ঢাকার একটি ক্যাফে। কফির কাপে চুমুক দিতে দিতে একদল তরুণের আড্ডা জমে উঠেছে। তবে এই আড্ডার বিষয়বস্তু প্রথাগত বিনোদন নয়। ল্যাপটপের স্ক্রিনে আইইএলটিএস প্রস্তুতির ওয়েবসাইট আর পোর্টেবল হার্ডড্রাইভে সাজানো বিদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকা। এদেরই একজন বলে উঠলেন, “এখানে কি দীর্ঘমেয়াদে আমাদের পেশাগত সম্ভাবনা পর্যাপ্ত?”
এই প্রশ্নটি বর্তমানে অনেক শিক্ষার্থীর মনে প্রতিফলিত হচ্ছে।
শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের বহির্গমন টার্মিনালে বিচ্ছেদের বিষাদ আর নতুন সম্ভাবনার হাতছানি এখন নিয়মিত দৃশ্য। তবে প্রশ্ন হচ্ছে, দেশত্যাগের এই প্রবল আগ্রহ কি কেবল উচ্চশিক্ষা ও ভালো চাকরির প্রত্যাশা, নাকি এর পেছনে আরও গভীর সামাজিক ও অর্থনৈতিক কারণ রয়েছে?

জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (বিএমইটি)-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে বাংলাদেশ থেকে রেকর্ড ১৩ লাখেরও বেশি মানুষ কর্মসংস্থানের উদ্দেশ্যে বিদেশ পাড়ি দিয়েছে। ২০২৪ সালের প্রথম প্রান্তিকের উপাত্ত বলছে, এই প্রবাহ অব্যাহত রয়েছে। বিশেষভাবে উচ্চশিক্ষিত এবং দক্ষ পেশাজীবীদের মধ্যে এই প্রবণতা লক্ষ্যণীয়।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ শ্রমশক্তি জরিপ অনুযায়ী, প্রতি বছর প্রায় ২০ থেকে ২২ লাখ মানুষ শ্রমবাজারে যুক্ত হচ্ছে। তবে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও)-এর তথ্যমতে, তরুণ প্রজন্মের মধ্যে বেকারত্বের হার জাতীয় গড় বেকারত্বের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি।
ব্রিটিশ কাউন্সিলের ‘নেক্সট জেনারেশন বাংলাদেশ’ প্রতিবেদনেও উঠে এসেছে যে, তরুণ সমাজ কেবল আর্থিক সচ্ছলতা নয়, বরং মানসম্মত জীবনযাত্রার খোঁজে দেশ ছাড়তে আগ্রহী।
বাংলাদেশের অর্থনীতি গত এক দশকে গড়ে ৬ শতাংশের বেশি জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। তবে এই প্রবৃদ্ধি কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে কতটা ভারসাম্য তৈরি করেছে, তা নিয়ে অর্থনীতিবিদদের মধ্যে তাত্ত্বিক আলোচনা রয়েছে। বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থা অনেক ক্ষেত্রে তাত্ত্বিক নির্ভর হওয়ায় তা আধুনিক বিশ্বের চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের চ্যালেঞ্জ মোকবিলায় পর্যাপ্ত নয় বলে অনেকে মনে করেন। এর ফলে একটি বৈপরীত্য তৈরি হয়েছে। একদিকে প্রতিষ্ঠানের মালিকেরা দক্ষ জনবলের অভাবের কথা বলছেন, অন্যদিকে স্নাতক এবং স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারীদের বড় অংশ উপযুক্ত কর্মসংস্থান খুঁজে পেতে হিমশিম খাচ্ছে। এই ‘দক্ষতার ঘাটতি’ কর্মপ্রার্থীদের আত্মবিশ্বাসে প্রভাব ফেলছে। অনেকে মনে করেন, দেশে দীর্ঘ সময় প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার পেছনে ব্যয় করার চেয়ে বিদেশে গিয়ে দ্রুত পেশাগত ও আর্থিক নিশ্চয়তা অর্জন করা বেশি বাস্তবসম্মত।

বিশেষজ্ঞরা একে ‘মেধা পাচার’ হিসেবে অভিহিত করছেন। প্রযুক্তি, চিকিৎসা ও গবেষণার মতো বিশেষায়িত খাতগুলোতে বাংলাদেশ যখন দক্ষ জনবলের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছে, তখন এই খাতের অনেক মেধাবী প্রবাসী হিসেবে অন্য দেশে অবদান রাখছেন। যদিও প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স দেশের রিজার্ভের প্রধান উৎস, তবুও প্রশ্ন জাগে, এই মেধাকে অভ্যন্তরীণ কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে আরও কার্যকরভাবে ব্যবহার করা সম্ভব কি না।
দেশত্যাগের এই প্রবণতার পেছনে অর্থনৈতিক কারণের পাশাপাশি সমাজতাত্ত্বিক ‘পুশ’ এবং ‘পুল’ ফ্যাক্টর কাজ করছে। অভ্যন্তরীণ কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা ও মেধার সঠিক মূল্যায়নের অভাব অনেককে বাইরে যেতে উৎসাহিত করছে। অন্যদিকে উন্নত বিশ্বের সামাজিক নিরাপত্তা ও গবেষণার সুযোগ এদের আকৃষ্ট করছে। বর্তমান প্রজন্মের কাছে সাফল্যের সংজ্ঞা কেবল মৌলিক চাহিদা পূরণ নয়, বরং বাকস্বাধীনতা, ব্যক্তিগত নিরাপত্তা এবং উন্নত নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করা। এছাড়া সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির কারণে অনেক সময় কারিগরি বা কায়িক শ্রমের পেশাকে দেশে যথাযথ মর্যাদা দেওয়া হয় না, যা বিদেশে ‘ডিগনিটি অফ লেবার’ হিসেবে স্বীকৃত। এই মনস্তাত্ত্বিক পার্থক্য তরুণদের প্রবাস জীবনের প্রতি আগ্রহী করে তুলছে।
পারিবারিক প্রত্যাশাও এখানে বড় ভূমিকা রাখে। মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো অনেক সময় জীবনের সঞ্চয় ব্যয় করে সন্তানকে উন্নত দেশে পাঠাতে চায়, যা একটি পারিবারিক বিনিয়োগে পরিণত হয়েছে। বিশ্বায়নের এই যুগে ইন্টারনেটের কল্যাণে তরুণেরা নিজেদের ‘গ্লোবাল সিটিজেন’ হিসেবে গড়ে তুলতে চাইছে।
পরিসংখ্যান বলছে, প্রতি বছর স্টুডেন্ট ভিসায় দেশ ছাড়ার হার গত পাঁচ বছরে প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। এদের একটি বড় অংশ পড়াশোনা শেষ করে আর দেশে ফিরতে আগ্রহী হচ্ছে না, কারণ অভ্যন্তরীণ বাজারে এদের উচ্চাকাঙ্ক্ষা পূরণে সীমাবদ্ধতা রয়েছে।
এই প্রবণতা নিয়ন্ত্রণে দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার প্রয়োজন। প্রথমত, শিক্ষাব্যবস্থাকে আধুনিকায়ন করে বাজার চাহিদার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে হবে। দ্বিতীয়ত, ব্যাংক ঋণ প্রাপ্তি সহজ করে উদ্যোক্তাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। তৃতীয়ত, নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও মেধার সর্বোচ্চ মূল্যায়ন নিশ্চিত করা জরুরি। চতুর্থত, বিজ্ঞান ও মৌলিক গবেষণায় রাষ্ট্রীয় বরাদ্দ বৃদ্ধি এবং এর সঠিক বাস্তবায়ন প্রয়োজন যাতে মেধাবীরা দেশেই কাজের অনুকূল পরিবেশ পায়।
বাংলাদেশ বর্তমানে ‘জনতাত্ত্বিক লভ্যাংশ’ বা ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডের সুযোগ উপভোগ করছে। মোট জনসংখ্যার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ তরুণ। এটি যেমন সম্ভাবনা, তেমনি সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত না হলে তা চ্যালেঞ্জে পরিণত হতে পারে। তরুণদের এই আকাঙ্ক্ষাকে কেবল চাকরির অভাব হিসেবে না দেখে সামগ্রিক ব্যবস্থার আধুনিকায়নের সংকেত হিসেবে দেখা উচিত। অবকাঠামোগত উন্নয়নের পাশাপাশি মানবিক ও পেশাগত উন্নয়নের পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি।
যদি একটি মেধাভিত্তিক সমাজ বিনির্মাণ করা যায় যেখানে পরিশ্রমের যথাযথ মূল্যায়ন হবে, তবেই দেশ উন্নয়নের সুফল দীর্ঘমেয়াদে ভোগ করতে পারবে। সময় এসেছে তরুণদের এই আকাঙ্ক্ষাকে গুরুত্ব দিয়ে অনুধাবন করার। দেশত্যাগের প্রবাহকে কেবল নিয়ন্ত্রণ নয়, বরং দেশে থাকার পরিবেশকে আকর্ষণীয় ও কণ্টকমুক্ত করাই হোক আগামীর অগ্রাধিকার। যারা উন্নত ভবিষ্যতের খোঁজে বিদেশে যাচ্ছে, তাদের দক্ষতা ও মেধাকে দেশের প্রয়োজনে কাজে লাগানোর দায়বদ্ধতা রাষ্ট্রের এবং সমাজের। এই সুযোগের সঠিক ব্যবহারই নির্ধারণ করবে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ।
(এই বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)







