বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ কমে যাওয়ায় ব্যাংকিং খাতের ঋণ বিতরণ (ঋণ প্রবৃদ্ধি) কমেছে। ফলে দেশের বিনিয়োগ পরিস্থিতিতে মন্দা ভাব চলছে। চলতি বছরের মার্চ থেকে জুন পর্যন্ত এই ৩ মাসের ব্যবধানে ব্যাংকের ঋণ বিতরণ কমেছে ৬২ হাজার কোটি টাকা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ হালনাগাদ তথ্য থেকে এসব জানা গেছে।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, ব্যাংকিং খাতে বিশৃঙ্খলা চলছে। এছাড়া প্রয়োজনীয় গ্যাস-বিদ্যুতের অনিশ্চয়তা, বিনিয়োগে যেতে সরকারি নানা দপ্তরে হয়রানি, অর্থপাচার, দেশের বর্তমান ডেঙ্গু আতঙ্ক, বন্যা, রোহিঙ্গা সমস্যা ও বিনিয়োগের সুষ্ঠু পরিবেশ না থাকাসহ বিভিন্ন কারণে বিনিয়োগে মন্দা দেখা দিয়েছে। ফলে বেসরকারি খাতে ঋণ বিতরণের পরিমাণ কমেছে।
তবে প্রয়োজনীয় নীতি ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে বেসরকারি খাতকে বিনিয়োগে আকৃষ্ট করলে অবশ্যই বিনিয়োগ পরিস্থিতি ঘুরে দাঁড়াবে বলে মনে করেন তারা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত সরকারি ও বেসরকারি ব্যাংকের ঋণ বিতরণের পরিমাণ ছিল ৯ লাখ ৩৩ হাজার ৭২৭ কোটি কোটি টাকা। গত জুন মাসে ব্যাংকগুলোর মোট ঋণ বিতরণের পরিমাণ কমে দাঁড়ায় ৮ লাখ ৭১ হাজার ৭০৫ কোটি টাকা। এতে মাত্র ৩ মাসের ব্যবধানে ব্যাংকখাতে ঋণ বিতরণের পরিমাণ কমেছে ৬২ হাজার কোটি টাকা।

ঋণ বিতরণ কমছে কেন জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন, প্রথমত, ব্যাংকে তারল্য সংকট রয়েছে। নতুন উদ্যোক্তাদের ঋণ দিতে পারছে না।
দ্বিতীয়ত, দেশে ডেঙ্গু রোগের প্রকোপ বেড়েছে, বন্যা হয়েছে ও রোহিঙ্গা নিয়ে সমস্যা রয়েছে। এসব কারণে বিনিয়োগ কমছে। কারণ যারা বিনিয়োগ করবে তারা সাধারণত দীর্ঘ বা মধ্যমেয়াদে বিনিয়োগ করে। তাই তারা বিনিয়োগ করার আগে দেশের সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে। এখন পরিস্থিতি খুব বেশি অনুকূলে নয় তাই উদ্যোক্তারা বিনিয়োগ করছে না।
তিনি বলেন, চাহিদা না থাকলে তো উৎপাদন বাড়ে না। মানুষের চাহিদা কমেছে। তাই উৎপাদনে যাচ্ছে না বিনিয়োগকারীরা।
“এছাড়া একজন উদ্যোক্তা বিনিয়োগ করতে গেলে তাকে ১২ থেকে ১৪টি সরকারি সংস্থা থেকে কাগজপত্র নিতে হয়। অন্যদিকে দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতিসহ নানা ঝামেলা রয়েছে। সার্বিকভাবে বলতে গেলে এখনও বিনিয়োগের সুষ্ঠু পরিবেশ তৈরি হয়নি। এসব কারণে অনেকেই বিনিয়োগ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে।”
বিনিয়োগ বাড়াতে প্রয়োজনীয় নীতি ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা দরকার বলে মনে করেন সাবেক গভর্নর ফরাস উদ্দিন।

তিনি চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন, এটা অনেক আলোচিত বিষয়। বেসরকারি ঋণ বিতরণ বাড়ানোর জন্য যে নীতি গ্রহণ করা দরকার তার দায়িত্ব সরকারের। সরকার উপযুক্ত নীতির মাধ্যমে বেসরকারি খাতকে বিনিয়োগে আকৃষ্ট করবে এটাই প্রত্যাশিত।
“কিন্তু বিনিয়োগ হচ্ছে না বিভিন্ন কারণে। ধরা যেতে পারে যেমন, দেশের বাইরে যথেষ্ট টাকা-পয়সা পাচার হয়ে যাচ্ছে। এছাড়া উৎপাদনস্থলে প্রয়োজনীয় গ্যাস ও বিদ্যুৎ পাচ্ছে না। এটা বিনিয়োগে বড় ধরনের বাধা। ফলে নতুন বিনিয়োগকারীরা এগিয়ে আসছে না।”
তিনি বলেন, বিনিয়োগ না বাড়লেও ব্যাংকিং খাতে মুনাফা বাড়ছে। আর অধিকাংশ বড় বিনিয়োগকারীদের নিজস্ব ব্যাংক রয়েছে। তারা চিন্তা করে বিনিয়োগে যেহেতু সমস্যা রয়েছে অন্যদিকে ব্যাংকের মুনাফা হচ্ছে তাহলে বিনিয়োগ করার দরকার নাই। কারণ ব্যাংক থেকে তো মুনাফা আসছেই। এসব বিষয় চিন্তা করেই অনেকে নতুন করে বিনিয়োগে যাচ্ছে না।
পরিচালনার ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলোর কিছু দুর্বলতা রয়েছে বলে মনে করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খোন্দকার ইব্রাহীম খালেদ।

তিনি চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন, ব্যাংকের কার্যবক্রমে এক ধরনের স্থবিরতা দেখা যাচ্ছে। ব্যাংকগুলোকে স্বাধীন ভাবে চলতে দেয়া হচ্ছে না। এমনকি বাংলাদেশ ব্যাংক নিজেও স্বাধীনভাবে কাজ করছে না। অর্থাৎ পেশাগতভাবে ব্যাংকগুলো সঠিক পথে চলছে না। এ সব কারণে ব্যাংকিং খাতে বিশৃঙ্খলা রয়েছে।
“ব্যাংকের মালিক ও ব্যবস্থাপনার মধ্যে কিছু অমিল রয়েছে। এ কারণে ঋণ বিতরণে উদ্যোগ নিচ্ছে না। অন্যদিকে দেশের অবস্থা খুব বেশি ভাল যে তা নয়। তাই বিনিয়োগে মন্দা ভাব। ফলে বেসরকারি খাতে ঋণ বিতরণ কমেছে।”
বাংলাদেশ প্রতিবেদনে দেখা যায়, চলতি বছরের ৩০ জুনের পরে দেশের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর বিতরণ করা মোট ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ৮ লাখ ৭১ হাজার ৭০৫ কোটি টাকা। গত মার্চে এর পরিমাণ ছিল ৯ লাখ ৩৩ হাজার ৭২৭ কোটি ১৪ লাখ টাকা। মাত্র ৩ মাসে দেশে ব্যাংকিং খাতে ঋণ বিতরণ কমেছে ৬২ হাজার ২২ কোটি টাকা।
অন্যদিকে চলতি বছরের ৩০ জুন পর্যন্ত সময়ে দেশে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ১২ হাজার ৪২৫ কোটি টাকা। যা বিতরণ করা ঋণের ১১ দশমিক ৬৯ শতাংশ। এর আগে গত ডিসেম্বরে খেলাপি ঋণ ছিল ৯৩ হাজার ৯১১ কোটি টাকা।








