ময়মনসিংহের অটোচালক আব্দুস সামাদ এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। প্রশাসনের সকল কর্তা ব্যক্তিরা দাঁড়িয়েছে তার পাশে। তার হারানো অটোটিও সে ফিরে পেল। হঠাৎ সে কীভাবে এতো নজর কাড়া গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হয়ে উঠল? প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মুঠোফোনে এসএমএস দিয়ে তার জবাবে সামাদের এই গুরুত্ব প্রাপ্তি। ইন্টারনেটে মন্ত্রী-এমপিদের নম্বর সার্চ দিয়ে প্রধানমন্ত্রীর নম্বর পেয়ে সে তাকে মা সম্বোধন করে এসএমএস দেয়।
সামাদের এসএমস এর গুরুত্ব পাওয়ায় প্রধানমন্ত্রীকে অভিনন্দন। ইতোমধ্যেই দেশের বিভিন্ন স্তর হতে তাকে মা সম্বোধনে ডাকা শুরু হয়ে গেছে। সরল দৃষ্টিতে এই ডাকটি মধুর হলেও রাজনীতিতে মাতৃত্ব ও পিতৃত্বের আবেগ সুফলের চেয়ে কুফলই ডেকে আনে বেশি। সামাদের এসএমএসে এটাও বুঝা গেল প্রধানমন্ত্রী ছাড়া নির্ভর করার মতো কেউ নেই। তার অটোরিক্সা হারালো। থানায় জিডি করল। এলাকার সবাইকে বলল। কই কেউতো তার সমস্যার সমাধান করে দিলো না? সামাদের এলাকায় কি প্রধানমন্ত্রীর দলীয় নেতারা ছিল না?প্রধানমন্ত্রীর ভূমিকা গ্রহণে তাদের কিছু লজ্জা হয়নি? অবশ্য এ দেশে এরকম লজ্জার সংস্কৃতি আজও গড়ে ওঠেনি।
সংবাদপত্রে ময়মনসিংহ পুলিশ সুপার সৈয়দ নূরুল ইসলাম জানান, মোবাইল ফোনে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে নির্দেশ পাওয়ার পর তাৎক্ষণিক অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ক্রাইম এস এ নেওয়াজী এবং তারাকান্দা থানার ওসি মাহবুবুল হককে অটোরিকশা চালক এম এ সামাদকে খুঁজে বের করে বিস্তারিত জেনে ব্যবস্থা নেয়ার জন্য নির্দেশ প্রদান করেন। তাদের দেয়া তথ্যের ভিত্তিতে পুলিশ সুপার জানতে পারেন তারাকান্দা উপজেলার শিমুলিয়া গ্রামের হাজী সামছুদ্দিনের ছেলে আব্দুস সামাদ তার নিজের অটোরিকশাটি গত ২৮ মে সারাদিন ভাড়া চালিয়ে রাতে উপজেলার গোয়াতলার শশা বাজারে জুলহাস ফকিরের গ্যারেজে ব্যাটারি চার্জের জন্যে রেখে যান। পরদিন সকালে অটোরিকশা নিতে এসে রিকশাটি সেখানে না পেয়ে গ্যারেজের মালিক জুলহাস ফকিরকে জিজ্ঞাসা করলে তিনি কিছু বলতে পারেনি। এবং কিভাবে হারিয়েছে সে ব্যাপারেও কোনো উত্তর দেয়নি।
এ ব্যাপারে সামাদ তারাকান্দা থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করেন। পরে পুলিশ সুপার ২০ জুন গ্যারেজের মালিক জুলহাসকে ডেকে এনে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ করার পর সে দরিদ্র অটোচালক সামাদকে নতুন একটি অটোরিকশা কিনে দিতে রাজি হয়। এরপর তাকে ছেড়ে দেয়া হয়। গ্যারেজ মালিক নতুন একটি অটোরিকশা পুলিশের কাছে হস্তান্তরের পর বৃহস্পতিবার দুপুরে ময়মনসিংহের পুলিশ সুপার সৈয়দ নূরুল ইসলাম দরিদ্র অটোরিকশা চালক এম এ সামাদের কাছে হস্তান্তর করে।
অটোরিক্সা হারানো ব্যক্তিটির রিক্সা পেতেও যদি প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ লাগে ও অটোরিক্সাওয়ালাও যদি কেবল নির্ভর করার মত প্রধানমন্ত্রীকেই খুঁজে পায় দেশের অবস্থা কোন পর্যায়ে ঠেকল তা কি বুঝা গেল না?
সামাদের এলাকায় প্রধানমন্ত্রীর দল আছে, আছে দলীয় নেতাকর্মী ও আছে পুলিশ প্রশাসন। সামাদতো তাদের কারও উপর নির্ভর করতে পারলো না। প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর হতে নির্দেশনা না এলে সামাদের রিক্সা কি পুলিশের মাধ্যমে ফেরত পেত? এভাবে প্রধানমন্ত্রী কি পারবেন ১৬ কোটি মানুষের বিবিধ সমস্যার সমাধান করে দিতে? দেশজুড়েই চলছে এই আস্থা ও নির্ভরতার সংকট। এই সংকট ও অতি প্রধানমন্ত্রী নির্ভরতার ফল ভাল হতে পারে না।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সময়ও কৌশলে সব দায় বঙ্গবন্ধুর কাঁধে দিয়ে একটি কথা চালু করা হয়েছিল।কথাটি ছিল একনেতার একদেশ, বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশ। বঙ্গবন্ধু ছিলেন দলীয় প্রধান ও মন্ত্রিপরিষদের প্রধান। ১৫ আগস্টের খুনীরা দলকেও টার্গেট করেনি, তার মন্ত্রিপরিষদকেও টার্গেট করেনি। তারা টার্গেট করেছে ব্যক্তি মুজিব ও তার পরিবারকে। কারণ তারা ধরেই নিয়েছিল সকল ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। আজকে শেখ হাসিনার আস্থাভাজন ব্যক্তিদের মধ্য থেকেও সেদিন বঙ্গবন্ধু হত্যার পর খুনী মুশতাক চক্রের সমর্থনে ছিল। বঙ্গবন্ধুর আস্থাভাজন থেকে বঙ্গবন্ধুকেই হত্যা করেছে তারা। শেখ হাসিনার বেলাতেও যে অনুরূপ আস্থাভাজন নেই তার কি কোন নিশ্চয়তা আছে?
দেশে ও বিদেশে শেখ হাসিনাকে মহাক্ষমতাধর হিসাবে তুলে ধরা হচ্ছে। মন্ত্রী-এমপিরাও কোন ব্যাপারে কোন ভূমিকা নিলে তা তারা প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশেই তা করছে বলে প্রচার করছে। যার দরুণ তারা নিজেরা থাকছেন দায়মুক্ত আর সব দায় চলে যাচ্ছে শেখ হাসিনার উপর। যে কোন সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কেন বলা যাচ্ছেনা এগুলো মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্ত, আওয়ামী লীগের দলীয় সিদ্ধান্ত কিংবা ১৪ দলের সিদ্ধান্ত? কেন সব দায় একজনের উপর চাপিয়ে দিয়ে এমন ধারণা পরিস্কার করা হচ্ছে যে আওয়ামী লীগকে ও ১৪ দলকে ক্ষমতা হতে নামাতে হলে টার্গেট করতে হবে আওয়ামী লীগ কিংবা ১৪ দলকে নয় টার্গেট করতে হবে শেখ হাসিনাকেই।
ব্যক্তির এই চরম ক্ষমতার প্রচারের ফল কি শুভ না অশুভ? এ বিষয়ে নীতিনির্ধারকদের ব্যাখ্যা কী? হয়ত তারাও বলবেন আমরা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশেই নীতি নির্ধারণ করছি। এভাবেই সর্বত্র শেখ হাসিনাকে একচ্ছত্র ক্ষমতার অধিকারী বানানো হচ্ছে। মন্ত্রিসভায় কে যাবে শেখ হাসিনা জানে। সংসদ সদস্য পদে কে মনোনয়ন পাবে শেখ হাসিনা জানে। কথিত বন্দুকযুদ্ধ বন্ধ হবে না চলবে শেখ হাসিনা জানে। কোটা সংস্কার হবে কি হবে না তাও শেখ হাসিনা জানে। নন এমপিও শিক্ষকদের দাবী মানা হবে কি হবেনা তাও শেখ হাসিনা জানে। শিক্ষকরাও শিক্ষামন্ত্রীর প্রতি দাবী না জানিয়ে প্রধানমন্ত্রীর প্রতিই জানাচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রী একজন দরিদ্র অটোচালকের এসএমএসের গুরুত্ব দিলেন। এ থেকে কি অন্য মন্ত্রী-এমপিরা কোন শিক্ষা নেবেন? তাদের সাথে কথা বললেতো পিএস-এপিএসদের অনুমতি লাগে। অটোচালকের ফোন ধরবেন অথবা তার এসএমএসের গুরুত্ব দেবেন এমন কেউ কি আছে? কোন মন্ত্রী কি এপর্যন্ত কোথাও এমন কোন নজির স্থাপন করতে পেরেছে? প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের কোন কর্মকর্তা কি কোন সাধারণ মানুষের ফোন ধরেন অথবা এসএমএসের জবাব দেন কখনো?
প্রধানমন্ত্রীর এই রীতিটা সকলের মধ্যে চালু হলে মানুষের ভোগান্তি অনেক কমে যেত। ময়মনসিংহের পুলিশ সুপারসহ দেশের সকল পুলিশ সুপার সাধারণ মানুষের ফোন কিংবা এসএমএসকে গুরুত্ব দেবেন এখন হতে? মন্ত্রী এমপিরা কি প্রতিদিন একবার করে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পড়বেন এসএমএসের ইনবক্স? এমনটি ঘটলে দেশবাসীর কাছে মন্ত্রী-এমপিদের ভাবমূর্তি উজ্জ্বলতর হত ও বাড়তো তাদের জনসমর্থন।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)








