সাতক্ষীরার কুখরালীর শেখ মোখলেছুর রহমান জনির নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় কর্তব্যে অবহেলার অভিযোগে তিন পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আইন অনুসারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে আইজিপিকে নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট।
তিন পুলিশ কর্মকর্তা হলেন- সাতক্ষীরা সদর থানার তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. এমদাদুল হক শেখ, বর্তমান ওসি ফিরোজ হোসেন মোল্লা ও উপপরিদর্শক (এসআই) হিমেল হোসেন। মঙ্গলবার বিচারপতি কাজী রেজা-উল-হক ও বিচারপতি মোহাম্মদ উল্লাহ’র হাইকোর্ট বেঞ্চ এইই আদেশ দেয়।
আদালত আদেশে আরও বলেছেন, রিট আবেদনকারী নিখোঁজ মোখলেছুর রহমানের স্ত্রী জেসমিন নাহার এ ঘটনায় থানায় সাধারণ ডায়রি (জিডি) করতে চাইলে সে জিডি নিতে নির্দেশ দেওয়া হলো। একইসঙ্গে আবেদনকারী চাইলে এ ঘটনায় আদালতে মামলাও করতে পারবেন।
আদালতে রাষ্ট্রপক্ষে শুনানি করেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল তাপস কুমার বিশ্বাস। আর আইন ও সালিশ কেন্দ্রের পক্ষে উপস্থিত ছিলেন আইনজীবী সাগুফতা তাবাসসুম।
নিখোঁজের ঘটনায় পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) দেয়া তদন্ত প্রতিবেদন উপর শুনানি নিয়ে আদালত আজ এই আদেশ দিলেন। আগামী ২৫ ফেব্রুয়ারি এ বিষয়ে পরবর্তী আদেশের জন্য দিন ধার্য করেন আদালত।
পিবিআইর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘সাতক্ষীরার কুখরালীর শেখ মোখলেছুর রহমান জনির সন্ধান বের করতে না পারা এবং তার নিখোঁজের বিষয়ে মামলা বা জিডি না নেওয়ার মাধ্যমে সাতক্ষীরা সদর থানা পুলিশ তাদের উপর অর্পিত দায়িত্ব পালনে চরম অদক্ষতা ও অবহেলার বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছে।
আইন শৃঙ্খলা বাহিনী কর্তৃক কাউকে গ্রেপ্তার করা হলে সংশ্লিষ্ট বাহিনীর কর্তব্য যথাসময়ে তাকে আদালতে উপস্থাপন করা। আর নিখোঁজের এ কাজটি কোন অপরাধী চক্রের হলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দায়িত্ব আরও বেশি। যাতে ভিকটিম ও অপরাধী চক্র উভয়কে খুঁজে বের করে আদালতে উপস্থাপন করার দায়িত্ব আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর। মানুষ নিখোঁজের অভিযোগ অস্বীকার করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তার দায় এড়াতে পারে না।’
তবে ২০১৬ সালের ৪ থেকে ৮ অাগস্ট পর্যন্ত জনি নামের কোন ব্যক্তিকে সাতক্ষীরা থানা পুলিশ কর্তৃক গ্রেপ্তারপূর্বক আটক রাখা এবং পরবর্তীতে নিখোঁজ হওয়া সম্পর্কে এমন কোন তথ্য বা সাক্ষ্য-প্রমাণাদি পাওয়া যায়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
জনি নিখোঁজের ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জড়িত নাকি আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয়ে কোন অপরাধী চক্র এ ঘটনা ঘটিয়েছে তা প্রমাণ করা যায়নি উল্লেখ করে পিবিআই বলেছে, সদর থানার তৎকালীন ওসি মো. এমদাদুল হক শেখের পরবর্তী ওসি ফিরোজ হোসেন মোল্লা তার সময়কালে অভিযোগের বিষয়ে কোন আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ না করায় নিখোঁজ জনির প্রকৃত অবস্থান জানার আরও একটি সুযোগ নষ্ট হয়েছে।
পিবিআই’র তদন্ত প্রতিবেদনের সুপারিশ অংশে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করা হয়েছে। নিখোঁজ জনির অবস্থানসহ পুরো ঘটনা পিবিআইর মাধ্যমে তদন্ত করতে গত বছরের ১৬ জুলাই নির্দেশ দিয়েছিল হাইকোর্ট।
মামলার বিবরণ থেকে জানা যায়, ২০১৬ সালের ৪ অগাস্ট রাত সাড়ে ৯টার দিকে সাতক্ষীরা শহরের নিউমার্কেট এলাকা থেকে তার স্বামী মোখলেছুর রহমান জনিকে আটক করে সাতক্ষীরা সদর থানার উপপরিদর্শক (এসআই) হিমেল হোসেন।
ওই রাতে তাদের বাড়িতে তল্লাশি করে সদর থানা পুলিশ। ৫, ৬ ও ৭ অাগস্ট থানায় গিয়ে তিনি স্বামীর সঙ্গে দেখা করে খাবারও দিয়ে আসেন। ৮ অাগস্ট থানায় গিয়ে তিনি স্বামীর সঙ্গে দেখা করতে গেলে থানা থেকে বলা হয়, মোখলেছুর রহমান জনি নামে থানায় কেউ নেই। পরে স্বামীর খোঁজ না পেয়ে তার স্ত্রী জেসমিন নাহার গত বছরের ২ মার্চ হাই কোর্টে রিট আবেদন করেন। পরে সে রিটের প্রাথমিক শুনানি নিয়ে ৬ মার্চ হাইকোর্ট রুল জারির পাশাপাশি নিখোঁজ ব্যক্তির বিষয়ে সাতক্ষীরা পুলিশ সুপারকে ব্যাখ্যা জানাতে নির্দেশ দেন।
সাতক্ষীরা পুলিশের ব্যাখ্যায় বলা হয়, মোখলেছুর রহমান নামের কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়নি। আদালত তখন এ ঘটনার তদন্ত করে পুলিশ প্রধানকে প্রতিবেদন দিতে বলেন। ওই প্রতিবেদনও জমা পড়ে আদালতে। কিন্তু আদালত এরপর বিচারিক তদন্তের নির্দেশ দেন। সেই নির্দেশনা অনুযায়ী সাতক্ষীরার জ্যেষ্ঠ বিচারিক হাকিম হাবিবুল্লাহ মাহমুদ ঘটনা তদন্ত করে হাইকোর্টে প্রতিবেদন দাখিল করেন।
ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, জনিকে গ্রেপ্তার ও তিনদিন পর্যন্ত থানায় আটকে রেখে পরবর্তীকালে অস্বীকারের অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া গেছে।
কিন্তু পুলিশ ও বিচারিক তদন্তে নিখোঁজ মোখলেছুরের সন্ধান বের না হওয়ায় আদালত পিবিআইকে তদন্তের নির্দেশ দেয়। তদন্ত করে প্রতিবেদনটি আদালতে উপস্থাপনের পর শুনানি শেষে আদালত আদেশ দিলেন।








