১৯৭১ সালের ৭ মার্চ। শীত শেষে বসন্তে যেমন আসে প্রাণের জয়ধ্বনি, ঠিক তেমনি মৃতপ্রায় পাকিস্তানের কবল থেকে বাংলাদেশকে মুক্ত করতে ‘জয়ধ্বনি’ নিয়ে এসেছিলেন সর্বকালের শ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। পাকিস্তানি শোষকদের রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানের জনসভায় তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ডাক দেন। বলেন: ‘রক্ত যখন দিয়েছি রক্ত আরো দেব, এ দেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়বো, ইনশাআল্লাহ। এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ জনকের এই উদ্দীপ্ত ঘোষণায় বাঙালি জাতি পেয়ে যায় স্বাধীনতার দিক-নির্দেশনা। এরপরই দেশের মুক্তিকামী মানুষ চূড়ান্ত লড়াইয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে। যুগ যুগ ধরে শোষিত-বঞ্চিত বাঙালি ইস্পাতকঠিন দৃঢ়তা নিয়ে এগিয়ে যায় কাঙ্খিত মুক্তির লক্ষ্যে। এর ধারাবাহিকতায় ৩০ লক্ষাধিক প্রাণ, লাখ লাখ মা-বোনের ইজ্জতের বিনিময়ে আসে কাঙ্খিত সেই স্বাধীনতা। সেই ভাষণে ছিল এমনই এক যাদু যা মাত্র নয় মাসেই অসম যুদ্ধে এনে দিয়েছে সফলতা। বসন্তের সেই বিকেলে মাত্র ১৯ মিনিটের ভাষণে তিনি ইতিহাসের পুরো ক্যানভাস তুলে ধরেন। তিনি তার ভাষণে সামরিক আইন প্রত্যাহার, জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর, গোলাগুলি ও হত্যা বন্ধ করে সেনাবাহিনীকে ব্যারাকে ফিরিয়ে নেয়া এবং বিভিন্ন স্থানের হত্যাকাণ্ডের তদন্তে বিচার বিভাগীয় কমিশন গঠনের দাবি জানান। কোর্ট-কাচারি, হাইকোর্ট, সুপ্রিম কোর্ট, অফিস-আদালতসহ সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করে স্বাধীনতা সংগ্রামের ডাক দেন। বাঙালি জাতি এমনকি বিশ্ব ইতিহাসে এমন দরাজকণ্ঠে শোষক গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সাহসী ঘোষণা বিরল। এ কারণে গত বছরের ৩০ অক্টোবর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণকে বিশ্ব প্রামাণ্য ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে জাতিসংঘের শিক্ষা বিজ্ঞান ও সাংস্কৃতিক বিষয়ক সংস্থা ইউনেস্কো। এটা আসলে আনুষ্ঠানিকতা, কারণ ওই ভাষণের মূহুর্ত থেকেই তা বিশ্বের বিস্ময়ে পরিণত হয়েছে। তারপরেও এবারের ৭ মার্চের মর্যাদা এবং গুরুত্ব আরও বেশি, আলাদা। দেশের সর্বস্তরে বঙ্গবন্ধুর আদর্শ চর্চার পাশাপাশি বিশ্বব্যাপী তা ছড়িয়ে দেওয়ার উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। এক্ষেত্রে সরকারের পাশাপাশি সকলকে এগিয়ে আসতে হবে। এর মাধ্যমে প্রকৃতপক্ষে বঙ্গবন্ধুর প্রতি যথাযথ সম্মান প্রদর্শন করা হবে বলে আমরা মনে করি। বাঙালি জাতিসহ বিশ্ব ঐতিহ্যের এই ঐতিহাসিক মূহুর্তে জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর প্রতি আমাদের বিনম্র শ্রদ্ধা।









