নেত্রকোনা ও সুনামগঞ্জের কৃষকের ধান ঘরে উঠানো ও না উঠানো নির্ভরশীল চরহাইজদা ফসল রক্ষা বাঁধের উপর। প্রতিবছরই বাঁধটির নামে বরাদ্দ আসে আর বরাদ্দ যায় রাঘব বোয়ালদের পেটে। কৃষক বাধ্য হয় নিজেদের ফসল রক্ষা করতে প্রতিবছরই স্বেচ্ছাশ্রমে মাটি কেটে বাঁধ রক্ষা করতে। চরহাইজদা বাঁধ যেনো অসাধু ঠিকাদার ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের বাৎসরিক কামাইয়ের মাধ্যম। প্রতিবছরের মতো এবারও অসাধু চক্র হাইজদা বাঁধের বরাদ্দ আত্মসাত করেছে। কৃষক, ছাত্র, যুবক স্বেচ্ছাশ্রমে মাটি কেটে বাঁধ রক্ষা করতে চেয়েছে।
এ পর্যন্ত চরহাইজদা বাঁধের জন্য মোট ৫৮ কোটি টাকা বরাদ্দ এসেছে আর লুটেরাদের পকেটে গেছে বলে জানা যায়। কৃষকের কান্নায় ভারি হয়ে উঠছে বাতাস। ক্ষোভে ফেটে পড়ছে বিক্ষুব্ধ মানুষ। বরাদ্দ লুটেরাদের বিরুদ্ধে মানববন্ধন হচ্ছে নেত্রকোনা প্রেসক্লাবে ও ঢাকায় জাতীয় প্রেসক্লাবে। মানুষ আর সরকারি মাল দরিয়ামে ঢাল, এর দৃশ্য দেখতে চায়না। বারবার বরাদ্দ দিয়ে সরকারি অর্থ ধ্বংস ও লুটেরাদের পেট ভরানো বন্ধ করতে হবে। ৫৮ কোটি টাকা কোথায় গেল হাওড়বাসী তার জবাব চায়।
স্বেচ্ছাশ্রমে বাঁধে মাটি কেটে ফসল রক্ষার চেষ্টা সফল হয়নি। এপ্রিলের ৩ তারিখ রাতে হাইজদা বাঁধ ভেঙ্গে যায়। ২এপ্রিল দৈনিক আমাদের সময় শিরোনাম দিয়েছিল, হাইজদা বাঁধে মাটি ফেলছে কৃষকরা ১৭হাজার একরের ইরি বোরো তলিয়ে গেছে। এতে লিখেছে, স্থানীয় কৃষকরা জানায়, চরহাইজদা বেড়িবাঁধে মাটি ভরাট ও উঁচুকরণ কাজে গাফিলতি করায় এ অবস্থা হয়েছে। তারা জানায়, বাঁধের অনেক স্থানেই মাটি ভরাট ও উঁচুকরণ করা হয়নি।
জানা গেছে পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) এবার ওই বাঁধ মেরামত, মাটি ভরাট ও উঁচুকরণের জন্য প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির মাধ্যমে ২০ লাখ টাকা ও টেন্ডারের মাধ্যমে ২গ্রুপে ১ কোটি ৫১ লাখ টাকা বরাদ্দ দিয়ে কার্যাদেশ প্রদান করে। এর মধ্যে ১ কোটি ১৬ লাখ টাকার কাজ পায় চট্রগ্রামের ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান ইউনুস এন্ড ব্রাদার্স ও ৩৫ লাখ টাকার কাজ পায় ময়মনসিংহের শামীম এন্টারপ্রাইজ।
এদিকে এই দুটি গ্রুপে টেন্ডারের মাধ্যমে কার্যাদেশ পাওয়ার দেড় মাস পর গত ফেব্রুয়ারির শেষ সপ্তাহে ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান মাটি ভরাটের কাজ শুরু করে। ওয়ার্ক অর্ডারের ৪৫ দিন পর কাজ শুরু করল আর প্রশাসন নির্বিকার কেন? তবে কি তাদেরও অসাধু চক্রের সাথে যোগসাজশ থাকে প্রতিবার?
মোহন গঞ্জ পাইলট হাইস্কুলের শিক্ষক রফিকুজ্জামান ইদ্রিছী সোশ্যাল মিডিয়ায় লিখেছেন, স্বাধীনতার ৪৬তম বার্ষিকী পালিত হলো হাইজদার বেড়িবাঁধের কোন গতি হলোনা। সত্যিই দুর্ভাগ্যজনক। লক্ষ লক্ষ মানুষের হাহাকার ও কান্নার ধ্বনি পৌঁছে না এমপি, মন্ত্রীদের কাছে। ছাত্রলীগ নেতা জুনায়েদ শাহ লিখেছেন, কারো পৌষ মাস আর কারো সর্বনাশ। বেড়ি বাঁধের টাকায় কাজ না করে নিজেদের বাসাবাড়ির কাজ করে আর টাকা নেতাদের পকেটে ঢুকায়। কৃষকের মুখের দিকে তাকানো যায় না।’
দৈনিক ভোরের ডাক এপ্রিলের ২ তারিখে শিরোনাম দিয়েছে, ‘মোহনগঞ্জে ১৬ হাজার ৮শ হেক্টর জমি পানির নিচে, কৃষক সর্বশান্ত। এতে লিখেছে, উপজেলার গাগলাজুর ইউনিয়নের মান্দার বাড়ি গ্রামের কৃষক মনছুর আলম জানান, ১ লাখ টাকা ঋণ করে আমি ৫ একর জমি করেছি আকস্মিক বৃষ্টির ঢলে আমাদের বোরো ফসল নিয়ে গেছে। এখন এই টাকা কোথায় থেকে দেব। আমার কিছুই করার নেই। সরকার প্রতিবছর এই বাঁধের উপর লাখ লাখ টাকা বরাদ্দ দিলেও কোন লাভ হয়না। কিছু অসাধু ঠিকাদার কাজ নিয়ে ফসল তোলার আগ মুহূর্তে কিছু মাটি কাটে যেন তাদের টাকা হালাল করতে’।
জানা যায় আশির দশকে মোহনগঞ্জের বৃহত্তম হাওড় ডিঙ্গাপুতার ফসল রক্ষার জন্য পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) ২৯ কিলোমিটার দীর্ঘ চরহাইজদা বেড়িবাঁধ নির্মাণ করে। চরহাইজদা বাঁধের বরাদ্দ আত্মসাত করে পার পেয়ে যাওয়ায় দুর্নীতি অন্যত্রও ছড়িয়ে যাচ্ছে।
৩ এপ্রিলে দৈনিক প্রথম আলো শিরোনাম করেছে, সাড়ে চার হাজার হেক্টরের বোরো ধান তলিয়ে গেছে/নেত্রকোনায় বৃষ্টিস্নাত ও পাহাড়ী ঢল। সংবাদটিতে লিখেছে, খালিয়াজুরি উপজেলার ধনু নদের পানি বৃদ্ধি পেয়ে সদর ইউনিয়নের চুনাই বাঁধ, গাজীপুর ইউনিয়নের ধৈলং বাঁধ, মাকলাইন বাঁধ, হরিপুর বাঁধ, নালুয়ার বাঁধ, মেন্দিপুর ইউনিয়নের আশাখালি বাঁধ, নাওটানা স্লুইসগেটের বাঁধ, চাকুয়া ইউনিয়নের গঙ্গাবদর বাঁধসহ ১০টি বাঁধ ভেঙ্গে এসব এলাকার হাওড়ে পানি ঢুকতে শুরু করে। এসব বাঁধের কয়েকটিতে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) মাটি ভরাটের মাধ্যমে সংস্কারের কাজ হাতে নিলেও ঠিকমতো কাজ করেনি।
জেলা পরিষদের সদস্য ও খালিয়াজুরী উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক গোলাম আবু ইছহাক প্রথম আলোকে বলেন, এ উপজেলায় পাউবোর কাজে এবছর বাঁধে বরাদ্দের চারভাগের একভাগ কাজও করেনি। সময়মতো ও সঠিক নিয়মে কাজ না করায় এখানকার সবগুলো বাঁধ ভাঙ্গনের ঝুঁকিতে আছে। এলাকাবাসীর সহযোগিতায় স্বেচ্ছাশ্রমে বাঁধগুলো টিকিয়ে রাখতে হচ্ছে। প্রতিবছরই পাউবো এমন করে।’
৩ এপ্রিল দৈনিক ইত্তেফাক লিখেছে, চোখের সামনে তলিয়ে গেল ডিঙ্গাপুতা হাওড়ের ধান/নেত্রকোনার মোহনগঞ্জে পাহাড়ী ঢলে স্লুইস গেট ও বাঁধ ভেঙ্গে ডিঙ্গাপুতা হাওড়ের ৪০ হাজার একর জমির আধাপাকা বোরো ধান পানিতে তলিয়ে গেছে। স্থানীয় কৃষকরা বুক চাপড়ে কাঁদছেন, হাহাকার করছেন। এক মুষ্টি ধানও তারা ঘরে তুলতে পারেননি। হাওড় পাড়ের এই কান্না যেন নিয়তি হয়ে উঠছে। আর এই কান্নাকে পুঁজি করে বরাদ্দের পর বরাদ্দ এনে রাতারাতি বড়লোক হচ্ছে একশ্রেণীর বিবেকহীন অসাধু চক্র। তারাও চায় এই কান্নার দৃশ্য সংবাদপত্রের শিরোনাম হোক এতে করে সরকার আরও নতুন বরাদ্দ দেবে তারা পাবে আরও লুটপাটের সুযোগ।
এখন গুঞ্জন শোনা যায় আরও নতুন বরাদ্দ আসছে। কিন্তু কেন? ৫৮ কোটি টাকা যেভাবে লুটপাট হয়েছে নতুন বরাদ্দও কি সেরকমটিই হবেনা? লুটেরাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিলে নতুন বরাদ্দও যে রাঘব বোয়ালদের পেটে ই ঢুকবে সেটা নিশ্চিত। তাই নতুন বরাদ্দ নয় আত্মসাতকৃত বরাদ্দ উদ্ধার করা হোক। তাদের দিয়েই বাঁধ নির্মাণে বাধ্য করা হোক ও সর্বস্বান্ত কৃষকদের সাহায্য করতে বাধ্য করা হোক। লুন্ঠিত বরাদ্দ উদ্ধার ও দায়ীদের শাস্তি প্রদান করে পরে নতুন বরাদ্দ দেয়া হোক তবেই হাওড় বাঁচবে, কৃষক বাঁচবে। নতুবা সরকারি বরাদ্দ অপচয়ের ধারাবাহিকতা ও কৃষকের কান্না চলতেই থাকবে।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে)








