ঢাকা থেকে বরগুনাগামী এমভি অভিযান ১০ লঞ্চে গভীর রাতে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় এখন পর্যন্ত বহু হতাহত হয়েছেন। উদ্ধারকর্মীরা মরদেহ উদ্ধার করছেন। একইসাথে দগ্ধদের বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। হতাহতের ঘটনায় সুগন্ধা নদীর পাড়ের আকাশ বাতাস যেন ভারী হয়ে উঠেছে।
চ্যানেল আইয়ের প্রতিবেদনে জানা যায়, শুক্রবার সন্ধ্যা পর্যন্ত এ ঘটনায় অন্তত ৪০ জনের মৃত্যু হয়েছে। এছাড়া বরিশালের শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও ঝালকাঠি সদর হাসপাতালে শতাধিক যাত্রী দগ্ধ অবস্থায় চিকিৎসাধীন রয়েছেন। নিখোঁজ রয়েছেন অনেকে। ঘটনাস্থলে ফায়ার সার্ভিসের সদস্যদের সঙ্গে উদ্ধার তৎপরতা চালাচ্ছেন পিরোজপুর, বরিশাল, বরগুনা ও ঝালকাঠির কোস্টগার্ড সদস্যরা।
নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, লঞ্চে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় সুষ্ঠু তদন্তের মধ্য দিয়ে সব কিছু বের হয়ে আসবে। লঞ্চে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় আমরা মন্ত্রণালয় থেকে তদন্ত কমিটি করেছি। তিন কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত টিম রিপোর্ট জমা দেবে। যান্ত্রিক কোনো ত্রুটির কারণে এ ঘটনা ঘটেছে কিনা সেটা তদন্তের মধ্য দিয়ে বেরিয়ে আসবে।
সুগন্ধা নদীতে এমন মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় নৌ পরিবহনের সাথে সংশ্লিষ্টদের নিদ্রা কাটবে বলেই আমাদের বিশ্বাস। দীর্ঘদিন ধরে নৌযানে নানা ধরনের অনিয়ম চলে আসছে। সেখানে কঠোর মনিটরিং থাকার কথা থাকলেও সেভাবে হয়নি। এর ফলে অপ্রত্যাশিত দুর্ঘটনায় চোখের সামনে মুহূর্তেই এতগুলো প্রাণ ঝরে গেল। যথাযথ তদন্ত করে দায়ীদের শাস্তির আওতায় আনার পাশাপাশি সব নৌযান বিশেষ করে যাত্রীবাহী লঞ্চগুলোর ফিটনেস এবং ধারণ ক্ষমতার অতিরিক্ত যাত্রী ও মালামাল বহনের বিষয়ে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করতে হবে।
নৌযানেই যে শুধু অনিয়ম চলছে তা নয়। দেশে প্রতিদিন গড়ে সড়ক দুর্ঘটনায় ১৫ জন মানুষ নিহত হয় বলে জানিয়েছে ‘সেভ দ্য রোড’ নামের একটি স্বেচ্ছাসেবি সংগঠন। একইসঙ্গে তারা বলছে, চলতি বছর বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনায় ৫ হাজার ৩৭০ জন নিহত হয়েছে। আহত হয়েছেন ৭০ হাজার ২২২ জন। তাতে গড়ে আহত হন প্রতিদিন ১৯৬ জন। ২০২১ সালে ৭১২টি নৌপথ দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ১৮৮ জন এবং আহত হয়েছেন ৪৬৬ জন। রেলপথ দুর্ঘটনায় আহত হয়েছেন ৩ হাজার ৭৮ জন এবং নিহত হয়েছেন ১৩৮ জন।
সংবাদমাধ্যম থেকে তথ্য নিয়ে এ চিত্র তুলে ধরেছে ‘সেভ দ্য রোড’। সেই হিসাবে আসলে দুর্ঘটনা ও হতাহতের ঘটনা আরও বহুগুণ বেশি। কেননা দুর্ঘটনার সব খবর সংবাদমাধ্যমে উঠে আসে না। এসব দুর্ঘটনা ও হতাহতের সংখ্যা শূন্যের কোটায় নামিয়ে আনতে দীর্ঘমেয়াদী ও কার্যকর পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। কিন্তু কোনো পক্ষের মধ্যেই সেসবের চিহ্ন লক্ষ্যণীয় নয়।
অন্যদিকে আমাদের ঢাকামুখী স্বাস্থ্য ব্যবস্থার করুণ চিত্রও উঠে এসেছে লঞ্চ দুর্ঘটনায়। সুগন্ধা নদীতে এমভি অভিযান ১০ এ অগ্নিদগ্ধ যাত্রীদের বরিশালে আনার পর দেখা গেল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে বিশেষায়িত বার্ন ইউনিট নেই। চ্যানেল আইয়ের প্রতিবেদনে জানা যায়, এই হাসপাতালের বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি বিভাগ প্রায় দু’ বছর ধরে বন্ধ রয়েছে। এজন্য দগ্ধদের চিকিৎসা চলছে সার্জারি ওর্য়াডের মেঝেতে। আর যাদের অবস্থা বেশি আশঙ্কাজনক তাদের বেশ কয়েকজনকে আনা হয়েছে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে। শুধু ঢাকায় নয়, প্রতি বিভাগ এমনকি জেলা-উপজেলার সরকারি হাসপাতালগুলোতে আধুনিক চিকিৎসা সেবা নিশ্চিতে মনোযোগ দিতে হবে।
বরগুনাগামী লঞ্চের আগুনের ঘটনায় নিহতদের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ, আহতদের চিকিৎসা ও সার্বিক সহায়তার পাশাপাশি এসব দুর্ঘটনায় দোষীদের শাস্তি নিশ্চিতে আমরা সংশ্লিষ্টদের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি।








