভাবতাম। কিন্তু আমি ওরকম কিছু ভাবিনি। আমার কাছে ওই সময় একটা জিনিসই মনে হচ্ছিল যে দ্বিতীয় ইনিংসে উইকেটটা ভালো হয়ে যায় প্রথম ইনিংসের তুলনায়। প্রথম হাফে একটু অসমান থাকে। আর রানটাও অত সহজে আপনি করতে পারবেন না। তো আমি এটাই চেষ্টা করছিলাম, আমাদের একজন ব্যাটসম্যান কমও খেলেছে, তো আমি এটাই চেষ্টা করছিলাম যে ওভার বেশি থাকার সময় যেন আমি আউট না হয়ে যাই। কারণ আমি যদি আউট হয়ে যেতাম তাহলে কিন্তু ওরকম কোনো ব্যাটসম্যান ছিল না। তো আমি ওরকম ক্যালকুলেটিভ ঝুঁকি নিয়ে ব্যাটিং করছিলাম। দুর্ভাগ্য যে শটে আউট হয়েছি আমি…আমার কাছে মনে হয় খুবই ভালো শট খেলেছিলাম…একদমই অল্প একটু উচ্চতা পেলে হয়তোবা ওটার ফলটা অন্যরকম হতে পারতো। এরকম (ডাবল সেঞ্চুরি) কিছু আমি আসলে ভাবিনি।
প্রশ্ন: ২০০৯ সালে জিম্বাবুয়ে সফরে ১৫৪ রানের ইনিংস, তখন দলের জন্য ভিন্ন পরিস্থিতি ছিল। ৩১৮ রান তাড়া করে বাংলাদেশ ওটা জিতেছিল। আর গতকাল অনেক বাজে সময় পার হয়ে আপনি ইনিংসটা (১৫৮ রানের) খেলেছেন। দুইটার মধ্যে কোনটাকে এগিয়ে রাখবেন?
তামিম: অবশ্যই ২০০৯ সালেরটা। কারণ আমার কাছে মনে হয় ওটা প্রথমবার আমরা ৩০০ রান তাড়া করে ম্যাচ জিতেছিলাম। পাশাপাশি এখন ৩০০ রানটা যত সহজে মানুষ দেখে ওই সময় কিন্তু ৩০০ রানটা অতটা সহজে দেখতো না। ৩০০ রান ও সময়ের, এখনকার ৪০০ রান। তো ওই সময় যে আমরা তাড়া করতে পারবো ৩০০ রান এই বিশ্বাসটাই হয়তোবা আমাদের খুব বেশি মানুষের কাছে ছিল না। আমার কাছেও ছিল না। কিন্তু যেভাবে করে আমরা ইনিংস এগিয়ে নিয়েছিলাম ওই ম্যাচে… তো অবশ্যই ওই ইনিংসটাকে আমি কালকের তুলনায় এগিয়ে রাখবো।
প্রশ্ন: মুশফিক বলেছিলেন প্রথম শ্রেনির ক্রিকেটে আপনার ৩৩৪ রানের রেকর্ডটা ভাঙতে চান, আপনার ১৫৮ রানের ওয়ানডে ইনিংসকেও হয়ত চ্যালেঞ্জ জানাতে চাইবেন…
তামিম: মুশফিক আমার রেকর্ড ভাঙার জন্য অনেক যোগ্য। শুধু সেই নয়, আমাদের দলের তরুণ খেলোয়াড় যারা আছে লিটন, শান্ত তারাও খুবই সামর্থ্য রাখে। শান্ত তো কাছাকাছি ছিল, ধরেই ফেলেছিল। আমার কাছে মনে হয় না রেকর্ডটা বেশি দিন থাকবে। আমি অনুমান করছি হয়তোবা দুই তিন বছরের মধ্যেই ভেঙে যাবে। আগামী বছরও ভেঙে যেতে পারে।

প্রশ্ন: আপনি বলছেন যে আপনি নিজেই হতাশ ছিলেন, তখন আপনি কী করেছেন?
তামিম: যেহেতু ম্যাচে হচ্ছিল না তাই আমাকে ট্রেনিংয়েই করতে হচ্ছিল। যখন নেটে ব্যাটিং করেছি তখন চেষ্টা করেছি আউট না হতে। টুকটাক কিছু জিনিসও পরিবর্তন করেছি। এটা একটা লম্বা প্রক্রিয়া। ওই দিন নেটে ভিন্ন কিছু করেছি বলে কাল রান করেছি এটা ঠিক না। নিজেকে আরও কতটা ভালো করতে পারি সেটা পরিবর্তন করেছি। সত্যি কথা বলতে, যখন ভালো করবেন না এবং জিনিসগুলো উপভোগ করবেন না তখন খুব কম মানুষই পাশে থাকবে। সমর্থক বলেন বা অন্য কিছু। সবাই হতাশ হবে কারণ আমি ভালো করতে পারিনি। এ কারণেই টিম ম্যানেজমেন্ট এবং সতীর্থদের কাছে আমি কৃতজ্ঞ আমাকে একটা মিনিটের জন্যও তারা বুঝতে দেয়নি আমার সামর্থ্য অনুযায়ী যে খেলতে পারছি না। এই ইনিংসটার পুরো কৃতিত্ব ওদেরই।
প্রশ্ন: নিল ম্যাকেঞ্জির সঙ্গে কী নিয়ে কাজ করেছেন?
তামিম: ও আমাদের ব্যাটিং কোচ। ব্যাটসম্যানদের যখনই কোনো সমস্যা হয় আমরা ওর কাছেই যাই। ওর পরামর্শ আমরা নিতে পছন্দ করি। ওর অনেক পরামর্শ হয়তোবা আমার জন্য ভালো, লিটনের জন্য ভালো নাও হতে পারে। এটা ব্যক্তির ওপর নির্ভর করে। ও এমন একজন ব্যক্তি সবাইকে সাহায্য করার চেষ্টা করে। আমাকেও চেষ্টা করেছে। সত্যি কথা বলতে, কাল আমি এমন কোনো কিছু পরিবর্তন করিনি যেটা আপানাদের বলতে হবে। সেও আমাকে একই কথা বলে আমার ওইরকম কিছু পরিবর্তন করার দরকার নেই।

প্রশ্ন: ওপেনিং ব্যাটসম্যান হিসেবে আপনি সেঞ্চুরি করলেন, লিটন করল। আরও অনেকেই আছে যারা ওপেনার হিসেবে আসতে চায়। আপনি প্রথম থেকেই ওপেনিং করে যাচ্ছেন। আপনার কি মনে হয় একজন সঠিক ওপেনিং পার্টনার নিয়মিত একজনকে পেলে আপনি ব্যাটিংটা আরও ভালো করতে পারতেন?
তামিম: ভালো একজন প্রতিষ্ঠিত ওপেনিং পার্টনার থাকলে দলের জন্য অবশ্যই ভালো। ক্রিকেট ইতিহাস তাই বলে, অন্যান্য দেশে যখনই একটা প্রতিষ্ঠিত ওপেনিং জুটি থাকে তখন ভালো হয়। আমি বললাম না লিটন অনেক ভালো করছে। আমিও যদি আরও ভালো করা শুরু করি। সব ফরম্যাটে যদি অনেকদিন ধরে জুটি গড়তে পারি এবং একসঙ্গে অনেকদিন ধরে খেলতে পারি, তাহলে আমি নিশ্চিত দল উপকৃত হবে।
প্রশ্ন: সাত হাজার রান করলেন, ওয়ানডেতে কত রান করতে চান?
তামিম: কত রান করব, কোনো সময় আমি লক্ষ্য সেট করি না। কোনো ক্রিকেটারের কাছে জানতে চওয়া হলে সে কত রান করবে, বলবে ১০ হাজার রান করবে। কিন্তু আমি কোনো সময় এটা নিয়ে চিন্তা করি না। যা হচ্ছে ওটা নিয়েই থাকতে পছন্দ করি।

প্রশ্ন: খারাপ সময়গুলোকে অতিক্রম করতে কতটা পরিণত হয়েছেন, ক্যারিয়ারের শুরু থেকে এ পর্যন্ত?
তামিম: ২০১৫ থেকে ২০১৯ সাল থেকে আমি খুব ভালো ছন্দে ছিলাম। তখনও কিন্তু অনেক সাক্ষাৎকারে বলেছি, খারাপ সময় আসবে। তখন প্রশ্ন হতো ২০১৫ সাল থেকে আপনি কিভাবে উত্তরণ ঘটিয়েছেন। আমি আবারও বললাম এরকম সময় আবারও আসবে। এটা ক্রিকেটারের জীবন। এটা সবারই কম বেশি যায়। এটাই আমি চেষ্টা করতে পারি ওই সময়টা কত দেরিতে আসে।
প্রশ্ন: লিটনের মতো আপনিও বিশ্বাস করেন কিনা ক্রিকেট একটা হতাশার খেলা?
তামিম: ক্রিকেট হতাশার খেলা বলা ঠিক না, আমার কাছে মনে হয় এটা গ্রেট লেভেল। একদিন খুশি হবেন, একদিন হতাশ থাকবেন। এটা মিশ্র অনুভূতির।








