মিয়ানমারের নেত্রী অং সান সু চি’র সর্বশেষ বক্তব্যও প্রমাণ করে, তারা রোহিঙ্গাদের সেদেশের নাগরিকই মনে করে না। মূলতঃ রোহিঙ্গাদের উপর এবার যে জুলুম-নির্যাতন, হত্যা-ধর্ষণ এবং বাস্তুচ্যুত করার ঘটনা তার মূল কারণ মিয়ানমার সরকার, মিয়ানমারের সেনাবাহিনী এবং রাষ্ট্রীয় অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোর এরকম অবস্থান। ১৯৭৮ সালে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে ঠেলে দেয়ার পর ১৯৮২ সালে অদ্ভুত এক আইন করে তাদেরকে ওই দেশের নাগরিকের তালিকা থেকে খারিজ করে দেয়া হয়। এরপর ১৯৯২ সালে এবং পরে কয়েক দফায় রোহিঙ্গাদের তাদের নিজ ভূমি থেকে উচ্ছেদ করা হয়েছে। চলতি বছরের অগাস্ট মাসে নতুন করে রোহিঙ্গা নিপীড়ন শুরু হওয়ার আগে এদেশে অবস্থান করা রোহিঙ্গার সংখ্যা ছিল প্রায় পাঁচ লাখ। এবার তার সঙ্গে আরো চার লাখ ৩০ হাজার যোগ হয়েছে। বাংলাদেশ মানবিক কারণে তাদেরকে আশ্রয় দিয়েছে। মানুষ হিসেবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এছাড়া কোন বিকল্প ছিল না। একটি রাষ্ট্র এরকম সময় চোখ বন্ধ করে থাকতে পারে না যখন শুধুমাত্র জাতিগত এবং ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে পাশের দেশে গণহত্যার মতো পরিস্থিতি চলে। অথচ যে কারণ দেখিয়ে রোহিঙ্গাদের তাদের স্ব-ভূমি থেকে উচ্ছেদ করা হচ্ছে, শুধুমাত্র সেই কারণটি অসত্য বলে তা নাকচ করে দিয়ে বাংলাদেশ চোখ বন্ধ করে থাকতে পারতো। কোন ঐতিহাসিক তথ্যই এ স্বীকৃতি দেয় না যে রোহিঙ্গারা বাঙালি কিংবা বাংলাদেশের মানুষ। প্রতিবেশী হিসেবে এক দুইজন অন্যদেশে থাকতে পারে। কিন্তু, একটি জনগোষ্ঠী যারা শত শত বছর ধরে সাবেক বার্মা কিংবা এখনকার মিয়ানমারে বসবাস করছে তারা কখনোই বাংলাদেশের নাগরিক হতে পারে না। অথচ সেই অজুহাতেই মিয়ানমারের সেনাবাহিনী তাদের উপর দমন-নির্য়াতন চালাাচ্ছে। মিয়ানমারের সেনাবাহিনী রোহিঙ্গাদের যে পরিচয়ে পরিচিত করাতে চায়, বাস্তব কারণে বাংলাদেশ যেহেতু তা প্রত্যাখ্যান করে তাই টেকনিক্যাল কারণে বাংলাদেশের উচিত ছিল রোহিঙ্গাদের এদেশে ঢুকতে না দেয়া। কিন্তু, এটাও সত্য যে মানবিক বোধসম্পন্ন কেউ পাশের দেশে গণহত্যা চলার সময় আশ্রয়প্রার্থী মানুষগুলোকে ফিরিয়ে দিতে পারে না। বাংলাদেশ তাদের আশ্রয় দিয়েছে, খাওয়া-পরার ব্যবস্থা করেছে, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ও সহায়তায় এগিয়ে এসেছে। কিন্তু, সাময়িক এ আশ্রয়ই শেষ কথা নয়। রোহিঙ্গাদের তাদের নিজদেশে ফিরে যাবার ব্যবস্থা করতে হবে। এজন্য আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশের কূটনৈতিক প্রচেষ্টার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কেও বিষয়টি বুঝতে হবে। জাতিসংঘ সেটা বুঝেছে বলে সাবেক মহাসচিব কফি আনানের নেতৃত্বে যে কমিশন গঠন করেছিল, তারা সংকটের সমাধান হিসেবে প্রথমেই রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারের নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতির কথা বলেছে। আমরাও তাই মনে করি। যে রোহিঙ্গারা শত শত বছর ধরে মিয়ানমারে বসবাস করে আসছে তাদেরকে সবার আগে মিয়ানমারের নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতির ব্যবস্থা করতে হবে। না হলে এবার সাময়িক সমাধান হলেও রোহিঙ্গাদের উপর দমন-পীড়ন চলতেই থাকবে এবং বাস্তুচ্যুতির ঘটনা বারবারই ঘটতে থাকবে। সেটা যেন না ঘটে, সেজন্য আমরা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রস্তাবমতো প্রয়োজনে নিরাপদ অঞ্চল গঠন করে রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারের নাগরিক হিসেবে তাদের দেশে স্বাভাবিক জীবন যাপনের ব্যবস্থা নিশ্চিত করার আহ্বান জানাই।








