মঙ্গলবার রাতে একক নৈপুণ্যে নিজের দল আর্জেন্টিনাকে আগামী বিশ্বকাপের মূলপর্বে পৌঁছে দিয়েছেন লিওনেল মেসি। তার খেলায় মুগ্ধ হয়নি এমন ফুটবলপ্রেমী পাওয়া কঠিন। ‘ফুটবল শত্রু’ দেশের ব্রাজিলিয়ানদের মুখেও মেসি-বন্দনা। আর উল্লসিত আলবিসেলেস্তা কোচ বলেছেন, মেসি নয়, ফুটবলই বিশ্বকাপের জন্য তার কাছে ঋণী।
‘মেসি এই পৃথিবীর কেউ না, সে অন্য গ্রহ থেকে এসেছে। মেসি আসলেই ভিনদেশি’ -ম্যাচ শেষে আর্জেন্টিনার রাজধানী বুয়েন্স আয়ার্সের একটি বারে বসে ক্ষুদে জাদুকরকে নিয়ে এমনই মন্তব্য ২৮ বছরের ব্রাজিলিয়ান মার্কো মৌরাসের।
ম্যাচের প্রথম মিনিটে আর্জেন্টিনা যখন গোল হজম করে তখন বুয়েন্স আয়ার্সের বার, রেস্তোরাসহ সমস্ত জায়গায় শ্বশানের নীরবতা। পুরো আর্জেন্টিনা জুড়ে বিষাদের নিঃশ্বাস। বাছাইপর্বটা জঘন্যভাবে কাটায় হারের শঙ্কায় ছিল সবাই। কিন্তু মেসির ম্যাজিক ও ভেলকিতে উড়ে যায় সব আশঙ্কা।
দলের অবস্থার কারণে ২-১ ব্যবধানে এগিয়ে থেকেও স্বস্তিতে ছিল না আর্জেন্টাইনরা। ৩৫ বছরের লাত্তারো গঞ্জালেস সেই উদ্বিগ্নদের একজন, ‘২-১ যথেষ্ট ছিল না। তাই আমরা শান্তও ছিলাম না।’
গঞ্জালেসের পাশেই বসে নিজেকে ‘সেন্ট মেসি’ বা মেসির দূত দাবি করে ম্যাক্সিমিলিয়ানো লা কাসা বলেন, ‘ঈশ্বরকে ধন্যবাদ যে আমরা তাকে পেয়েছি।’
মেসি দ্বিতীয়ার্ধে হ্যাটট্রিক পূর্ণ করলে নীল-সাদা শার্টের গৌরব পুনরুদ্ধার হয়। এটা আর্জেন্টিনার বাড়িতে বাড়িতে আবার বিশ্বাস ফিরিয়ে আনে।
শুধু ইকুয়েডর নয়, মেসির কাছে কিছুক্ষণের জন্য হেরেছে আইরিশ রকার্সে ইউ-টুও। বুয়েন্স আয়ার্সের কাছে লা প্লাটা স্টেডিয়ামে ভক্তদের অনুমতির জন্য তাদের কনসার্ট শুরু হতেও বিলম্ব হয়। পরে খেলা শেষে হয় কনসার্ট।
বুয়েন্স আয়ার্সের যেখানেই টেলিভিশন সেট ছিল সেখানেই ছিল মানুষের উপচে পড়া ভিড়। শহরের রাস্তাগুলো ছিল ফাঁকা আর শুনশান। দেখে মনে হচ্ছিল কারফিউ চলছে।
খেলার দিন আর্জেন্টাইনরা সাধারণত দেশের জার্সি পরে। কিন্তু এদিন এই সংখ্যা ছিল খুবই কম। কারণ হয়ত আর্জেন্টিনার মানুষ আদতে নিরর্থক বিশ্বাসে ক্লান্ত হয়ে উঠছিল।

দলের হতাশাজনক পারফরম্যান্সের কারণে বেশিরভাগের কাছে জয়টা খুব কল্পনাপ্রসূত ছিল। যেখানে ২০০১ সাল থেকে কোনও ম্যাচ জেতেনি, সেই কিটোতে একটা জয় সমর্থকদের নিঃশ্বাস-প্রশ্বাস ধরে রেখেছে।
শুধু বুয়েন্স আয়ার্স বা পুরো আর্জেন্টিনায় নয়, তারা যে এদিন অসম্ভব কিছু করতে পারবে এমন বাস্তব প্রত্যাশা বিশ্বের কোথাও কেউ করতে পেরেছিল কিনা সেটাও প্রশ্ন সাপেক্ষ। অনেকের এমন মনে হচ্ছিল যে আগামী বছরের রাশিয়া বিশ্বকাপ হবে মেসিকে ছাড়া ও বিশ্বের সেরাতম খেলোয়াড়টিকে বাইরে রেখে।
খেলা শুরুর ঘণ্টাখানেক আগেই মারিয়া কর্দোভা নামের ৬৪ বছরের এক আর্জেন্টাইন মিডিয়াকে বলছিলেন, ‘এটা খুবই জটিল। আমি দলকে রাশিয়ায় দেখতে চাই, কিন্তু একমাত্র অলৌকিক কিছুই শুধু তাদের রক্ষা করতে পারে। আমি শুধু তাদের জন্য প্রার্থনা করতে যাচ্ছি।’
সেই মন্তব্যের মাত্র ঘণ্টা দুয়েক পর কর্দোভাই গলা ফাটানো শুরু করেন ‘মাসিয়া’ (মেসি) এখন বিশ্বকাপে দলকে নেতৃত্ব দেবেন।’
আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপে যাওয়া কতটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল সেটা ম্যাচ শেষে নিজেই বলেছেন অধিনায়ক মেসি, ‘বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা নেই? তেমনটা হলে, পাগলামি বলতে হত। এই দলের ক্ষমতা আছে বিশ্বকাপে খেলার। আমরা তিন–তিনটে বড় টুর্নামেন্টের ফাইনালে ওঠার পরও সমালোচনার ঝড় বয়ে গেছে।’
মেসি যখন এমন কথা বললেন, তখন কোচ সাম্পাওলিও লুকিয়ে রাখতে পারেনি আবেগ। সেই আবেগের মুহূর্তে বলেন, ‘জানেন, ছেলেদের কী বলেছি? মেসি আমাদের বিশ্বকাপে নিয়ে যায়নি, ফুটবলই মেসিকে নিয়ে গেছে বিশ্বকাপে। বিশ্বকাপ জেতাতেই হবে, আর্জেন্টিনার কাছে মেসির এমন কোনও দায় নেই। বরং ফুটবলের কাছে মেসির একটি বিশ্বকাপ পাওনা। ফুটবলই মেসির কাছে দেনাদার। মেসির বিশ্বকাপ জেতা উচিত ফুটবলের জন্যই! আমরা লাকি, বিশ্বের সেরা ফুটবলার মেসির দেশ আর্জেন্টিনা। তার নিকটবর্তী হতে পেরে আমি সত্যিই উদ্দীপ্ত।’







