চ্যানেল আই অনলাইন
Advertisement
English
  • সর্বশেষ
  • বাংলাদেশ
  • আন্তর্জাতিক
  • রাজনীতি
  • খেলাধুলা
  • বিনোদন
  • অপরাধ
  • অর্থনীতি
  • আদালত
  • ভিডিও
  • জনপদ
  • প্রবাস সংবাদ
  • ফিফা ২০২৬
  • চ্যানেল আই টিভি
No Result
View All Result
চ্যানেল আই অনলাইন
En

নূরজাহান বেগম: নারী সাংবাদিকতার কারিগর

সালমা আহমেদসালমা আহমেদ
১১:৪৮ পূর্বাহ্ণ ০৩, জুন ২০১৫
মতামত
A A

‘আমারে তুমি করিবে ত্রাণ,

এ নহে মোর প্রার্থনা…’

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতা দিয়েই আজ নূরজাহান বেগমকে তাঁর জন্মদিনে স্মরণ করছি। কেনো এই কবিতাটি বেছে নিলাম সেই ঘটনাটিও একটু বলতে চাই। ২০০৪ সালের ২৮ নভেম্বর। সেদিনই নূরজাহান বেগমের সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয়। ফোন করতেই অপর প্রান্ত থেকে ভেসে এলো নূরজাহান বেগমের কন্ঠস্বর।

গবেষণার কাজে ‘বেগম’ অফিসে যেতে হবে শুনেই তিনি আমাকে বলেছিলেন- ‘এতোদূরে আসতে হয়তো তোমাকে অনেক প্রতিবন্ধকতা এবং সমস্যার সম্মুখীন হতে হবে। কারণ তুমি এখানে প্রথম আসছো এবং তুমি একজন নারী। মনে রাখবে নতুন পথের যাত্রায় অনেক বাধা আসবেই। কিন্তু যাত্রা বন্ধ করা যাবে না। তুমি যখন সেই গন্তব্যে পৌঁছে যাবে, সেখানে থেকে ফেরার পথটা তোমার জন্য অনেক সহজ হয়ে যাবে। আসার পথের সমস্যাগুলো চিহ্নিত করা সম্ভব বলেই যাবার রাস্তাটা এতোটা সুগম হয়। জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে এ কথাটি স্মরণ রেখো।’

দৃঢ় মানসিকতা সম্পন্ন আত্মপ্রত্যয়ী নূরজাহান বেগমের সঙ্গে এভাবেই প্রথম আমার পরিচয়ের সূত্রপাত। রবি ঠাকুরের ‘আত্ম ত্রাণ’ কবিতার উল্লেখিত লাইন দুটো যেন এই নারীর অন্তর্নিহিত চরিত্রকেই প্রতিফলিত করছে। ১শ’ ২৪ বছর আগে যে নারী অন্তঃপুর থেকে বোরকা খুলে বেরিয়ে ছিলেন বিদ্রোহের আগুন জ্বালাতে, সে আগুনে শুধু মহীয়সী নারী বেগম রোকেয়ার পায়রাবন্দ গ্রামই পাল্টে যায়নি, সেই প্রভাবে বদলে গেছে পুরো সমাজ।

রোকেয়া যে স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন বাংলার গৃহে বন্দী পশ্চাৎপদ নারী সমাজকে তাঁর সেই আদর্শের প্রত্যক্ষ সংস্পর্শে থেকে নূরজাহান বেগম নিজেকে গড়ে তুলেছেন একজন সফল ব্যক্তিত্ব হিসেবে। বেগম রোকেয়ার মতো নূরজাহান বেগমও পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতার বিরুদ্ধে প্রতিনিয়ত যুদ্ধ করে যাচ্ছেন। জাগিয়ে তোলার চেষ্টা করছেন সমাজে পিছিয়ে থাকা মেয়েদের। নারী একাই পথ চলতে পারে, সেই ক্ষমতাও নারীর আছে। কিন্তু যা নেই তা হলো উন্মুক্ত পথে নির্ভয়ে হাঁটার সমান সুযোগ।

Reneta

পুরুষের অসহনশীল মানসিকতা এবং অসহযোগিতা নারীর চলার গতিকে অবরুদ্ধ করছে। একে রুখতেই নূরজাহান বেগম আজো নারী জাগরণের জন্য কাজ করে যাচ্ছেন নিরলসভাবে। ৯০ বছর বয়সেও এই মহীয়সী নারী নবীন এবং তরুণ মেয়েদের অগ্রযাত্রাকে নিজের অনুপ্রেরণা ভেবে প্রতিদিন সকালে তাঁর যাত্রা শুরু করেন নতুন উদ্যমে।

শৈশবে নূরজাহান বেগম সাংবাদিকতার প্রথম পাঠ নেন তাঁর পিতা মরহুম সাংবাদিক মোহাম্মদ নাসিরউদ্দিনের কাছে। শৈশব, কৈশোর, তারুণ্যে সাংবাদিকতার সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ ছিলো প্রত্যক্ষভাবে। ছোটবেলা থেকে সাংবাদিক মোহাম্মদ নাসিরউদ্দিন একমাত্র কন্যা নূরজাহান বেগমকে বইয়ের প্রতি আকর্ষণ তৈরি করবার জন্য বিভিন্ন রঙ-বেরঙের প্রজাপ্রতির ছবির ম্যাগাজিন এনে দিতেন।

এ প্রসঙ্গে নূরজাহান বেগম বলেন-‘বাবা সব সময় আমার জন্য অনেক ছবিওয়ালা বই আনতো। সেই ছবিতে এত রঙের খেলা লুকোচুরি করতো যে, বই এর প্রতিও আমার তীব্র ভালোবাসা তৈরি হতে লাগলো’। ‘সওগাত’ পত্রিকার কাজে তিনি ছোটবেলা থেকেই পিতার সহকারী হিসাবে কাজ করেছেন। ১৯৪৫ সালে নূরজাহান বেগম ‘সওগাত’ পত্রিকার সাথে পুরোপুরি যুক্ত হয়ে কাজ শুরু করেন।

এ প্রসঙ্গে নূরজাহান বেগমের অভিমত হলো-‘এই যে আমি আজ ‘বেগম’ পত্রিকার সম্পাদক হিসেবে কাজ করছি, এটা সম্ভব হয়েছে আমার বাবার অনুপ্রেরণার কারণেই। বাবার আর্দশ এবং চিন্তা-ভাবনা দ্বারা প্রভাবিত হয়েই আমি সাংবাদিকতার কলম হাতে তুলে নিয়েছি। আমার বিশ্বাস প্রত্যেকটি মানুষকে যদি ছোটবেলা থেকেই সঠিক পথে আগ্রহ সৃষ্টি করা যায় কাজের প্রতি, তবে সেই মানুষের ভুল করবার সম্ভাবনা একেবারেই থাকবে না।

নূরজাহান বেগমের কাছ থেকে তাঁর বাবা নাসিরউদ্দিন সম্পর্কে এও জানা যায় যে-‘সত্তগাত’ প্রকাশের পূর্বে সম্পাদক নাসিরউদ্দিন জীবন-বীমা ব্যবসায়ের কর্মে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে যাতায়াত উপলক্ষে নানা ধরনের মানুষের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পান। তাঁদের সঙ্গে মেলামেশার ফলে লক্ষ্য করেন যে, কুসংস্কার ও অজ্ঞতা মুসলমান পল্লীবাসীদের আচ্ছন্ন করে রেখেছে। এ প্রসঙ্গে মোহাম্মদ নাসিরউদ্দিন তাঁর স্মৃতিকথায় এমন কিছু কথা বলেছেন, তাঁর বাবার সেই কথাগুলো আজও মনে রেখেছেন নূরজাহান বেগম।

স্মৃতিকথায় নাসিরউদ্দিন লিখেছেন, ‘নিজের সরল-মনা গ্রামবাসীদের ধোঁকা দিয়ে রুজি রোজগারের পথ বেছে নেওয়ার লোকের তখন অভাব ছিলো না। একদল শিলা- বৃষ্টি বন্ধ করার কাজে আর একদল অনাবৃষ্টিতে-বৃষ্টি নামাতে পারে বলে নিজেদের জাহির করত। মন্ত্র বলে শক্র নিধন, টাকা পয়সা চুরি গেলে ধ্যান নেত্রে চোরকে দেখে তার নাম বলা, বিচারককে মন্ত্রমুগ্ধ করে মামলায় জিতিয়ে দেওয়া, কারো বিয়ে না হলে শিগগিরই যাতে বিয়ে হয় এবং ভালো বউ পায় তার তাবিজ দেওয়া ইত্যাদি নানা ধরনের অবিশ্বাস্য ও অলৌকিক কাজের দক্ষতার কথা বলে নিরীহ গ্রামবাসীদের ধোঁকা দিত। মোট কথা, এমন কোনো কাজই ছিলো না, যা তাঁরা মন্ত্র বা তাবিজের জোরে করতে পারে না।’

সম্পাদক নাসিরউদ্দিনের স্মৃতিকথা থেকে জানা যায় বাঙ্গালি মুসলমান সমাজের এই অন্ধ কুসংস্কারে বিশ্বাস, আর্থিক দৈন্য ও সাহিত্য-সংস্কৃতির প্রতি অনীহা- এসবের বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তোলার উদ্দেশ্যেই তিনি ‘সওগাত’ প্রকাশে ব্রতী হন। তাঁর সুযোগ্য কন্যা নূরজাহান বেগম সেই মেঠো পথকে প্রশস্ত রাজপথে পরিণত করে একজন সফল সাংবাদিক হিসেবে নারী শিক্ষা বিস্তার, সমাজ সংস্কার এবং অগণিত লেখক, কবি, সাহিত্যিক এবং সাংবাদিক সৃষ্টি করে নিজেও এক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছেন।

২০০৫ সাল থেকে চলমান নূরজাহান বেগমকে নিয়ে আমার গবেষণা হতে প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণে যে সামান্য জীবন ইতিহাস জানা সম্ভব হয়েছে তাতে নূরজাহান বেগমের সংগ্রামী যে ছবি পাওয়া যায় তা সত্যিই বিস্ময়কর। এই মহীয়সী নারীর প্রত্যক্ষ সংস্পর্শে থেকে বিস্মিত হয়েছি এই মহান ব্যক্তিত্বের মধ্যে কোমল আর কঠিনের সংমিশ্রণ দেখে, আত্মত্যাগ ও পরার্থপতার দৃষ্টান্ত দেখে। আর সর্বোপরি তাঁর দৃঢ়তা ও সহনশীলতার পরিচয় পেয়ে।

নূরজাহান বেগমের উদারতার একটি উদাহরণ এই মহান মানুষটিকে বিশ্লেষণের জন্য উপস্থাপন করছি। ২০০৫ এর ৯ই এপ্রিলের ঘটনা। সেদিন ছিলো নূরজাহান বেগমের স্বামী রোকনুজ্জামান খান দাদা ভাই-এর ৮০ তম জম্মবার্ষিকী। সেই অনুষ্ঠানে নূরজাহান বেগম তাঁর নারিন্দা বাড়িটির সামনের আঙ্গিনাটুকু নারিন্দা এলাকার সংস্কৃতি বিকাশের চর্চা ক্ষেত্র স্বরূপ দান করে গেছেন। এই আঙ্গিনাটুকু এখন শুধুমাত্র নারিন্দাবাসী সাংস্কৃতিক কাজে ব্যবহার করতে পারবে। পৃথিবী যখন নিজ স্বার্থের কথা ভেবেই ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছে, তখন এই পরার্থপর নারী নূরজাহান বেগম তাঁর এলাকার ভবিষ্যৎ অগ্রগতি নিয়ে ভাবছেন।

এ প্রসঙ্গে তাঁর বক্তব্য হলো- ‘সম্পদের মোহে আজ সারা বিশ্বে অশান্তি বিরাজমান। আমাদের সবার উচিত নিজের উন্নতির সাথে সাথে অন্যদের উন্নতির পথ প্রশস্ত করা। আমি যখন থাকব না তখনো যেন এই আঙ্গিনা মানুষের পদচারণায় মুখরিত থাকে- এটাই আমার স্বপ্ন। মানুষের মাঝে আমি আজীবন বেঁচে থাকতে চাই।’

সমাজ সংস্কারক রূপে নূরজাহান বেগমকে কেবল নারী-অধিকারবাদী বলে চিহ্নিত করার প্রবণতা আমার গবেষণার প্রাপ্ত তথ্য থেকে লক্ষ্য করা গেছে। কিন্তু এভাবে নূরজাহান বেগমকে মূল্যায়ন করা হলে তাঁর কার্যকলাপের সামগ্রিক মূল্যায়ন না করে আংশিক মূল্যায়ন করা হবে মাত্র- যা আমার গবেষণায় প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে অনুধাবন করেছি । নূরজাহান বেগমের প্রত্যক্ষ সংস্পর্শে আমি অনুভব করেছি- যে কোনো সমাজের অর্ধাংশ যে নারী সমাজ সেই নারী সমাজের পশ্চাৎপদতা এবং আচ্ছন্নতা সামগ্রিকভাবে সমাজের উন্নয়ন এবং অগ্রগতির পথে যে একটি প্রচন্ড বাধা নূরজাহান বেগম সে সত্য আজীবন উপলব্ধি করছেন।

যেহেতু নিজেই সেই পশ্চাৎপদ অর্ধাংশের একজন সদস্য, সেহেতু নূরজাহান বেগম নিজ কর্মপ্রেরণা ও শক্তি ব্যয়ে তাঁকে অধঃপতনের পথ থেকে বাঁচানোর প্রচেষ্টা করেছেন। কিন্তু তাঁর পরম উদ্দেশ্যটি ছিলো নারী-পুরুষ নির্বিশেষে একই পথে সত্য-শিব-সুন্দরের দিকে অগ্রসর হবে, জ্ঞানের আলো অজ্ঞানতার অন্ধকারকে দূরীভূত করবে; সকলেই আপন আপন দায়িত্ব এবং কর্তব্য পালনে উদ্বুদ্ধ হয়ে এক আদর্শ সমাজ গঠনে সমর্থ হবে তখনই নারীর প্রকৃত মুক্তি ঘটবে। অন্যথায় নয়। বেগম রোকেয়ার সংস্পর্শে থেকে নূরজাহান বেগম তাঁর জীবনের আদর্শ ও লক্ষ্য নির্ধারণ করেছেন স্কুল জীবন থেকেই।

বেগম রোকেয়ার ‘অর্ধাঙ্গী’ প্রবন্ধের কিছু কথা নূরজাহান বেগম আজও বিশ্বাস করেন। তাঁর বিশ্বাস বেগম রোকেয়ার এই বক্তব্য যদি সমাজের নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সবাই পালন করেন তবেই সমাজে সমতা নিশ্চিত করা সম্ভব। নূরজাহান বেগমের চলার পাথেয় হওয়া বেগম রোকেয়ার সেই কথাটি হলো, ‘…আমরা সমাজেরই অর্ধ অঙ্গ। আমরা পড়িয়া থাকিলে সমাজ উঠিবে কিরূপে। কোনো ব্যক্তির এক পা বাঁধিয়া রাখিলে, সে খোঁড়াইয়া কতোদূর চলিবে? পুরুষদের স্বার্থ ও আমাদের স্বার্থ ভিন্ন নহে-একই। তাঁদের জীবনের উদ্দেশ্য বা লক্ষ্য যাহা, আমাদের লক্ষ্য তাহাই।’

আজকের বাংলাদেশে সহজেই লাখ লাখ টাকা বিদেশী কিংবা হাজার হাজার টাকা সরকারি অনুদান লাভের পটভূমিতে বসে আমরা যারা দারিদ্র্য মুক্তি ও নারী মুক্তি আন্দোলনে কাজ করি তাদের জন্য কল্পনা করাও দুঃসাধ্য যে নাসিরউদ্দিন ১৯৪৭ সালের ২০ জুলাই কলকাতায় ‘বেগম’ পত্রিকা প্রতিষ্ঠা করেন এবং সুফিয়া কামাল ও মেয়ে নূরজাহান বেগম পরম অধ্যবসায়, অক্লান্ত পরিশ্রম ও সাংগঠনিক প্রতিভার প্রতিফলন ঘটিয়ে পত্রিকাটি ঢাকায় স্থানান্তরিত করে আমৃত্যু এটি পরিচালনাই করেননি বরং এটিকে সম্প্রসারিত ও সুপ্রতিষ্ঠিতও করেছেন। তবে এই কাজে নূরজাহান বেগম নিজ মেধাবলে পত্রিকার সম্পাদনার কাজ সুদীর্ঘ ৬৭ বছর ধরে করে যাচ্ছেন। যা আমি নিজেও গবেষণা চলাকালীন সময়ে দেখেছি।

নূরজাহান বেগম ছিলেন স্বামীর প্রতি শ্রদ্ধাশীল। এই বিষয়ে নূরজাহান বেগম বলেন- ‘নারী মুক্তির অর্থে আমরা কেউ কেউ অবচেতনভাবে স্বামীকে কিছুটা তোয়াক্কা না করাকেও বুঝে থাকি। কিন্তু আমার জীবনে আমার স্বামী রোকনুজ্জামান দাদা ভাই স্বর্গের দূত হয়েই এসেছিলেন। তাঁর সঠিক সহযোগিতা আমাকে ‘বেগম’ পত্রিকায় স্থায়িত্ব প্রদান করেছে।’ তাঁর এই কথাই প্রমাণ করে তেজস্বী এই নূরজাহান বেগম অবচেতন বা সচেতনভাবে স্বামীকে ‘শক্র’ ভাবার মতো মনোভাব কোনদিন পোষণ করেননি। গবেষণা চলাকালীন সময়ে নূরজাহান বেগম বারবার বলেছেন- ‘একজন উদার পিতা এবং আদর্শ স্বামী এই দুই পুরুষই আমার জীবনে সফলতা এনে দিয়েছেন।’ তিনি প্রতিটি পরিবারে এমন বাবা ও স্বামীর প্রয়োজন আবশ্যক বলে মন্তব্য করেন। পিতা ও স্বামী যদি স্বাধীনচেতা হন, তবে নারীর আত্মনির্ভরশীলতার মাধ্যমে জীবনে প্রতিষ্ঠিত হওয়া সম্ভব।

একই সঙ্গে তিনি তাঁর মায়ের অবদানের প্রতি মাথানত করে শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করেছেন প্রতিক্ষণ। কেননা, তাঁর মা সাংসারিক দায়দায়িত্ব সব হাসিমুখেই বরণ করে বাবা এবং নূরজাহান বেগমকে কর্ম প্রেরণায় উৎসাহ যুগিয়েছেন। মায়ের অবদান প্রসঙ্গে নূরজাহান বেগম আবেগাপ্লুত কন্ঠে বলেছিলেন-‘আমার মায়ের এই সহযোগিতা না পেলে আমার কিংবা বাবা উভয়ের ধীরস্থরিভাবে কাজ করা সম্ভব হতো না। ছোটবেলা থেকে সাহস এবং উদ্দীপনার ভিত রচনাকরী আমার মা আমাকে সর্বদা মাথা উঁচু করে চলার পরামর্শ দিয়েছেন এবং দুঃস্থ নারীদের সাহায্য করতে বলেছেন।’

এভাবেই বাবা-মায়ের অকৃত্রিম সহযোগিতা এবং অনুপ্রেরণায় পর্বত সম বাধা নিয়ে নূরজাহান বেগমের যাত্রা আরম্ভ হলেও পরিণামে ‘বেগম’ পত্রিকাকে একটি শ্রেষ্ঠ এবং লেখিকা গড়ার হাতিয়ার নির্মাণ করার গৌরবে নূরজাহান বেগম অনন্য। নূরজাহান বেগম দৃঢ় মানসিক শক্তি, অনুভূতি, আবেগ সম্পন্ন নূরজাহান বেগম পেয়েছেন সাংবাদিক বাবার আদর্শ ও বন্ধুসুলভ মায়ের উৎসাহ। রোকেয়ার আন্দোলন মতাদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে এখনো সমাজ পরিবর্তনের আশায় নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন তিনি।

আমি নূরজাহান বেগমকে ‘আপা’ সন্বোধন করি। আমি এখনো তাঁর নিয়মিত অতিথি। আপা গল্প করতে খুব ভালোবাসেন। পরিচিত এবং আপনজনদের তিনি কখনো না খাইয়ে ছাড়েন না। আপার আতিথেয়তা সর্বজনবিদিত। আলাপচারিতায় তিনি এতোদিনে জেনে নিয়েছেন আমার প্রিয় খাবারের মেনু। যখনই তিনি শোনেন আমি তাঁর বাসায় আসছি, হাজির হয়েই দেখি কতো খাবারের আয়োজন। হরেক রকমের মিষ্টি সাজানো থাকে আমার জন্য। খাবার সামনে রেখে কাজ করলেই তিনি শুধু বলেন- কিরে তুই খাচ্ছিস না কেন? না খেলে শক্তি পাবি কোথায়? শক্তি না পেলে এগিয়ে যাবি কিভাবে? আমি আপার অন্তরের এতো কাছাকাছি চলে এসেছি যে, উনি আমাকে তুই সম্বোধনে সিক্ত করলেন। আপার বাসায় ১১টা বিড়াল আছে। মজার বিষয় ওদের প্রত্যেকের আলাদা নামও আছে। যদিও আপার ডাক্তার হাঁপানির কারণে বিড়ালগুলোকে সরাতে বলেছেন। কিন্তু আপা তাঁর মায়ার টানে সেগুলোকে দুরে সরাতে পারছেন না।

একদিন হলো কি, টিপু নামে এক বিড়ালকে আপা যত্নসহকারে খাওয়াচ্ছিলেন, তখন আমি সেই ছবি তোলার জন্য প্রস্তুত হতেই তিনি বিড়ালটিকে বললেন- দেখ টিপু আমার সঙ্গে তোরও ছবি তোলা হচ্ছে। এভাবেই ঘন্টার পর ঘন্টা আমরা গল্পে মশগুল হয়ে থাকতাম। গল্পের বিষয় আমাদের লেখার জগত, সাংবাদিকতা ও সাহিত্যিক জগতের বিভিন্ন খবরাখবর। এর সাথে সাথে আপার বাসা এবং অফিসের প্রত্যেকটি সদস্যের সঙ্গে আমার খুব সখ্যতা বেড়ে গেছি এবং আমি তাঁদের প্রিয় হয়ে গেছি । আপার বড় মেয়ে ফ্লোরা এবং ছোট মেয়ে মিতিসহ অনেকের সঙ্গে আমার দেখা হয় প্রায়ই। তাঁরা জেনে গেছেন আমি আপার বড়ই প্রিয় পাত্র, স্নেহভাজন। এখনো বাসায় গেলে ফিরে আসার সময় বলে ‘আবার কবে আসবি বল?’ তাঁর একথা শুনেই বলি-‘কেনো খাবার তৈরি করে রাখবেন?’ উত্তরে তিনি বলেন-‘আহা। কি রাজভোগ যেন তোকে খাওয়াই? তুই আসবি এটাই আমার আনন্দ। তখন আমি তার নিঃসঙ্গতার কষ্ট টের পাই।

আপাকে কোনদিন ক্লান্ত হতে দেখিনি। অফিসে তিনি যতোক্ষণ থাকেন ততোক্ষণ বিভিন্ন কাজে ব্যস্ত থাকেন। বাসাতেও তিনি কম ব্যস্ত নন। অফিসে তাঁর সার্বক্ষণিক সঙ্গী সাংবাদিক দিলরুবা খান। এছাড়াও অফিসে দেখাশুনার কাজে রয়েছেন আহম্মদ আলী। আমি যতোবার অফিসে গিয়েছি ততোবারই আহম্মদ আলী আপার কাজের ধরন সম্পর্কে আমাকে বলেছেন-আপা এতো যত্নশীল তাঁর কাজ যে, কোনো কিছুই ভোলেন না। সবাইকে নিজের মত কাজ করার স্বাধীনতা দিয়েছেন এবং সবাইকে খুব ভালোবাসেন। এজন্য সুদীর্ঘ কাল ধরে কাজ করার পরও তাঁকে ছেড়ে যেতে পারেননি আহম্মদ আলী।

এক রাতে হঠাৎ আপা অসুস্থ হয়ে পড়লেন। হাঁপানির কারণে শ্বাস কষ্ট বেড়ে গিয়েছিলো। দ্রুত আপাকে মনোয়ারা হাসাপাতালে ভর্তি করা হলো। আমার বাসা হাসপাতালের কাছে থাকায় আমি তাঁকে দেখতে গেলাম। রুমে ঢুকে আপার হাতে হাত রাখতেই উনি চোখ খুলে তাঁর ছোট মেয়ে মিতিকে বললেন- ‘এই মেয়েটা আমাকে নিয়ে গবেষণা করার সময় অনেক কষ্টে করছে। হয়তো আমার জীবনে এইটাই শেষ কোনো কাজ।’ আমার তখন খুব কষ্ট হচ্ছিল। আমাকে কাছে ডেকে বললেন-‘তুই আমার অনেক ছবি তুলেছিস। সব সিডি করে আমাকে দিবি। যতো টাকা লাগে তোকে দিবো, এগুলো আমার স্মৃতি হয়ে থাকবে। হয়তো তুই আমার শেষ জীবনটা গবেষণা করে গেলি।’

কিছুক্ষণ কোনো কথা বলতে পারিনি আমি। ছোট মেয়ে মিতি খুব কাঁঁদছিলো। হঠাৎ ছোট মেয়েকে ডেকে বললেন আমি ক্যামেরা আনলে ছবি তোলার জন্য। ক্যামেরা রেডি করার পর দেখি উনি শোয়া থেকে উঠে বসেছেন, হাতে স্যালাইন লাগানো। আমি উনাকে শুতে বলার সাথে সাথে উনি মৃদু হেসে ভারী গলায় বললেন-‘এখনোতো শুয়ে পড়িনি। যখন শুয়ে পড়বো তখন আর উঠবো না। কতোটা দৃঢ় এবং শক্ত মনোবল থাকলে একজন মানুষ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় এমন আত্মপ্রত্যয়ের সঙ্গে নিজের উপলব্ধি ব্যক্ত করতে পারেন! আমি সত্যি এতে বিস্মিত হই।

নূরজাহান বেগমের জীবনের মতো ৩৮ নং শরৎগুপ্তের বাড়িটিরও এখন ধীরে ধীরে বয়স বাড়ছে। বাবা, মা, স্বামী যখন ছিলেন তখনকার সেই কোলোহলমুখর বাড়িটিতে এখন একা একা জীবন যাপন করা সত্যি দুঃসহ। জীবন বয়ে চলে তার নিজস্ব গতিতে । আপনজনের না থাকার কষ্ট, বেদনা. হাহাকার দৈনন্দিন টানাপোড়নে ধীরেধীরে সহনীয় হয়ে যায়। আবারও সকাল হয়। যেতে হয় লয়াল স্ট্রীটের ‘বেগম’ অফিসে। সেখানে জমে আছে কতো লাখো মেয়ের স্বপ্ন ।

নূরজাহান বেগমের ৯০ তম জন্মদিনে আপাকে জীবনানন্দ দাশের কবিতার থেকে বলতে চাই,

‘তুমি আলো হতে আরো আলোকের পথে
চলেছো কোথায় তোমার চলার পথে কিগো তপতীর
ছায়ার মতন থাকা যায়।

হয়তো আলোর ছায়া নেই,
আলো তুমি তবুও তো-
আলো তুমি ছায়ার মনেই,
বাহিরে বিশাল ঐ পৃথিবীর জাতীয়তা অ-জাতীয়তায়
তুমি আলো।’

Channel-i-Tv-Live-Motiom

ট্যাগ: নূরজাহান বেগম
শেয়ারTweetPin

সর্বশেষ

ঠাকুরগাঁওয়ে চার স্কুলছাত্রী নিখোঁজ: উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার পর সিলেট থেকে উদ্ধার

জুলাই ১, ২০২৬

সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণে মিলবে সর্বোচ্চ ৫ লাখ পাউন্ডের অনুদান

জুলাই ১, ২০২৬

৬৮ বছরের ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় বাওয়ানী উচ্চ বিদ্যালয়ে নতুন কমিটি

জুলাই ১, ২০২৬
ছবি: সংগৃহীত

বংশী নদী দখলমুক্ত ও যানজট নিরসনের দাবিতে ধামরাই-সাভারে মানববন্ধন

জুলাই ১, ২০২৬
ছবি: সংগৃহীত

ফাইন্যান্স এশিয়ার তিন ক্যাটাগরিতে পুরস্কার পেল আইডিএলসি ইনভেস্টমেন্টস

জুলাই ১, ২০২৬
iscreenads

প্রকাশক: শাইখ সিরাজ
সম্পাদক: জাহিদ নেওয়াজ খান
ইমপ্রেস টেলিফিল্ম লিমিটেড , ৪০, শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ সরণী, তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা-১২০৮, বাংলাদেশ
www.channeli.com.bd,
www.channelionline.com 

ফোন: +৮৮০২৮৮৯১১৬১-৬৫
[email protected]
[email protected] (Online)
[email protected] (TV)

  • আর্কাইভ
  • চ্যানেল আই অনলাইন সম্পর্কে
  • চ্যানেল আই সম্পর্কে
  • চ্যানেল আই সকল সোস্যাল মিডিয়া

Welcome Back!

Login to your account below

Forgotten Password?

Retrieve your password

Please enter your username or email address to reset your password.

Log In
Bkash Stickey June 2025 Desktop
Bkash Full screen (Desktop/Tablet) Bkash Full screen (Mobile)

Add New Playlist

No Result
View All Result
  • সর্বশেষ
  • প্রচ্ছদ
  • ফিফা ২০২৬
  • চ্যানেল আই লাইভ | Channel i Live
  • বাংলাদেশ
  • আন্তর্জাতিক
  • স্বাস্থ্য
  • স্পোর্টস
  • রাজনীতি
  • অর্থনীতি
  • বিনোদন
  • লাইফস্টাইল
  • কর্পোরেট নিউজ
  • আইস্ক্রিন
  • অপরাধ
  • আদালত
  • মাল্টিমিডিয়া
  • মতামত
  • আনন্দ আলো
  • জনপদ
  • আদালত
  • কৃষি
  • তথ্যপ্রযুক্তি
  • নারী
  • পরিবেশ
  • প্রবাস সংবাদ
  • শিক্ষা
  • শিল্প সাহিত্য
  • চ্যানেল আই সকল সোস্যাল মিডিয়া

© 2023 চ্যানেল আই - Customize news & magazine theme by Channel i IT