২৪ বছরের তরুণী রাইসা (ছদ্মনাম)। ছিপছিপে লম্বা। গৌরবর্ণ। চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা আটা। বইয়ের পোকা। বাবা-মায়ের সঙ্গে ছোট থেকেই আমেরিকায় বসবাস। স্কুল থেকে স্নাতক পর্যন্ত লেখাপড়া সেখানেই ।
বাবা ব্যবসায়ী। দুই ছেলে-মেয়ে নিয়ে বাবা-মায়ের স্বচ্ছল পরিবার। দুই ভাই বোনের মধ্যে রাইসা ছোট।
মেধাবী রাইসা ছোট থেকেই পড়াশোনায় সবার থেকে এগিয়ে। বই-ই তার ধ্যান-জ্ঞান। শিক্ষায় অসাধারণ সাফল্যের জন্য বিভিন্ন অ্যাওয়ার্ডে ভূষিত হয়েছে ।
তবে এই রাইসার জীবনে মাদকের ভয়াবহ ছোবল উল্টে-পাল্টে দেয় সব হিসেব নিকেশ। মাদকের ভয়াল থাবায় বিপদগ্রস্ত হয়ে যায় তার জীবন। ভুক্তভোগি হয় পুরো পরিবার।
মেয়ের এই করুণ দশায় পাগলপ্রায় বাবা-মা।
অামেরিকায় থাকাকালেই স্বল্পমাত্রায় অ্যালকোহল পান করতেন রাইসা। কিন্তু আসক্তি ছিল না। তবে বাংলোদেশে আসার পর মাদকাসক্ত হয়ে পড়েন। ধীরে ধীরে তা ভয়াবহ আকার ধারণ করে।
অামেরিকায় থাকা অবস্থাতেই ফেসবুকে পরিচয় হয় বাংলাদেশের এক ছেলের সঙ্গে। পরিচয় এক সময় গড়ায় বন্ধুত্বে। তারপর বাংলাদেশে আসার পর সেই বন্ধুত্ব মোড় নেয় প্রেমে।
সেই প্রেমই কাল হয়ে দাঁড়ায় রাইসার জীবনে। তার প্রেমিক ছিল মাদকাসক্ত। আর তার সঙ্গে মেলামেশা করতে গিয়ে রাইসাও একসময় পা বাড়ায় মাদকের অন্ধকার পথে। ইয়াবায় আসক্ত হয়ে পড়েন রাইসা।
বদলে যেতে থাকে আচরণ। অকারণে সন্দেহ করতে থাকে মাকে। বন্ধ করে দেয় খাওয়া-দাওয়া। চারপাশের সবাইকে ভাবতে শুরু করে শত্রু।
জন্মদাত্রী মা খাবারে বিষ মিশিয়েছে এই সন্দেহ তীব্র থেকে তীব্র হতে থাকে দিন দিন। অকারণে শুরু করে চিৎকার, ভাঙ্গতে শুরু করেন বাসার জিনিসপত্র। এমনকি রাগের বশে একদিন মায়ের গায়ে হাত তোলেন রাইসা।
মেয়ের এ অবস্থা দেখে ঘাবড়ে যান বাবা-মা। তবে সচেতন বাবা-মায়ের বুঝতে খুব বাকি থাকে না যে মাদকের অন্ধকার পথে পা বাড়িয়েছে তাদের মেয়ে।
পাঁচ মাস হল বাংলাদেশে এসেছেন রাইসা। এর মধ্যে গত ২ মাস যাবৎ আছে মাদকাসক্ত নিরাময় কেন্দ্রে।
রাইসা যে চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে রয়েছে সেই চিকিৎসক ডা. আলী এ. এ কোরেশি চ্যানেল অাই অনলাইনকে বলেন: রাইসাকে দেখে বোঝার উপায় নেই সে মাদকাসক্ত। বাংলাদেশে আসার পরপরই মাদকে জড়িয়ে পড়ে। বেশিরভাগ সময়ই চুপচাপ বসে থাকে । পরিবারের কারো সাথে ঠিকমত কথা বলতে চায়না। কাজিনরা দেখা করতে আসলেও তাদের দেখা দিতে চায়না।
তবে প্রথম তাকে যে অবস্থায় পেয়েছিলাম তার চেয়ে এখন অনেক ভাল। আর এক মাসের মধ্যে পুরোপুরি একটা স্টেবল অবস্থায় চলে আসবে। তারপর বছর দেড়েকের ফলোআপ করলে পুরোপুরি স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারবে রাইসা।
বিভিন্ন গবেষণা বলছে, বাংলাদেশে মাদকাসক্তদের মধ্যে ১৬ শতাংশ নারী। এমনিতেই দেশে মাদকাসক্ত নিরাময় কেন্দ্র কম। নারীদের জন্য আলাদা তেমন কোনো ব্যবস্থা নেই। তাই কোনো মেয়ে মাদকাসক্ত হয়ে পড়লে পরিবারের সদস্যরা নিরাময় কেন্দ্রে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে আগ্রহ পাননা।
গবেষকরা বলছেন, পরিবারকে খেয়াল রাখতে হবে যাতে পরিবারের কেউ মাদকাসক্ত হয়ে না পড়ে। আর যদি একান্তই কারো মধ্যে অাসক্তি গড়ে উঠে তাহলে নিরাময় কেন্দ্রে নিয়ে যেতে হবে। না হলে একজনের কারণে ধ্বংস হয়ে যেতে পারে পুরো পরিবার।








