বাংলাদেশের পরেই সর্বাধিক বাঙ্গালীদের আবাসস্থল পশ্চিমবঙ্গের কলকাতায় ঐতিহাসিক ইডেন গার্ডেনে মাশরাফি, তাসকিন রবই উচ্চকিত হওয়া স্বাভাবিক ছিলো। তাও আবার আরেক প্রতিদ্বন্দ্বী দলটি যখন চিরবৈরি পাকিস্তান। কিন্তু গ্যালারি আজ নিরাশ করেছে টাইগারদের, করেছে বিস্মিতও। পাকিস্তানী ক্রিকেটের সমর্থকদের গর্জনে মাটিচাপা পড়েছে ‘দ্বিতীয় হোম গ্রাউন্ড’ ভাবনা।
সামাজিক মাধ্যম ফেসবুকেও জোয়ার নেমেছে আবেগী, ক্রদ্ধ নানা মন্তব্যসহ এমনটাই স্বাভাবিক ধারণার পক্ষেও। বিশ্বজুড়ে ভারত-পাকিস্তানের ক্রিকেট ভক্তদের একে অপর দেশের সমর্থনসূচক ফেসবুক প্রোফাইল ফ্রেমও বিভক্তি ভুলে বন্ধনের আবহ ছড়িয়েছে। তবে ভাষা-সংস্কৃতিতে নৈকট্য, বন্ধুসুলভ প্রতিবেশী দেশে এমন অপ্রত্যাশিত আচরণ কেনো?
বিশ্বকাপ টি-২০ এর মূল পর্বের প্রথম ম্যাচটি বাংলাদেশ দলের জন্য এখন পর্যন্ত শুভ কোনো বার্তা দিচ্ছে না। শেহজাদ, হাফিজ, আফ্রিদিদের ঝড়ো ইনিংসে টসে জিতে ব্যাট করতে নামা দলটি ২০১ রানের পাহাড় গড়ে। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত ব্যাটিংয়েও সুবিধা করতে পারছেন না টাইগাররা। ১০ ওভার শেষে তিন উইকেট হারিয়ে তাদের সংগ্রহ ৬৯ রান। ফিরে গেছেন তামিম, সৌম্য, সাব্বির।
আফ্রিদিদের সমর্থকদের ব্যাপক আধিপত্য দেখে বিস্ময় প্রকাশ করে পান্থ রহমান লিখেন, খেলা কী পাকিস্তানে হয় নাকি ইন্ডিয়ায়? ইন্ডিয়ায় তো দেখি পাকিরা হোম গ্রাউন্ডের সুবিধা পাচ্ছে! মানে কী! বন্ধু ফেলে ‘শত্রু’ প্রেমের প্রাবল্যে জিয়া হাসানের মন্তব্যটিও তেমনই- কি আশ্চর্যের বিষয়, অধিকাংশ ভারতীয় দর্শক বন্ধু রাষ্ট্র বাংলাদেশের বিপক্ষে শত্রুরাষ্ট্র পাকিস্তানকে সমর্থন দিচ্ছে!
অনেকের মতেই বাংলাদেশের প্রবল অগ্রগতিতেই নিজ দলের প্রতি হুমকি বিবেচনা ভীত করেছে গ্যালারির দর্শকদের। তেমনই একজন কবির য়াহমদ তার স্ট্যাটাসে লিখেন- “ইডেনের দর্শকেরা পাকিস্তানকে সাপোর্ট দেওয়ায় মন খারাপ অনেকের। আমার মোটেও না। কলকাতাবাসী বাঙালি হলেও জাতীয়তায় ভারতীয়। আর কে না জানে, এই মুহূর্তে ক্রিকেটিয় দৃষ্টিতে তাদের একমাত্র থ্রেট বাংলাদেশের অগ্রগতি। এশিয়ায় ভারত ও বাংলাদেশ ছাড়া বাকিরা সব সুর্যাস্ত দেখছে। আর প্রধান প্রতিপক্ষকে সাপোর্ট দেওয়ার মত বোকাসোকা মানুষ ত তারা নয়ই!
সে হিসেবে পাকিস্তানকে ভারতের সমর্থন স্বাভাবিকই। সে খেলা কলকাতা, দিল্লি কিংবা লাহোর যেখানেই হোক!”
টাইগার আতঙ্ককেই মুল কারণ বলে একই ধরণের ব্যাখ্যা দেন আরিফ জেবতিক। লিখেন- কলকাত্তানরা জানে তাঁদের আসল হুমকি কারা। তারা জানে পাকিস্তানিদেরকে যে কোনো সময় দুই চার টাকায় কিনে নেয়া যায়, কিন্তু বাংলাদেশীরা খেলবে জানপ্রাণ দিয়ে সারাটা জীবন। তাই এরা সবাই পাকিস্তানিদেরকে সাপোর্ট দিচ্ছে। আমি আনন্দিত। খেলা হারি আর জিতি, ইন্ডিয়ার হাফবাঙুলরা যে আমাদেরকে সমীহ করছে সেটার আনন্দটুকু অন্তত নিচ্ছি।
এমন ‘বিপরীত’ প্রেমের কারণ খুঁজতে গিয়ে ক্রদ্ধ প্রতিক্রিয়ায় ফজলুল বারী লিখেন, আমার কাছে অনেকে জানতে চাইছেন মাঠে এতো পাকিস্তান সাপোর্টার কেনো ভাই। এরা আসলে কলকাতার উর্দুভাষী মুসলিম। এরা থাকে ভারতে গুন গায় পাকিস্তানের। যেমন প্রচুর আটকে পড়া পাকিস্তানি আছে বাংলাদেশে। বুঝে হোক না বুঝে হোক … মতো তারা পাকিস্তানকে সমর্থন করে।
তবে সম্প্রতি এশিয়া কাপের ফাইনালের আগে এমএস ধোনীর কাটা মুখাবয়ব হাতে তাসকিনের সেই যুদ্ধংদেহী, দৃষ্টিকটু পোস্টারের কথা স্মরণ করে আব্দুল্লাহ আল শাফী লিখেন- ইডেন গার্ডেনে এতো পাক সমর্থক! – ধোনির মুন্ডু কেটে হাতে নেবে আবার কলকাতার সাপোর্টও চাও!
পাকিস্তানপ্রীতির যৌক্তিকতা প্রমাণে নাফিস ইফতেখার অনিন্দ্যের প্রেক্ষাপট আরও বিস্তৃত। সেই সর্বশেষ ওডিআই বিশ্বকাপের আম্পায়ারদের বিতর্কিত সিদ্ধান্তের জন্য কলঙ্কিত কোয়ার্টার ফাইনালের সময় থেকে টাইগারভক্তদের অতি আগ্রাসী আচরণের সমালোচনা করে তিনি লিখেন- গত ওয়ানডে বিশ্বকাপের পর থেকে আপনারা সামগ্রিকভাবে একটি দেশের পেছনে যেভাবে উঠে-পড়ে লেগেছেন, উঠতে-বসতে গালাগালি দিচ্ছেন, দেশটার নাম এবং প্রতিটি খেলোয়াড়ের নাম যেভাবে বিকৃত করে উচ্চারণ করেন – ওই দেশের খুব একটা ঠেকা পরে নাই তাদের মাঠে খেললে তারা আপনাকে সাপোর্ট দেবেন। আমাদের মাঠে পাকিস্তান খেললেতো আবার আপনাদের মাথা ঠিক থাকে না। ঠিকই পাকিস্তান-পাকিস্তান করে চিল্লায় মাঠ কাঁপান। ভারতের ক্ষেত্রে আবার উল্টোটা। তখন আর ইতিহাস দেখেন না, চিরপ্রতিদ্বন্দ্বীতা মনে থাকে না।
বাংলাদেশী ভক্তদের তীব্র সমালোচনা করে অনিন্দ্য লিখেন, আপনাদের দ্বিমুখী স্বভাবের কারণেই অনলাইনের প্রতিটা ফোরাম, পেইজ আর গ্রুপে আমাদের ফ্যানদের কেউ মিনিমাম সম্মান দেয় না। শুধু ভারত বা পাকিস্তান না… অন্যান্য দেশের ক্রিকেট ফ্যানরা আমাদেরকে সিম্পলি ঘৃণা করে। আমরা এটাই ডিজার্ভ করি। তাই দয়া করে মাঠের খেলাটাকে মাঠেই রাখুন। অপ্রয়োজনীয় কুৎসা রটিয়ে অপ্রয়োজনীয় শত্রু বাড়াবেন না। টিম এই মুহূর্তে খারাপ খেলছে, তার দায়ভার টিমের। ভালো খেললে তো আর নিশ্চয়ই গ্যালারির দিকে তাকাতেন না।
তবে আরাফাত সিদ্দিক আবার আল আমিন, মাশরাফিদের দুর্দশা দেখে বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ থেকে ৮০০ কোটি হ্যাকিং হয়ে যাওয়ার প্রসঙ্গটিও তুলে এনে সরস মন্তব্য লিখেন- এতোবার কইরা কইলাম, রিজার্ভের টাকা হারানোর চিন্তা মাথায় নিয়া খেলতে নাইমো না।






