জেএসসি, এসএসসি ও এইচএসসি’র মত পাবলিক পরীক্ষাগুলোর রেজাল্ট সরকার নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে প্রকাশ করতে পারছে। বিগত কয়েক বছর ধরেই এই রেকর্ড অক্ষুণ্ণ রয়েছে । এতে সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় কিছু মানুষের বেশ বাহবা নিচ্ছে এবং নিজেরাও আত্মতৃপ্তিতে ধন্য হচ্ছে।
বর্তমানে এসএসসি ও এইচএসসিসহ সমমানের পাবলিক পরীক্ষার রেজাল্ট দুই মাস অর্থাৎ ষাট দিনে এবং জেএসসি ও সমমানের পরীক্ষার রেজাল্ট দেওয়া হচ্ছে মাত্র ত্রিশ দিনের মধ্যে। সাম্প্রতিককালে বিভিন্ন বোর্ডের অধীনে অনুষ্ঠিত পাবলিক পরীক্ষার রেজাল্ট নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রকাশ এবং পাসের ধারাবাহিক উচ্চহার ও রেকর্ড সংখ্যক জিপিএ-৫ নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হলেও সরকার একে তাদের সাফল্য হিসেবেই দেখছে।
এসব পরীক্ষার ফলাফল নিয়ে সরকারের শীর্ষ ব্যক্তি পাবলিকলি তার সরকারের বিরাট ক্রেডিট হিসেবে প্রচার করায় শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উৎসাহিত হচ্ছেন এবং পাসের হার আরো কিভাবে বাড়ানো যায় সে ব্যাপারে বেশি মনযোগি হয়েছেন। সম্ভবত একারণেই উল্লেখিত পরীক্ষায় পাস-ফেলের হার নিয়ে তাদের মাথা ব্যথাটা ইদানিং অনেকের কাছেই দৃশ্যমান হয়ে উঠে। এ ব্যাপারে শিক্ষাবোর্ডগুলোর নজিরবিহীন তৎপরতা দেশের সাধারণ মানুষের নজরে না এলেও পরীক্ষা সংশ্লিষ্ট অনেকের কাছেই তা অত্যন্ত স্পষ্ট।
জেএসসি, এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার পর সাধারণত উত্তরপত্র মূল্যায়নের জন্য পরীক্ষক হিসেবে নিযুক্ত শিক্ষকদের বোর্ডে ডাকা হয়। এসব ‘ওয়ার্কশপে’ বোর্ড কর্মকর্তাদের বিবৃত নির্দেশনাগুলো পর্যালোচনা করলে উপরিমহলের এসংক্রান্ত মাথা ব্যথার সিম্পটমগুলো অনুধাবন করা যায়। বোর্ডের সর্বোচ্চ কর্মকর্তাসহ অন্যান্য কর্মকর্তাদেরর কাছ থেকে প্রাপ্ত নির্দেশনাগুলো পরীক্ষক-শিক্ষকদের অনেকের কাছে বিব্রতকর ঠেকলেও তাদের কিছুই করার নেই । তাই বাধ্য হয়ে এসব পরীক্ষক-শিক্ষকদের হুকুম তামিল করতে হয়।
এ প্রসঙ্গে কিছু বিষয়ের অবতারণা না করলেই নয়। বোর্ডে গিয়ে উত্তরপত্র সংগ্রহের কথায় আসা যাক। নির্ধারিত দিনে বিষয়ভিত্তিক একজন শিক্ষকের জন্য ৭০০ থেকে ৮০০ পর্যন্ত উত্তরপত্র বরাদ্দ থাকে। তবে, শিক্ষকের আগ্রহের ভিত্তিতে এই সংখ্যা ১০০০ বা তারচে’ বেশিও হতে পারে। বর্তমানে জেএসসি পরীক্ষার উত্তরপত্র বিতরণ করা হচ্ছে।
আমার পরিচিত বেশ কয়েকজন শিক্ষক উপরোল্লিখিত সংখ্যায় উত্তরপত্র উত্তোলন করেছেন। যেহেতু, একেকটি উত্তরপত্রের জন্য একটি নির্দ্রিষ্ট পরিমাণ টাকা সম্মানির ব্যবস্থা রয়েছে, তাই অনেক শিক্ষক নীতি-নৈতিকতা কিংবা সামর্থের কথা চিন্তা না করে শুধুমাত্র ‘সম্মানি’র পরিমাণ বাড়ানোর উদ্দেশে হাজার-বারশো উত্তরপত্র নিয়ে বাড়ি ফিরেন।
এ ব্যাপারে কয়েকজন শিক্ষকের সাথে কথা বলা জানা গেছে, যারা প্রত্যেকেই ৮০০ থেকে ১০০০টি উত্তরপত্র সংগ্রহ করেছেন। এসব উত্তরপত্র মূল্যায়নের জন্য নির্ধারিত সময় দেওয়া হয়েছে মাত্র ১০ দিন। এই দশ দিনের মধ্যে তাদের কাছে সরবরাহকৃত উত্তরপত্র ‘মূল্যায়ন’ করে তারপর খাতা সমেত ওএমআর শীট দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার (হেড এক্সামিনার) বরাবরে অবশ্যই পৌঁছাতে হবে।
উল্লেখ্য, একজন পরীক্ষককে শুধুমাত্র এই স্বল্প সময়ের মধ্যে উত্তরপত্র মূল্যায়ন করলেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। প্রতিটি উত্তরপত্রের কভার পেজের একটি নির্দ্রিষ্ট জায়গায় প্রশ্নপত্রের নং এর সিরিয়াল অনুযায়ী প্রাপ্ত নম্বর উঠানোসহ ওএমআর শীটে পরীক্ষার্থীর রোল ও রেজিষ্ট্রেশন নম্বর সহ পরীক্ষায় প্রাপ্ত মোট নম্বর বৃত্ত ভরাট করে পূরণ করতে হয়। এছাড়াও পরীক্ষার্থীর উত্তরপত্র মূল্যায়ন করতে গিয়ে কোন ধরনের ভুল-ভ্রান্তি হলে তার জন্য আলাদা নোট লিখে দিতে হয়।
এখন প্রশ্নহোল, ৮০০, ১০০০ কিংবা তারচে’ বেশি উত্তরপত্র মূল্যায়নের জন্য মাত্র ১০/১২ দিন সময় কি যথেষ্ট? একজন পরীক্ষককে পাবলিক পরীক্ষার একটি খাতা সঠিকভাবে মূল্যায়ন করতে হলে কমপক্ষে ৪০ থেকে ৫০ মিনিট সময়ের প্রয়োজন। তাও আবার, এভাবে একাধারে ১০/১২টির বেশি উত্তরপত্র মূল্যায়ন করা সম্ভব নয়। বিষয়টিকে গাণিতিক ভাবে দেখলে দেখা যায়, ১০০০টি উত্তরপত্র প্রতিটি ৪০ মিনিট ধরে মূল্যায়ন করা হলে মোট ৪০,০০০ মিনিট বা ৬৬৭ ঘণ্টা কিংবা প্রায় ২৮ দিন লাগার কথা ।
যদিও বোর্ড কর্তৃক সময় বরাদ্দ করা হয়েছে মাত্র ১০ দিন বা ২৪০ ঘণ্টা কিংবা ১৪,৪০০ মিনিট! তাহলে বিষয়টি কী দাঁড়ায়? এত অল্প সময়ে এত সংখ্যক উত্তরপত্র কি সত্যিই ‘মূল্যায়নের’ জন্য দেওয়া হয়েছে? নাকি পরীক্ষক হিসেবে নিযুক্ত শিক্ষকদের দিয়ে যেন তেন ভাবে কভারপেজে কেবল নম্বর বসিয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্যে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে?এই অল্প সময়ের মধ্যে আট-নয়শো কিংবা এক হাজার উত্তরপত্র কেমন মূল্যায়ন হয়, তার জন্য কোনো গবেষণার দরকার পড়ে না।
যেকোন সচেতন মানুষ পুরো বিষয়টি একটু খোঁজখবর নিলেই আঁচ করতে পারেন, পরীক্ষার নামে বিশাল আয়োজনে আসলে কী করা হয়! প্রশ্নহলো, কেন করা হয়? কি লাভ হচ্ছে এসব ‘সাফল্য গাঁথা’র বয়ান করে? শুধু জেএসসি নয়– প্রায় সকল পাবলিক পরীক্ষারই সাধারণ চিত্র এটি! একবার চিন্তা করা যায়, কী ভয়ানক আত্মঘাতী খেলায় মেতেছি আমরা! আত্মবিনাশি এমন খেলার পরিণতি কি হতে পারে, তার জন্য ভাববার কেউ নেই? সবাই রেকর্ডের তালিয়া বাজাতে মরিয়া।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মত অতি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়কে এমন নির্বোধ প্রতিযোগিতায় শামিল হতে হবে কেন? অল্প দিনে রেজাল্ট দেওয়ার ‘কৃতিত্বের’ চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো, উপযুক্ত ও সঠিক মানদণ্ডে পরীক্ষার রেজাল্ট প্রকাশ করা। কিন্তু প্রচলিত রেজাল্ট পদ্ধতিতে আমাদের পরীক্ষার্থীদের মেধা ও উপযুক্ততা আসলে কতটা যাচাই করা হয়, সেটা এখন অনেকের অস্বস্থি ও দুশ্চিন্তার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কারণ বিভিন্ন পাবলিক পরীক্ষার রেজাল্ট প্রকৃতপক্ষে কতটুকু ‘রেজাল্ট’ আর কতটুকু ‘ভেজাল’ তা নিয়ে দিন দিন সাধারণ মানুষের মনে সন্দেহ দানা বাঁধছে। ছেলেমেয়েদের ভবিষ্যত নিয়ে গভীরভাবে শংকিত অভিভাবকদের মনে সঞ্চারিত এই সন্দেহের দায় থেকে যেহেতু সরকার মুক্ত হতে পারে না, সেহেতু সরকারকেই এই দায়মুক্তির দায়িত্ব নিতে হবে।
মনে রাখতে হবে, আমাদের ভবিষ্যত প্রজন্মকে একটি ‘মেধা নির্ভর’ জাতিতে রূপান্তরিত করতে সরকারের সংশ্লিষ্ট সকল মহলকেই এসব ছেলে-খেলা থেকে সরে আসতে হবে। এবং তা জাতির বৃহত্তর স্বার্থেই।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)







