কথা ছিল নৈরাজ্য বন্ধ করার। প্রতিশ্রুতি ছিল রাজধানীর গণপরিবহন খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার। গত কয়েকদিনের চিত্র দেখে মনে হচ্ছে নৈরাজ্য ও বিশৃঙ্খলা আরও বেড়েছে। এ যেন অনেকটা রবীন্দ্রনাথের ‘জুতা আবিষ্কার’ কবিতার হবুচন্দ্র রাজার নির্দেশে গবুচন্দ্র মন্ত্রীর রাজ্য থেকে ধুলা দূর করার অভিযানের মতো! ‘করিতে ধুলা দূর রাজ্য হলো ধুলায় ভরপুর!’ অথবা ‘এমনি সব গাধা ধুলারে মারি করিয়া দিল কাদা!’ পরিবহন খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার চেষ্টাও অনেকটা তেমনই হয়ে দাঁড়িয়েছে! তবে এক্ষেত্রে পার্থক্য হলো, যা করা হয়েছে, তা ‘গাধা’র মতো নয়, বরং জেনে-শুনে-বুঝে অত্যন্ত উদ্দেশ্যপূর্ণভাবেই করা হয়েছে।
অনেক ঢাক-ঢোল পিটিয়ে গণপরিবহনে ভাড়া নিয়ে নৈরাজ্য, যাত্রী হয়রানি ও বিশৃঙ্খলা ঠেকাতে রাজধানীতে সিটিং সার্ভিস বন্ধের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। ঘোষণা অনুযায়ী, ১৬ এপ্রিল থেকে গণপরিবহনগুলো সিটিং সার্ভিসের নামে অতিরিক্ত কোনো ভাড়া আদায় করতে পারবে না। সেই সঙ্গে বন্ধ হয়ে যাবে রাজধানীতে সিটিং সার্ভিস, গেট লক, বিরতিহীন কিংবা স্পেশাল সার্ভিস নামের সবকিছু। গাড়িতে লাগানো ট্রাকের বাম্পার কিংবা অ্যাঙ্গেলও খুলে ফেলা হবে। এছাড়া রংচটা, রংবিহীন ও জরাজীর্ণ গাড়িগুলো দৃষ্টিনন্দন ও মেরামত করে রাস্তায় চালাতে হবে। যারা আইন অমান্য করে সিটিং সার্ভিসের নামে টাকা আদায় করবেন তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে বিআরটিএ এবং ডিএমপি।
ঢাকা পরিবহন মালিক সমিতি নেতাদের এই সুমতি ও সুবচন শুনে আমরা আশান্বিত হয়েছিলাম। মনে মনে তাদের এসব সিদ্ধান্তকে সাধুবাদ জানিয়েছিলাম। কিন্তু তাদের এই ঘোষণা কার্যকর করার প্রক্রিয়া এবং পরবর্তী পরিস্থিতি দেখে পুড়াই আক্কেল গুড়ুম! বিআরটিএর ‘অনুমোদন’ নিয়ে আবার ফিরে এসেছে সিটিং সার্ভিস। শুধু তাই নয়, এবার আরও বেশি ভাড়া আদায় করা হচ্ছে। যদিও আপাতত ১৫ দিনের কথা বলা হচ্ছে, কিন্তু তা স্থায়ীভাবে ফিরে আসবে বলেই মনে হচ্ছে।
আসলে পরিবহন মালিকরা বুঝিয়ে দিয়েছেন, বিএরটিএ কিংবা সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রী কতোটা তুচ্ছ! যাত্রীদের বুঝিয়েছেন, আমাদের সমঝে চলো, না হলে বুঝবে, কত ধানে কত চাল! প্রচলিত উপকথা হচ্ছে, বাবারও বাপ আছে। এই কথার সত্যতা আমরা পেলাম পরিবহনখাতে সরকারের গৃহীত সিদ্ধান্ত উল্টে যাওয়ার ঘটনা দেখে এবং সেতু মন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের ‘অসহায়’ বক্তব্য শুনে।
সরকারি সিদ্ধান্ত মানাতে ব্যর্থ মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন, ‘পরিবহন মালিকদের ডাকলেও আসেন না। আর চাইলেই পরিবহন মালিকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া যায় না।’
তিনি আরও বলেছেন, ‘পরিবহন মালিকরা অনেক প্রভাবশালী। গাড়ি না নামালে দেশের বাস্তবতা অনুযায়ী চাইলেই তাদের বিরুদ্ধে কি কিছু করা যায়? তারা সংখ্যায় অনেক। বাস্তবতার নিরিখে চাইলেই ব্যবস্থা নেয়া যায় না। চালক-মালিকরা যখন অন্যায় করে তখন সরকার ব্যবস্থা নিলে তারা গাড়ি নামায় না। তখন জনদুর্ভোগের পুরো দায়ভারটা মন্ত্রণালয়ের ঘাড়ে চাপে।’
তার মানে দাঁড়াচ্ছে, সরকারের চাইতেও শক্তিশালী, মন্ত্রীদের চাইতেও ক্ষমতাশালী হচ্ছে পরিবহন মালিকরা! অবশ্য এখন মন্ত্রী-এমপি, ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীরাই পরিবহন মালিক-শ্রমিক সংগঠনের নেতা। পরিবহন খাতের বিরাজমান সমস্যা সমাধানের উদ্যোগ এবং এই উদ্যোগকে নস্যাৎ করে দেওয়ার তৎপরতাকে অনেকটাই সাপুড়ের সাপ খেলার মতো মনে হয়। সাপুরের ইচ্ছায় সাপ ফোঁস ফোঁস করে। আবার এক সময় বাধ্যগত হয়ে ঝাঁপিতে চুপচাপ আশ্রয় নেয়। একে-অপরের জীবন ও জীবিকার ক্ষেত্রে সহায়তা করে। ফোঁস-ফাঁস খেলা দেখানোর পর তাদের বসতিও একই ঘরে!
এবার সিটিং সার্ভিস বন্ধ করা নিয়ে যা হলো, তা পুরো ব্যাপারটাই পাতানো খেলা। সিটিং সার্ভিস বন্ধের উদ্যোগের পেছনে রয়েছে মালিকদের রাজনীতি ও ব্যবসায়িক স্বার্থ। মালিক সমিতির নেতারা ঢাকা মহানগর আঞ্চলিক পরিবহন কমিটির (আরটিসি) কাছে অনেকবার সিটিং সার্ভিসের রুট পারমিট চেয়েও পাননি। সিটিং সার্ভিসের জন্য পৃথক ভাড়া নির্ধারণেরও অনুরোধ আসে বিআরটিএর কাছে। তা না হওয়ায় সিটিং সার্ভিস বন্ধ করা হয়েছে।
অন্যদিকে পরিবহন মালিকেরা জানতেন, বিকল্প ব্যবস্থা না করে তা হঠাৎ করে সিটিং সার্ভিস বন্ধ করে দিলে দুর্ভোগ পোহাতে হবে যাত্রীকে। আর এ কারণেই এ সার্ভিস বন্ধ করা হয়েছে। যাতে এ ধরনের বাসকে রুট পারমিট দিতে বাধ্য হয়। এবারের অভিযান ছিল পূর্বপরিকল্পিত। মালিকরা সিটিং সার্ভিসের বৈধতা পেতেই এ দুর্ভোগের সৃষ্টি করেছেন। তারা সিটিং বন্ধ করিয়ে লোকালেই সিটিংয়ের ভাড়া নিয়েছেন।যাত্রীরাই বলেছে, আগের সিটিংই ভালো ছিল। নারীরা বাসে চড়তেই পারেননি। স্বস্তিতে যাতায়াত করতে তারাও সিটিং সার্ভিস ফিরিয়ে আনার দাবি তুলেছেন। মালিকরা এটিই চেয়েছিলেন। তারা চেয়েছেন বেশি ভাড়ায় সিটিং সার্ভিস চালুর অনুমতি পেতে।
অন্যদিকে সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পরিবহন মালিকরা বাস গ্যারেজে রেখে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করেছে। সব মিলিয়ে সাধারণ যাত্রীদের জিম্মি করে তারা ঠিকই নিজেদের স্বার্থ হাসিলের পথে এগিয়ে চলেছেন।
দেশের সড়ক পরিবহন খাতে যে নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি বিরাজ করছে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। যেকোনো অজুহাতে পরিবহনমালিক ও শ্রমিকেরা ধর্মঘট ডেকে যাত্রীদের অবর্ণনীয় দুর্ভোগের মধ্যে ঠেলে দেয়ার ঘটনা প্রায়শ ঘটছে।
দুর্ভাগ্যজনক হলো, এসব ঘটনায় ক্ষেত্রবিশেষে সরকারের দায়িত্বশীল ব্যক্তিরাও মদদ দিয়ে থাকেন। যাত্রী ভোগান্তি লাঘবে সিটিং সার্ভিস বন্ধ হওয়াটা ছিল সময়ের দাবি। সিদ্ধান্তের পরও কেন তা বাস্তবায়ন করা গেল না সেটি খতিয়ে দেখা দরকার। গণপরিবহন নিয়ে যাত্রীদের দুঃখ-দুর্দশার অন্ত নেই। বলা যায় অনেকটা নিয়ন্ত্রণহীনভাবেই চলে গণপরিবহন।
ঢাকায় মিনিবাসের ভাড়া নির্ধারিত আছে কিলোমিটারপ্রতি ১ টাকা ৬০ পয়সা আর বড় বাসে ১ টাকা ৭০ পয়সা। সর্বনিম্ন দূরত্বের বেশি যাতায়াতের ক্ষেত্রে সরকার-নির্ধারিত কিলোমিটার প্রতি ভাড়ার হার কার্যকর হওয়ার কথা। সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী প্রতি মিনিবাসের কিলোমিটারের সর্বনিম্ম ভাড়া ৫ টাকা এবং বড় বাসে ৭ টাকা। কিন্তু আদায় করা হয় অনেক বেশি। বাসে উঠলেই কমপক্ষে ১০ টাকা ভাড়া গুণতে হয় যাত্রীদের। কোনো কোনো রুটে ২৫ টাকাও নেয়া হয় নিকটদূরত্বেও।
সিটিংয়ের নামে এই ‘চিটিং’ বন্ধ হওয়া দরকার। রাজধানীতে যেসব বাস চলে সেসবের মান থাকাটাও অত্যন্ত জরুরি। এগুলোর ফিটনেস নিশ্চিত করা দরকার। গণপরিবহন নিয়ে সকল ধরনের নৈরাজ্য বন্ধে সংশ্লিষ্ট সকলে আন্তরিকতা নিয়ে এগিয়ে আসবেন-এটিই জনপ্রত্যাশা। সংকট সমাধানে সবার আগে একটি ট্রান্সপোর্ট কমিশন গঠন করা জরুরি। তাদের কাজ হবে পরিবহন ভাড়া নিয়ন্ত্রণ ও তদারকি করা। যেভাবে হোক পরিবহন খাতে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করতে হবে। গণপরিবহনের মালিক ও চালকদের নির্দেশনা মানতে বাধ্য করতে হবে। যারা নির্দেশনা অমান্য করবে তাদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে।
চার হাজার নতুন বাস নামানোর ঘোষণা কার্যযকর করতে হবে। সবচেয়ে বড় কথা, রাষ্ট্রের মধ্যে সরকারের চেয়ে শক্তিশালী কেউ নেই-সেটা প্রমাণ করতে হবে। মন্ত্রীরা সার্কাসের বাঘ হয়ে থাকবেন, আর পরিবহন মালিক-শ্রমিক নেতারা প্রকৃত বাঘ হয়ে সবাইকে দাবড়ে বেড়াবেন, সেটা হতে পারে না।
পুনশ্চ: সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের প্রায়ই বিভিন্ন বক্তৃতায় দলে ‘কাউয়া’ ঢুকেছে, ‘ফার্মের মুরগি’ ঢুকেছে বলে হা-হুতাশ করেন এবং এসব কাউয়া বা ফার্মের মুরগিদের ব্যাপারে সতর্ক থাকতে বলেন। কিন্তু মন্ত্রী হয়ে যদি কোনো সিদ্ধান্ত মানাতে না পারেন, তার নির্দেশ বা সিদ্ধান্ত অগ্রাহ্য করে যদি কেউ দাপট দেখায় তাহলে মন্ত্রী হিসেবে তার সম্মান থাকে কি? প্রশ্ন হলো, তিনি নিজে সার্কাসের বাঘ হয়ে থাকবেন, না পরিবহন খাতের নৈরাজ্য দূর করতে কার্যকর কিছু করবেন, সে সিদ্ধান্তও তাকেই নিতে হবে।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে)








