একই দিনে সাজা পেলেন দেশের দু’টি দৈনিক পত্রিকার সম্পাদক এবং এক নির্বাহী সম্পাদক। বৃহস্পতিবার সকালে দৈনিক জনকণ্ঠের সম্পাদক আতিকউল্লাহ খান মাসুদ ও একই পত্রিকার নির্বাহী সম্পাদক স্বদেশ রায় দণ্ডিত হন। এর কিছুসময় পরে দণ্ডিত হলেন দৈনিক আমার দেশের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মাহমুদুর রহমান।
আদালত অবমাননার কারণে সর্বোচ্চ আদালতের বিচারিক কার্যক্রম চলা পর্যন্ত এজলাসে অবস্থানের সাজা ভোগ করেছেন দৈনিক জনকন্ঠের সম্পাদক আতিকুল্লাহ খান মাসুদ ও নির্বাহী সম্পাদক স্বদেশ রায়। একইসঙ্গে তাদের দু’জনকে ১০ হাজার টাকা করে জরিমানা অনাদায়ে ৭ দিনের কারাদন্ডের আদেশ দিয়েছেন আপিল বিভাগ। জরিমানার অর্থ কোনো সেবা প্রতিষ্ঠানে দান করতে বলা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার প্রধান বিচারপতি এস. কে. সিনহার নেতৃত্বে আপিল বিভাগের ৬ সদস্যের বৃহত্তর বেঞ্চ এ আদেশ দেন। সকাল ১০টায় রায় ঘোষণা থেকে শুরু করে দুপুর সোয়া ১টায় আপিল বিভাগের বিচারিক কার্যক্রম শেষ হওয়া পর্যন্ত আদালতে অবস্থানের সাজা ভোগ করেন জনকণ্ঠ সম্পাদক ও নির্বাহী সম্পাদক।
গত রোববার রুলের শুনানির পর বৃহস্পতিবার রায়ের দিন নির্ধারণ করেছিলেন আপিল বিভাগ। এর আগে গত ২৯ জুলাই স্বপ্রণোদিত হয়ে জনকন্ঠ সম্পাদক ও নির্বাহী সম্পাদকের বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার রুল জারি করেন আপিল বিভাগ। দুইদিন রুলের শুনানি শেষে বৃহস্পতিবার সংক্ষিপ্ত রায় দেন প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহার নেতৃত্বে ৬ বিচারপতির বৃহত্তর বেঞ্চ। আদেশে প্রথমেই আদালত অবমাননা আইন ও বাকস্বাধীনতা নিয়ে পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেন আপিল বিভাগ।
এটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম আপিল বিভাগের পর্যবেক্ষণ বিষয়ে বলেন, কনটেম্প অব অ্যাক্ট এটা পুরানো হয়ে গেছে, এটা নতুন করে প্রণয়ন হওয়া প্রয়োজন। সার্বিকভাবে বলেছেন যে কোর্টকে কোনভাবেই স্ক্যাডালাইজ করা যাবে না। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সংবিধানেই দেওয়া আছে। আদালত বলেছে কিছু লিমিটেশনও থাকবে। স্বাধীনভাবে কথা বলার অর্থ এই না যে লাগামহীন ভাবে সেটা হতে পারে না।
রায়ের শেষদিকে জনকন্ঠের সম্পাদক ও প্রকাশক আতিকুল্লাহ খান মাসুদ এবং নির্বাহী সম্পাদক ও কলাম লেখক স্বদেশ রায়ের বিরুদ্ধে আনা আদালত অবমাননার বিষয়ে সিদ্ধান্ত জানান আদালত।
মাহবুবে আলম বলেন, লেখক স্বদেশ রায় ও সম্পাদক আতিকুল্লাহ খান মাসুদকে দোষী সাবস্ত করেছেন এবং উভয়কে আদালতের কার্যক্রম চলাতক পর্যন্ত কারাদণ্ড প্রদান করেছেন এবং দুজনকেই দশ হাজার টাকা করে জরিমানা করেছেন। জরিমানার টাকা আগামী সাত দিনের ভিতরে যে কোন সেবামূলক প্রতিষ্ঠানে জমা দিতে হবে। নচেত তারা আরোও সাতদিন বিনাশ্রম কারাদন্ডে দন্ডিত হবেন।
রায় ঘোষণার আগে প্রধান বিচারপতি এস. কে. সিনহা বলেন, ১৯২৬ সালের আদালত অবমাননা আইন অনেক পুরোনো যার সংশোধন হওয়া প্রয়োজন।
রায়ের পর আতিকুল্লাহ খান মাসুদ এবং স্বদেশ রায়ের আইনজীবী সালাউদ্দিন দোলন বলেন, আমরা সর্বোচ্চ আদালতের রায় মেনে নিয়েছি। তবে সত্য ঘটনার ওপর ভিত্তি করেই প্রবন্ধটি লেখা হয়েছিলো। এজন্য আমরা আশা করেছিলাম আদালত তাদের নির্দোষ ঘোষণা করবেন। এ বিষয়ে আলোচনার পর রিভিউয়ের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।
শুনানিতে দুই বিচারপতির কথোপকথনের একটি সিডি ও লিখিত রূপ জমা দেওয়া হলেও সংক্ষিপ্ত রায়ে সে বিষয়ে উল্লেখ না থাকায় পূর্ণাঙ্গ রায়ে এ বিষয়ে আলোচনা থাকবে বলে আশা প্রকাশ করেন সালাউদ্দিন দোলন ।
‘পালাবার পথ কমে গেছে’ শিরোনামে ১৬ জুলাই জনকণ্ঠ পত্রিকায় উপ-সম্পাদকীয় প্রকাশিত হয়। যার লেখক ছিলেন স্বদেশ রায়। ওই উপ-সম্পাদকীয় প্রকাশের ব্যাখ্যা চেয়ে ২৯ জুলাই সম্পাদক আতিকুল্লাহ খান মাসুদ ও কলাম লেখক স্বদেশ রায়ের বিরুদ্ধে আদালত আবমাননার রুল জারি করেন সুপ্রিম কোর্টের আপিল।
অন্যদিকে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সম্পদের হিসাব বিবরণী জমা না দেওয়ায় দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) দায়ের করা মামলায় দৈনিক আমার দেশের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মাহমুদুর রহমানকে ৩ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত।একই সঙ্গে তাকে ১ লাখ টাকা জরিমানা এবং অনাদায়ে আরও এক মাসের কারাদণ্ডাদেশ দেওয়া হয়েছে।
বৃহস্পতিবার রাজধানীর বকশিবাজারে কারা অধিদফতরের প্যারেড মাঠে স্থাপিত তৃতীয় বিশেষ জজ আবু আহমেদ জমাদারের আদালত এ রায় দেন।
মাহমুদুর রহমানের আইনজীবী অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদিন মেজবাহ কারাদণ্ডের বিষয়টি জানিয়েছেন। দুদকের পক্ষে আইনজীবী ছিলেন খুরশীদ আলম খান। রায় শোনাতে মাহমুদুর রহমানকে আদালতে হাজির করা হয়েছিলো। সাজার পরোয়ানা দিয়ে তাকে ফের ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।
সম্পদের হিসাব বিবরণী চেয়ে ২০১০ সালের ১৩ এপ্রিল মাহমুদুর রহমানকে নোটিশ দেয় দুদক। হিসাব দাখিল না করায় একই বছরের ১৬ জুন গুলশান থানায় দুদকের উপ-পরিচালক নুর হোসেন মামলা দায়ের করেন।
গত বছরের ১৩ জুলাই তাকে দুদকের দুর্নীতি মামলায় গ্রেফতার দেখানো হয়। ২০১৩ সালের ১১ এপ্রিল মাহমুদুর রহমানকে আমার দেশ কার্যালয় থেকে গ্রেফতারের পর থেকে তিনি কারাগারে আছেন।






