৩০ জুলাই ২০২৪, কাজে নিমগ্ন আমি। টেবিলের ওপর পড়ে থাকা মোবাইলে একটা কল আসে। অপর প্রান্ত থেকে জানানো হয়, জুয়েল চলে গেছে। জাস্ট ওই টুকুই। আমি জানতাম না, ও আমাদের সঙ্গে আর আড্ডা দেবে না, কথা হবে না সৃজনশীল কোনো আইডিয়া নিয়ে, কিংবা বিরুদ্ধ মতে ঝাঁঝিয়ে উঠবে না আর কোনো সন্ধ্যায়। গ্রীন বি-তে (ওর অফিস) বসাও কমিয়ে দিয়েছিল, তাও অনেকদিন। নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছিল প্রায়। খুব বেশি খারাপ লাগলে ফোন করে বলতো ‘ভাইডি, অফিস শ্যাষে আইয়া পইরয়েন, আম্মের লগে কতা আছে।’ দুজনে একত্রিত হলে বরিশালের ভাষায় কথা বলতাম। সেই ন্যাংটো বেলা থেকে একসাথে বেড়ে উঠেছি। শৈশবে একই বিদ্যাপীঠের ছাত্র ছিলাম, সামান্য ছোট-বড় ক্লাসে। তবে বয়স ও শ্রেণির বাধা ডিঙ্গিয়ে কখন আমরা হরিহর আত্মা হয়ে উঠি, তার দালিলিক প্রমাণ কোনোদিনই দিতে পারব না।
আট দশকের মধ্যদিকে জুয়েল বরিশাল ছাড়ে। ততদিনে মফস্বল শহরে ‘তারকা’ তকমা ওর গায়ে লেগে গেছে। চোখে বিশাল স্বপ্ন নিয়ে পা বাড়ায় রাজধানী অভিমূখে। খুব অল্প সময়ের মধ্যে জুয়েল ঢাকাস্থ সাংস্কৃতিক অঙ্গনে নিজের অবস্থান পাকা-পোক্ত করে ফেলে। হয়ে ওঠে দেশের সংগীত জগতের তারকা। সংগীতশিল্পী হয়েও সে নিজেকে যুক্ত করে অডিও-ভিজ্যুয়াল নির্মাণ শিল্পে। ক্রিয়েটিভ আইডিয়া জেনারেশন, স্ক্রিপ্ট রাইটিং, শুটিং, পোস্ট প্রোডাকশন, ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট-এর প্রতিটি কাজে সিদ্ধহস্ত জুয়েল।
বাংলাদেশের টেলিভিশন মাধ্যমে, বিশেষ করে বেসরকারি টিভি মিডিয়ায় অনুষ্ঠান নির্মাতা হিসেবে জুয়েল নির্মিত অনুষ্ঠান প্রসংগে আমার ব্যক্তিগত কিছু পর্যবেক্ষণ রয়েছে, যা এ লেখায় উল্লেখ করছি। ওর পরিকল্পনা ও প্রযোজনায় বাংলাদেশে বেশকিছু জনপ্রিয় অনুষ্ঠান রয়েছে, যার মধ্যে, ‘বলতে চাই’, ‘চ্যানেল আই পারফরমেন্স এ্যাওয়ার্ড‘ (২০০৩, শারজায় অনুষ্ঠিত), ‘বাংলাদেশের ঢোল’, ‘নতুন ঢাকের বাজনা’, ‘চ্যানেল আই সেরা কণ্ঠ’, ‘ ক্ষুদে গানরাজ‘, ‘সেরা রাঁধুনি’, ম্যাজিক বাউলিয়ানা’, ‘স্পেলিং বি’, ‘আলোয় ভূবন ভরা’, ‘মিউজিক ক্যাফে’ ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য।
জুয়েলের নির্মিত অনুষ্ঠানগুলোর মধ্যে এখনও বেশ কয়েকটি অনুষ্ঠান ধারাবাহিকভাবে অথবা সিজনওয়ারি নির্মাণ চলছে। অনেকে হয়তো জানবেন যে, জুয়েল ছিল এগুলো নির্মাণের পায়ওনিয়র। সৌভাগ্যবশত এসব রিয়ালিটি শো, টক শো কিংবা টিভি শো-এর পরতে পরতে জড়িয়ে থাকার বিরল সৌভাগ্য এ লেখকের হয়েছিল।
আজকের টেলিভিশন মাধ্যমে যারা কাজ করেন, তারা অনেকেই জানেন নির্মাতা হিসেবে জুয়েল কতটা পারদর্শী ছিল। সফল প্রযোজক বা নির্মাতা হিসেবে জুয়েলকে অনেকেই আইকন মনে করেন। এর নেপথ্যে যে কৌশলটি সবচেয়ে কার্যকর বলে মনে হয়, তা হলো ওর ‘পেপার ওয়ার্ক’। জুয়েল পেপার ওয়ার্কের প্রতি সবচেয়ে গুরুত্ব দিত। একটি অনুষ্ঠানের পরিকল্পনা থেকে শুরু করে বাস্তবায়নের প্রতিটি ধাপে ওর পেপার ওয়ার্ক কাজকে সহজ করে দিত। আমি দেখেছি, দিনের পর দিন, ঘণ্টার পর ঘণ্টা ও লিখতো। প্রতিটি কাজ পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে লিখে নিতো। ফলে অনেক নির্ভুল এবং ঝঞ্ঝাট মুক্ত কাজ হতো। আমরা যারা ভিজ্যুয়াল মিডিয়ার নেপথ্যে কাজ করি, তারা জানি শুটিংয়ের সময়ে স্পটে বসে অনেক পরিবর্তন পরিমার্জন করতে হয়। এ ক্ষেত্রে জুয়েলের প্রোডাকশনে পরিবর্তন কিংবা পরিমার্জনের পরিমাণ থাকতো হয়তো বা পাঁচ শতাংশ। কিংবা কখনো পরিবর্তনের প্রয়োজনই পড়েনি। চিত্রগ্রাহক থেকে শুরু করে প্যানেল ডিরেকটরগণ যার যার চেয়ারে বসে তার পূর্ব নির্ধারিত চাহিদা অনুযায়ী সবকিছু হাতের কাছে পেয়ে যেতেন যথাযথভাবে। এটি একটি জটিল কাজ। কিন্তু জুয়েলের সেটে যারা কাজ করেছেন, তারা আমার সঙ্গে একমত হবেন আশাকরি।
টিভি অনুষ্ঠান নির্মাণের প্রধানত তিনটি ধাপ। ‘প্রি-প্রোডাকশন’, ‘প্রোডাকশন’, এবং ‘পোস্ট প্রোডাকশন’। জুয়েল প্রি-প্রোডাকশনের পূর্বেই তার পরিকল্পনার প্রতিটি ধাপের কাজ কে করবে, কখন করবে, কীভাবে করবে-এভাবে বিস্তারিত লিখে রাখতো। প্রতিটি কাজের সংঙ্গে সম্পৃক্ত ব্যক্তিবর্গকে তার কাজের বিস্তারিত ফিরিস্তির একটি প্রিন্টকপি দিয়ে দিত। ফলে ওর কাজে ‘কমিউনিকেশন গ্যাপ’ খুব কম হতো।
আমরা জানি, নেতৃত্ব দেবার যোগ্যতা সবার থাকে না। জুয়েল সেই দুর্লভ যোগ্যতাসম্পন্ন একজন মানুষ। ওর নেতৃত্বে পুরো টিমের স্পিরিট বেড়ে যেতো। দুই যুগের অধিককাল ওর সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা থেকে একথা বলছি। প্রোডাকশন বয় থেকে ইভেন্ট ম্যানেজার কিংবা গ্যাফার হতে সেলিব্রেটি সবাই ওর নেতৃত্বে কাজ করতে স্বচ্ছন্দ্যবোধ করত। গত ২৪ বছরে কখনও দেখিনি জুয়েলের প্রোডাকশনে কারও সংগে বিরোধ বা ঝগড়া হয়েছে। উপরন্তু দীর্ঘ ব্যাপ্তির প্রোডাকশন শেষে সবার চোখে জল দেখেছি। মাসাধিককাল শুটিং শেষে ইউনিটের কেউ যেন কাউকে ছেড়ে যেতে চাইছে না, এমন পরিবেশই গড়ে তুলতে সক্ষম ছিল জুয়েল। যেদিন জুয়েল ‘প্যাক-আপ’ বলত, তারপর সবার মুখ মলিন হয়ে যেতো। যেনো আরও কিছু সময় থাকতে পারলে ভাল লাগত। জুয়েল সবার সাথে বুক মেলাতো এবং সবাইকে নিয়ে একটি ক্লোজিং ব্রিফ দিত, আর তখনই শুরু হতো জনে জনে চোখের অশ্রুধারা। মানুষকে আপন করে নেবার অপার ক্ষমতা মহান সৃষ্টিকর্তা ওকে দিয়েছিলেন।
শুধু প্রোডাকশন সম্পৃক্তরাই নন, সাধারণ যে কাউকে ও আপন করে নিতো মুহুর্তের মধ্যে। এখানে অপ্রাসঙ্গিক হলেও বলি। একজন রিক্সাচালক ছিলেন ওর গানের ভক্ত। সেই রিক্সাচালকের ছিল গান লেখার নেশা। একদিন জুয়েলের গুলশানের বাসায় গিয়ে হাজির। জুয়েল হাসিমুখে তাকে সময় দিল। বিদায়ের সময় জুয়েলের ব্যক্তিগত ফোন নম্বর চেয়ে বলল, ‘আমি নতুন গান লিখলে আপনাকে জানাবো।’ জুয়েল স্বভাবসূলভ হাসিতে সায় দিল। তারপর সেই লোকটি রাত বিরোতে ফোন করে নতুন লেখা লিরিক্স শোনাতো। জুয়েল ক্লান্ত-শ্রান্ত থাকলেও ফোন ধরতো হাসিমুখে। কখনোই তাকে ফিরিয়ে দেয়নি।
অনুষ্ঠান বা ইভেন্টে বাস্তবায়নের জন্য ওর একটি নিজস্ব দল কাজ করতো। পোস্ট প্রোডাকশনেও জুয়েলের ছিল তৈরি করা সম্পাদক। ‘সুঁই থেকে চন্ডীপাঠ’ প্রবাদের মতো একটি প্রযোজনার শুরু থেকে অন-এয়ার অবধি সকল কাজে জুয়েলের সম্পৃক্ততা ওকে অনবদ্য করে তুলেছে। কখনওই সে অন্যের ওপর শতভাগ নির্ভর করে কোনো কাজ বাস্তবায়ন করেনি। অথচ প্রতিটি প্রোডাকশনে নূন্যতম ষাট থকে দেড়শতাধিক প্রোডাকশন ক্রু নিয়ে ও সফলভাবে প্রোডাকশন সম্পন্ন করেছে। ও নির্ভর করতো না, কিন্তু আস্থা রাখতো-এটাই ওর বিশেষ মাহাত্ম্য।
জুয়েল নির্মিত অনুষ্ঠানের আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো, ওর দেশজ ভাবনা। প্রায় প্রতিটি অনুষ্ঠানে দেশ, বাঙালি সংস্কৃতির মূল উপাদান খুঁজে পাওয়া যায়। তারুণ্যকে ও সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিত, মূল্যায়ন করত। তরুণদের মনোজগতের চিন্তাকে তুলে নিয়ে আসতে জুয়েল নির্মাণ করেছিল ‘বলতে চাই’ শিরোনামে একটি টক শো। এ প্রজন্মের অনেকেই সে অনুষ্ঠানটির কথা মনে করতে পারবেন আশাকরি। বাংলাদেশে কিশোর-কিশোরীদের মনোজাগতিক ভাবনার প্রতিফলন নিয়ে ওটিই ছিল প্রথম কোনো টিভি অনুষ্ঠান, যার ধারাবাহিকতায় পরবর্তীতে নির্মাণ করে ‘মিথস্ক্রিয়া’ নামে আরেকটি অনুষ্ঠান। একইভাবে দেশজ সংগীতকে জনমনের কাছে তুলে ধরতে ২০১৩ সালে নির্মাণ করে ‘বাউলিয়ানা’ নামে একটি রিয়ালিটি শো। প্রসঙ্গত, দেশের বাউল গান নিয়ে এর আগে একটি বেসরকারি টিভি চ্যানেলের জন্য আরেকটি অনুষ্ঠান নির্মাণ করে জুয়েল, যা ছিল বাউলদের নিয়ে দেশের বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলের জন্য নির্মিত প্রথম অনুষ্ঠান। এই অনুষ্ঠানগুলোও অসম্ভব জনপ্রিয়তা পায়।
বর্তমানে অনেকে হতাশা নিয়ে বলে থাকেন, টেলিভিশনে মানসম্মত অনুষ্ঠান হচ্ছে না বা নেই। কিন্তু জুয়েলের পরিকল্পনায় নির্মিত অনুষ্ঠানগুলোর ওপর গবেষণা করলে আমরা হয়তো এর একটি যথাযথ উত্তর মেলাতে পারব। টেলিভিশন মাধ্যমের দর্শক, কেন জুয়েল প্রযোজিত অনুষ্ঠানগুলো গ্রহণ করেছে, কী ছিল এর প্রাণশক্তি, কোন বিষয় জনগণ এখনও দেখতে আগ্রহী ইত্যাদি সকল প্রশ্নের উত্তর মিলবে আশাকরি।
বাংলাদেশের বেসরকারি টেলিভিশন মিডিয়ার বয়স খুব একটা নয়। এটিকে একটি উদীয়মান ইন্ডাস্ট্রিও বলা চলে। সে হিসেবে জুয়েল নির্মিত অনুষ্ঠানগুলো এখনও প্রাসঙ্গিক। জুয়েল শুধু নিজে নয়, সে সৃজন করে গেছে এক ঝাঁক মিডিয়া কর্মী। ক্যামেরা ক্রু, প্রোডাকশন বয়, ক্যামেরাম্যান, মেকাপ আর্টিস্ট, গ্যাফার, ট্রলিবয় থেকে ভিডিও এডিটর, অনলাইন এডিটর, ইভেন্ট কো-অর্ডিনেটর, ইভেন্ট ম্যানেজার, চারুশিল্পী, কণ্ঠশিল্পী, অভিনয় শিল্পীসহ এই ইন্ডাস্ট্রি সম্পৃক্ত কয়েকশত লোকের কর্মসংস্থানের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ব্যবস্থা করেছে এই মানুষটি। তাই জুয়েল শুধু সফল শিল্পী, নির্মাতা কিংবা প্রযোজক হিসেবেই নয়, ওর প্রাসঙ্গিকতা বাংলাদেশের মিডিয়া ইন্ডাস্ট্রিতে বহুমুখি এবং কালোত্তীর্ণ।
ওর অনন্ত যাত্রার কয়েকমাস আগেও আমরা পরিকল্পনা করছিলাম সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নতুন কনসেপ্ট নিয়ে কাজ করার। কিন্তু দুভার্গ্যজনক হলেও সত্য, আমি হয়তো সে আইডিয়া নিয়ে আর কখনোই সামনে এগোতে পারব না। মহান আল্লাহ তায়ালা ওঁকে জান্নাতবাসী করুন।
(এই বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)








