সুমন রায়, নরসিংদী প্রতিনিধি : নরসিংদীতে দীপ্তি রাণী ভৌমিকের হত্যার সঙ্গে তার একমাত্র ছেলে স্কুলছাত্র প্রীতম ভৌমিককে জড়িয়ে নির্যাতনের মাধ্যমে তার স্বীকারোক্তি আদায় করেছে দাবি করে এই ঘটনার প্রতিবাদে এবং প্রকৃত হত্যাকারীদের শাস্তি চেয়ে মানববন্ধন করেছে নরসিংদীর সচেতন নাগরিক সমাজ।
মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ১১টার দিকে নরসিংদী প্রেসক্লাবের সামনে নরসিংদী সচেতন নাগরিক সমাজের নেতৃত্বে এই মানববন্ধনে অংশ নেয় নরসিংদীর হিন্দু মহাজোট, হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান, নরসিংদী শহর পূজা উদযাপন পরিষদ, নরসিংদী গৌপীনাথ জিউর আখড়াধাম, শ্রী শ্রী লোকনাথ বাবার আশ্রম, বীরপুর বাসী, হাজীপুর বাসী ও ভেলানগর বাসী সহ বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন।
মানববন্ধনে বক্তারা বলেন, আইন শৃঙ্খলা অবনতির কারণেই এই ধরনের হত্যাকাণ্ড চলছে। তারা বলেন, হত্যাকারীদের বের করতে না পেরে পুলিশ তার ছেলেকে মিথ্যেভাবে হত্যাকারী বানাতে অপচেষ্টা এবং যারাই এ হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িত তাদেরকে দ্রুত গ্রেফতার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে।
সকাল সাড়ে ১১টা থেকে সাড়ে ১২টা পর্যন্ত এক ঘণ্টাব্যাপী মানববন্ধনে বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের শত শত মানুষ অংশ নেয়।
এর আগে শনিবার সন্ধ্যায় এক সংবাদ সম্মেলনে প্রীতমের ওপর পাশবিক নির্যাতনের বর্ণনা দেন বাবা প্রদীপ ভৌমিক। তিনি জানান, বিনা মামলায়, বিনা ওয়ারেন্টে বিনা দোষে তার ছেলে প্রীতম ভৌমিককে থানায় নিয়ে ৪ দিন আটকে রেখে পা উপরে বেঁধে ঝুলিয়ে ৩ দিন অমানুষিক নির্যাতন চালানো হয়েছে। লোহা এবং কাঠের রুল দিয়ে পিটিয়ে সারা শরীর তুলাধোনা করে দেয়া হয়েছে।
তিনি আরও জানান, শুধু তাই নয়, কিছুক্ষণ পরপর প্রীতমের শরীরে ইলেকট্রিক শক দেয়া হয়েছে। তাকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে আদালতে দাঁড়িয়ে তার মা দীপ্তি ভৌমিককে সে নিজে হত্যা করেছে বলে স্বীকারোক্তি দিতে। স্বীকারোক্তি না দিলে প্রীতমকে ক্রসফায়ারে হত্যা করা হবে বলেও হুমকি দেয়া হয়েছে। স্কুলছাত্র প্রীতম পুলিশি নির্যাতনের ভয়ে আদালতে দাঁড়িয়ে স্বীকারোক্তি দিতে বাধ্য হয়েছে।
তবে অভিযোগ অস্বীকার করে নরসিংদী মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো: গোলাম মোস্তফা বলেন, প্রীতমের বাবা শোকে কাতর হয়ে এসব কথা বলছে। প্রীতম আদালতে ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দীও দিয়েছে। তাতে সে সবকিছু স্বীকারও করেছে।
“আর তাকে নির্যাতনের কোন প্রশ্নই আসে না। কারণ জবানবন্দী নেয়ার আগে স্বাভাবিকভাবেই আসামিকে ৩ঘণ্টা সময় দেয়া হয়। এই সময়ে তাকে সবকিছু ভেবে বলার জন্য বলা হয় বা তাকে কোন নির্যাতন করে বলানো হচ্ছে কিনা সেটাও জিজ্ঞাসা করা হয়।”
গত ৮ জুলাই সকাল সাড়ে ৯টা থেকে দুপুর দেড়টার মধ্যে নরসিংদী শহরের মধ্যকান্দাপাড়া মহল্লার হরিপদ সাহার নিজবাড়ির পঞ্চম তলায় দিপ্তী ভৌমিক নামে এক গৃহবধূকে দুর্বৃত্তরা গলাকেটে হত্যা করে । দুর্বৃত্ততরা এই নারীকে নির্মমভাবে হত্যা করে বাসা থেকে ২৫ হাজার টাকা লুট করে নিয়ে যায়। ওই সময় দিপ্তী রাণী ভৌমিকের ছেলে প্রীতম শহরের সাটিরপাড়া কালিকুমার উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রাক-নির্বাচনী পরীক্ষা দিতে বিদ্যালয়ে ছিল।
পরীক্ষা শেষে দুপুর প্রায় পৌনে ২টায় স্কুল থেকে বাড়ি ফিরে মাকে ডাকাডাকি করতে যেয়ে প্রীতম তার মাকে গলাকেটা মৃত অবস্হায় ফ্লরে দেখতে পেয়ে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন। পরে প্রীতমের আর্তচিৎকারে প্রতিবেশীরা আসে।
এ ব্যাপারে নিহত দিপ্তী ভৌমিকের মেয়ের জামাই নয়ন কুমার সাহা বাদী হয়ে নরসিংদী সদর মডেল থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলা নং ২১। কিন্তু দীর্ঘ ২৩ দিনেও পুলিশ ঘটনার কোন কূলকিনারা করতে পারেনি।
৩১ জুলাই রাত সাড়ে ৮ টায় মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই মোস্তাক আহমেদ মোবাইল ফোনে নিহত দিপ্তী ভৌমিকের ছেলে স্কুলছাত্র প্রীতমকে জিজ্ঞাসাবাদের কথা বলে থানায় ডেকে নিয়ে যায়। এরপর থেকে তাকে আর বাড়ি ফিরতে দেয়নি। ৪ দিন আটকে রেখে তার ওপর অমানুষিক নির্যাতন চালায়।







