রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) ভর্তি পরীক্ষায় একপেশে ধর্মাশ্রয়ী প্রশ্নপত্র নিশ্চিতভাবেই বিভ্রান্তিকর। এধরণের প্রশ্নপত্র প্রণয়ন হয় উদ্দেশ্যমূলক, না হয় অজ্ঞতাপ্রসূত। কিন্তু একে অজ্ঞতার পর্যায়ে ফেলে দেওয়া যাচ্ছে না কারণ যারা প্রশ্নপত্র প্রণয়নের সঙ্গে জড়িত তারা শিক্ষাজীবনের সর্বোচ্চ পর্যায় অতিক্রম শেষে সর্বোচ্চ শিক্ষালয়ে শিক্ষাদানে নিয়োজিত। সেক্ষেত্রে এটাকে উদ্দেশ্যমূলক বলা ছাড়া উপায় কী!
এক্ষেত্রে প্রশ্ন ওঠাটা স্বাভাবিক কেন এমন হচ্ছে? কেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা তাদের নিজেদের ধর্মীয় বিশ্বাস জাতীয়ভাবে অন্যের ওপর চাপিয়ে দিতে মরিয়া? তারা সচেতনভাবেই এটা করছেন বলে ধারণা করা যায়। আর এধরণের প্রশ্নপত্র প্রণয়নের সঙ্গে কেবল একজন শিক্ষক জড়িত সেটা ভেবে নেওয়ার উপায় নাই। এটা দীর্ঘ প্রক্রিয়া এবং অনেক হাত ঘুরে তবেই চূড়ান্ত হয় প্রশ্নপত্র প্রণয়ন। সেক্ষেত্রে ভর্তি কমিটির কারোরই দায় এড়ানোর সুযোগ নেই। ভর্তি কমিটির রিপোর্টিং অথরিটি হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের ওপরও এর দায় বর্তায়। তারা কেবল তদন্ত কমিটি, শোকজ আর সাময়িক শাস্তিপ্রদানের মাধ্যমে যদি পুরো বিষয়টির দায়সারা সমাধা করেন তবে সেটা হবে দুঃখজনক।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদে গত বুধবার (২৫ অক্টোবর) আই ইউনিটের ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্ন নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে প্রথমে সমালোচনার শুরু। এর মধ্যে ৭৬ ক্রমিকের প্রশ্নে বলা হয় “পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ গ্রন্থের নাম কি?” এ প্রশ্নে উত্তরে যে চারটি অপশন দেওয়া হয় তার মধ্যে রয়েছে (ক) পবিত্র কুরআন শরীফ (খ) পবিত্র বাইবেল (গ) পবিত্র ইঞ্জিল (ঘ) গীতা; অর্থাৎ এর বাইরে আর কোন উত্তর দেওয়ার সুযোগ নাই। তাছাড়া প্রশ্নপত্র প্রণয়নকারী নিশ্চিতভাবেই ‘পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ গ্রন্থ’ হিসেবে পবিত্র কোরআন শরিফকে নির্দেশ করেছেন, ফলে ইসলাম ভিন্ন অন্য ধর্মাবলম্বীদের কেউ যদি নিজেদের ধর্মগ্রন্থকে ‘শ্রেষ্ঠ গ্রন্থ’ হিসেবে চিহ্নিত করে উত্তর দিতেন সেক্ষেত্রে কী হতো এর ফল। প্রশ্ন যেহেতু উদ্দেশ্যমূলক ও একপেশে ধর্মাশ্রয়কে কেন্দ্র করে সেহেতু পবিত্র কোরআন শরিফ ভিন্ন অন্য কোন উত্তরকে উত্তরপত্র যাচাইকারী(গণ) সঠিক বলে মার্কস দিতেন না। এতে করে নিশ্চিতভাবেই অন্য ধর্মাবলম্বী ও নিধার্মিক (যদি কেউ উপস্থিত থেকে থাকে) শিক্ষার্থীদের প্রতি চরম অবিচার করা হতো। এটা বিশ্ববিদ্যালয়ের মত কোন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান করতে পারে না, সে অধিকারও তাদের নেই।
রাবির এই বিতর্কিত প্রশ্নের খবর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক হয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হওয়ার পর বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে তারা ‘শ্রেষ্ঠ গ্রন্থ’ সম্পর্কিত প্রশ্নের জন্যে সকলকেই মার্কস দিয়ে দেবে। এর মাধ্যমে ভর্তিচ্ছুরা হয়ত মার্কস পেয়ে গেল কিন্তু এই প্রশ্নের কারণে পুরো বিশ্ববিদ্যালয় এবং আর বিস্তৃতভাবে বললে বলা যায় দেশের পুরো শিক্ষাব্যবস্থারই মার্কস কাটা গেল।
অবাক ব্যাপার হচ্ছে এধরনের প্রশ্নের বিষয়টি কেবল সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও গণমাধ্যমের প্রতিবেদনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থেকেছে। শিক্ষাবিদ ও শিক্ষা বিষয়ক নীতিনির্ধারকদের নাড়া দিতে পারে নি। নীতিনির্ধারকদের এনিয়ে ভাবান্তর নেই। ফলে সর্বোচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ধর্মীয় বিভেদ ও বৈষম্যকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিলেও আমরা সচেতন হই নি। ফলে ধারণা করাই যায় বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভাগীয় শাস্তিমূলক কোন ব্যবস্থা নেওয়া হলেও সেটা পরবর্তীতে আর আলোচিত হবে না, মানুষজন জানবে না এধরণের ধর্মীয় বিভেদ শাস্তিযোগ্য কিছু!
বিশ্ববিদ্যালয় ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়, এটা সর্বজনীন উচ্চ শিক্ষালয়। অন্যদিকে পৃথিবীতে কোন ধর্মই সার্বজনীন কিছু নয়। নির্দিষ্ট কোন ধর্মকে পৃথিবীতে যত লোক ‘শ্রেষ্ঠ’ হিসেবে মনে করে তারচেয়ে বেশি লোক ওই নির্দিষ্ট ধর্মকে ‘শ্রেষ্ঠ’ মনে করে না। তারা নিজেদের ধর্ম ও ধর্মগ্রন্থকে শ্রেষ্ঠ হিসেবে মনে করার কারণে কোন একটা গ্রন্থ শ্রেষ্ঠ বিবেচিত হয় না স্বাভাবিকভাবেই। এটা কেবল ইসলাম ধর্মই না, খ্রিষ্ট্র, বৌদ্ধ, হিন্দু, ইহুদি সকল ধর্মের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। সে হিসেবে পৃথিবীর কোন ধর্মেরই ধর্মগ্রন্থ পৃথিবীর ‘শ্রেষ্ঠ গ্রন্থ’ নয়। রাবির প্রশ্নপত্রে উল্লেখিত পবিত্র কোরআন, বাইবেল, গীতা কিংবা ইঞ্জিল ধর্মগ্রন্থও ওই একই পর্যায়ে পড়ে। এখানে প্রশ্নপত্র প্রণয়নকারী, ভর্তি কমিটি কিংবা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে পবিত্র কোরআন শরিফ কিংবা অন্য ধর্মগ্রন্থকে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ বলে মনে হলেও আদতে সেটা নয়। পৃথিবীর অধিকাংশ লোক যে সব ধর্মীয় গ্রন্থকে ‘শ্রেষ্ঠ’ হিসেবে মানে না, মনে করে না সেখানে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন কেন ভুল শিক্ষা অথবা ভুলভাবে বিষয়টিকে উপস্থাপন করবে? এটাকে কেবল অজ্ঞতা হিসেবেই ভেবে নিলে ভুল হবে, এটা সচেতন বিভ্রান্তি ও একপেশে বার্তা। যা অপরাধের পর্যায়ভুক্ত ভাবলেও অত্যুক্তি হবে না।
রাবির ভর্তিপরীক্ষার প্রশ্নপত্রে পবিত্র কোরআন শরিফকে উদ্দেশ করে ‘পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ গ্রন্থ’ হিসেবে প্রশ্ন করার কারণে মানুষের সমালোচনা ও বিতর্ককে ইসলাম ধর্মের প্রতি সমালোচনা বলে মনে করার কারণ নাই। এখানে সাধারণ ধর্মপ্রাণ মানুষের কোন দায় ছিল না, কিন্তু অতি-উৎসাহী উদ্দেশ্যপ্রবণ কিছু বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কারণে বিতর্কিত হলো কিছু মানুষের ধর্মীয় বিশ্বাস; প্রশ্নবিদ্ধ হলো ধর্মীয় গ্রন্থকে ‘শ্রেষ্ঠ গ্রন্থ’ মনে করার জায়গাটুকু। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের ব্যক্তিগত ধর্মীয় বিশ্বাসকে সকলের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার এই প্রবণতা আমাদের ক্রমক্ষয়িঞ্চু মূল্যবোধের পরিচয়ের স্মারক।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষার এই প্রশ্নপত্র কিছু শিক্ষকের ব্যক্তিগত ধর্মীয় বিশ্বাস আর বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের অবহেলাজনিত ভুল ভাবতে চান অনেকেই, কিন্তু এর পথপরিক্রমায় দৃষ্টিপাত করলে এটাকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলে মনে হবে না। গত কবছরে আমাদের সমাজ, রাজনীতি, শিক্ষাব্যবস্থায় ধর্ম জেঁকে বসার ফলাফল এটা। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে শিক্ষাব্যবস্থায় ইসলামীকীকরণের একটা প্রবণতা রয়েছে। ধর্মাশ্রয়ী সংগঠন হেফাজতে ইসলামের প্রেসক্রিপশন অনুযায়ি সরকার পাঠ্যবই থেকে অমুসলিম লেখকদের লেখা বাদ দিয়েছে। পাঠ্যবইয়ে মেয়েদের শেখান হচ্ছে পর্দা প্রবণতা। শিক্ষাব্যবস্থায় সংস্কার না এনে কওমি মাদরাসার সনদকেও বিশ্ববিদ্যালয়ের সমমান দেওয়া হয়েছে। খোদ শিক্ষামন্ত্রী জানাচ্ছেন, মাদরাসার শিক্ষাই প্রকৃত শিক্ষা, আর ওখান থেকে পাস করে কেউ রডের পরিবর্তে বাঁশ দেবে না- সহ অনেক স্তুতিবাক্য যা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অপ্রাসঙ্গিক।
শিক্ষা ব্যবস্থার নীতিনির্ধারকগণের মুখ থেকে, তাদের গৃহিত উদ্যোগে যখন অপ্রাসঙ্গিকভাবেও ধর্ম বিশেষত ইসলাম ধর্মের নাম চলে আসে সেখানে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের এধরনের প্রশ্নপত্র আর অস্বাভাবিক মনে হয় না। এই ধারা যদি আমাদেরকে এগিয়ে নিত তাহলে হয়ত প্রশ্ন ওঠত না, কিন্তু সেটা আমাদেরকে পিছিয়ে দিচ্ছে ক্রমশ বলেই শঙ্কা ঘনীভূত হচ্ছে।
বাংলাদেশে ধর্মীয় শিক্ষা আর সাধারণ শিক্ষার যে দুই ধারা চলমান সেখানে সাধারণ শিক্ষাকে ধর্মীয় আলখাল্লায় ঢাকলে আখেরে আমাদের ক্ষতি। ধর্মীয় শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণহীন সেই শুরু থেকেই, এবার বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের উচ্চ শিক্ষাও কি তবে নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেল- শঙ্কা স্বাভাবিকভাবেই। এ শঙ্কা দূর করার দায়িত্ব যাদের এনিয়ে তাদের ভাবান্তর নেই।
বিশ্ববিদ্যালয় মাদরাসা নয়। ওখানে বিভিন্ন ধর্মের এবং নিধার্মিক শিক্ষার্থীগণ শিক্ষা গ্রহণের জন্যে যায়। তাই বিশ্ববিদ্যালয়কে বিশ্ববিদ্যালয়ের মর্যাদায় রাখুন, মাদ্রাসা পর্যায়ে নামাবেন না।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে)








