ম্যাচ শেষ করে আব্দুর রাজ্জাক সোজা ঢুকে গেলেন ড্রেসিংরুমে। কিছুক্ষণ পর ফিরে এলেন সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার নিতে। শের-ই-বাংলা স্টেডিয়ামের দুই ড্রেসিংরুমের মাঝ বরাবর পুরস্কার বিতরণী মঞ্চে দাঁড়িয়ে জানলেন নিজের কীর্তির খবর। প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে লিস্ট ‘এ’ ক্রিকেটে ৪০০ উইকেট প্রাপ্তির কথা জেনে ৩৭ ছুঁইছুঁই এ বাঁহাতি স্পিনারের চেহারায় খেলে গেল আনন্দের দোল।
পড়ন্ত বিকেলে মিরপুরের নিস্তব্ধতা ভাঙলেন ম্যাচ রেফারি রকিবুল হাসান। প্রাইম ব্যাংকের হয়ে ১৫ রানে ৪ উইকেট নেয়া রাজ্জাকের হাতে ক্রেস্ট তুলে দেয়ার আগে সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে সাবেক এ অধিনায়ক প্রিমিয়ার লিগের নবাগত ক্লাব উত্তরা স্পোর্টিংয়ের খেলোয়াড়দের উদ্দেশে বললেন, ‘তোমরা দেখ সে(রাজ্জাক) এখনও কত ইয়াং। বল করছে উইকেট পাচ্ছে, ফিল্ডিংয়ে থ্রো করে স্টাম্প ভাঙছে। তোমাদের সামনে এরচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা আর কী হতে পারে?’
সকালে মিরপুরে বৃষ্টি হওয়ায় প্রাইম ব্যাংক ও উত্তরার ম্যাচটা হয়েছে ৩৮ ওভারের। খেলা শুরু করতে বিলম্ব হওয়ায় শেষ হতে হতে পড়ন্ত বিকেল। শুনশান নীরবতার মাঝেই করতালি দিয়ে স্টেডিয়ামে প্রাণসঞ্চার করলেন উত্তরার খেলোয়াড়রা। অভিজ্ঞ তারকার এমন অনন্য কীর্তির পর এতটুকু তো প্রাপ্যই ছিল রাজ্জাকের!
আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে রাজ্জাক প্রকাশ করলেন উচ্ছ্বাস-অনুভূতি, ‘একটা খেলোয়াড়ের জন্য প্রতিটি মাইলফলক স্পর্শ করা সবসময়ই বিশাল ব্যাপার। আমারও ব্যতিক্রম কিছু না। এখনো আমি খেলা উপভোগ করি। ভালো করলে ভালো লাগে। খারাপ খেললে খারাপ লাগে। সব সময়ই বড় কথা, ক্রিকেটটা এখনো উপভোগ করি।’
প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে যখন ৬০০ উইকেটের (বর্তমানে ৫৮১) মাইলফলক ছোঁয়ার অপেক্ষায় রাজ্জাক, তখন ৫০ ওভারের ক্রিকেটে লিখে ফেললেন আরেক রূপকথা। লিস্ট ‘এ’ ক্রিকেটেও উঠলেন চূড়ায়। করলেন ম্যাচ জেতানো বোলিং। ৮ ওভারে দিলেন মাত্র ১৫ রান। সরাসরি থ্রোতে রান আউট করলেন প্রতিপক্ষ দলের অধিনায়ক মোহাইমেনুল খানকে।
ঢাকা লিগে নামার আগে ৪০০ থেকে ৮ উইকেট দূরে ছিলেন রাজ্জাক। প্রাইম ব্যাংকের জার্সিতে প্রথম পাঁচ ম্যাচে নেন ৭ উইকেট। বুধবার তার সামনে আসে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। উত্তরার ওপেনার আনিসুল ইসলাম ইমনকে বোল্ড করতেই নাম উঠে যায় এলিট ক্লাবে। রাজ্জাক পরে নেন আরও ৩ উইকেট। দলকে দেখান জয়ের দিশা।
তখনও রাজ্জাক জানতেন না অসাধারণ মাইলফলকের ব্যাপারটি। ম্যাচ সেরার পুরস্কার নিতে এসে জানতে পারেন এক সাংবাদিকের মাধ্যমে, ‘আমার জানা ছিল না (৪০০ উইকেট), পরিসংখ্যান খুব একটা অনুসরণ করি না। আপনাদের কাছ থেকেই শুনেছি।’
‘ক্রিকেট যারা খেলেন, তাদের সবাইকে মনোযোগী থাকা উচিত। মনোযোগী হতে হলে ফিটনেস ধরে রাখতে হবে। ফিটনেস ঠিক থাকলে মনোযোগী থাকাটা সহজ হয়ে যায়। ক্রিকেট খেলার সময় বাইরের জিনিস নিয়ে বেশি চিন্তা করা ঠিক নয়। হতে পারে একেকজনের একেকরকম লাইফ স্টাইল। আমি খেলার সময় অন্যকিছু ভাবতে পারি না। পরিবার এখনো অনেক সাপোর্ট দেয়। পরিবারকে অনেক ধন্যবাদ, তাদের সাপোর্ট ঠিকমতো না পেলে কঠিন হয়ে যেত আমার জন্য।’ পরে তরুণ ক্রিকেটারদের উদ্দেশে রাজ্জাক বললেন এভাবেই।
বাংলাদেশ দলের একসময়কার অপরিহার্য স্পিনার আব্দুর রাজ্জাক ঘরোয়া ক্রিকেটকে আলোকিত করে যাচ্ছেন সেই ২০০১ সাল থেকে। দেড়যুগে ক্যারিয়ার যে আরও দূরে টেনে নিয়ে যেতে চান সেটি বোঝা গেল পরের কথাতেই, ‘কতদিন খেলব, ঠিক করিনি। যতদিন ফিট থাকব খেলব। আগেই বলেছি, যতদিন উপভোগ করব ততদিন খেলব।’
বল হাতে ঘরোয়া ক্রিকেটে রাজা রাজ্জাকের নামের পাশে লিস্ট ‘এ-তে এখন ৪০৩ উইকেট। খেলেছেন ২৬৯ ম্যাচ। সাদা পোশাকে এ স্পিনারের উইকেট ৫৮১টি। আর টি-টুয়েন্টিতে ৯৯। তিন সংস্করণ মিলে আগেই হাজার ছাড়িয়েছেন নিজের ঝুলিতে নেয়া উইকেটের সংখ্যা। কোথায় গিয়ে থামবেন রূপকথার এই নায়ক, আরও কত শৃঙ্গ ছোঁবেন? সমবয়সীদের অনেকেই যখন ব্যাট-প্যাড-বল তুলে রেখেছেন, তখন তার এই অদম্য ছুটে চলা সত্যিই কৌতূহল জাগায়! জাগায় অনুপ্রেরণাও!







