ঈদ আসলেই শেকড়ের টানে স্বজন ও প্রিয়জনের সঙ্গে মিলনে যেন পথে-পথের এক বিন্দুতে নামেন লাখো মানুষ। পবিত্র ‘ঈদুল ফিতর’ উপলক্ষ্যে সেই পথে নামা জনগণের গন্তব্যের বিন্দুটি ক্রমশ বড় হতে থাকে। ক্রমশ বিশাল জনস্রোত কয়েক কিলোমিটার দীর্ঘ মিছিলের পথে পরিণত হয়।
১৭ মার্চ সরকারি ছুটির পরপরই সেই জনস্রোত বেড়ে ক্রমশ জনভোগান্তিতে পরিণত হয়েছে। ইতোমধ্যে দেশের উত্তরের জেলামুখী জনস্রোত ক্রমেই কয়েক মাইল দীর্ঘ যানজটে পরিণত হয়েছে। একইভাবে দক্ষিণের জেলামুখী জনস্রোত সড়ক পথ ছাড়িয়ে জলপথে লঞ্চমুখী যাত্রীদের দুর্ভোগ শেষ পর্যন্ত মৃত্যুতে গিয়েও ঠেকেছে।
এই বাস্তবতায় রাজধানী ছেড়ে যাওয়া মানুষেরা প্রিয় স্বজন, মা-বাবা আর শৈশবের স্মৃতিঘেরা আঙিনায় ফিরতে মুখিয়ে থাকা জনমানুষরা পথের ভোগান্তি, দীর্ঘ ক্ষেপণ সবই আনন্দের সাথেই মেনে নেন। তবে সব অপেক্ষার সুন্দর সমাপ্তি হয় না। বরং সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর কারণে অনেকের গন্তব্য থমকে যায়। স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন উঠে, বরাবরের মতো এবারও কি পথে-পথে ঈদ যাত্রীদের ভোগান্তি দীর্ঘ হবে? দুর্ঘটনা ও মৃত্যুর মিছিলে স্বজন হারানোর বেদনায় কত জনের ঈদ যাত্রা মলিন হবে?
সবমিলিয়ে নানান ভোগান্তি, সড়কে মৃত্যুর ঘটনায় পথে নামা লাখো মানুষের গন্তব্যের স্বপ্নেরা কি বাড়ি পৌঁছাবে? নাকি সড়কে স্বজন হারানোর বেদনায় নীল হয়ে যাবে? ২০১৬ সালে ভাইরাল হওয়া ওয়াহিদ হাবিবের সেই গানটি—“স্বপ্ন টানে দিলাম পাড়ি, অচিন পথে আপন ছাড়ি, প্রিয় মুখ আর স্মৃতির শাড়ি, এইতো সময় ফিরে আসার স্বপ্ন যাবে বাড়ি আমার”—সড়কে ঝরা প্রাণের ক্ষতে প্রাসঙ্গিক হবে।
ইতোমধ্যে সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রনালয়ের কাছে ‘নয় দফা’ নির্দেশনা দিয়েছে। নিরাপদ সড়ক চাই-এর সদ্য সাবেক মহাসচিব ও বর্তমান ভাইস চেয়ারম্যান এস এম আজাদ হোসেন বলছেন, “সড়কের দুর্ঘটনা ও ভোগান্তি কমাতে হলে অবশ্যই ফিটনেস বিহীন যানবাহন পথে নামানো যাবে না। ক্ষেত্রে হাইওয়ে পুলিশ ও সড়ক সংশ্লিষ্টদের জোর তদারকির পরামর্শ রয়েছে।
এর সঙ্গে নগরে চলাচলকারী স্বল্পপাল্লার যানবাহন যেন কোনোভাবেই দূরপাল্লার যাত্রী পরিবহন করতে না পারে, সেই বিষয়টি নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছে সংশ্লিষ্টরা। একইভাবে লঞ্চ ও ট্রেনের ছাদে যাত্রী পারাপার কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণে থাকা জরুরি।”
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রতিবছর প্রায় এক কোটি থেকে সোয়া কোটি মানুষ রাজধানী ছেড়ে যায় তাদের গন্তব্যে, নিজেদের প্রিয় প্রত্যন্ত গ্রামের ঠিকানায়। এর মধ্যে ৪০ শতাংশ মানুষ শ্রমজীবী, যারা গার্মেন্টস খাতে নিয়োজিত। নিরাপদ সড়ক চাই-এর পক্ষে—“এই বিপুল সংখ্যক মানুষদের নিজ গ্রামের গন্তব্যে ফেরার জন্য সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো ভাড়ার বিনিময়ে শুধুমাত্র মানসম্পন্ন যানবাহনে কর্মীদের নিজ অঞ্চলে যাওয়া-আসার রুটে পরিবহন সহযোগিতা করতে পারে। যা সড়কে দুর্ঘটনা কমিয়ে প্রাণহানি ও ভোগান্তি দুই কমাতে পারে।”
কারণ শ্রমজীবী গার্মেন্টসকর্মীরা স্বল্পমূল্যে নিজ গন্তব্যে পৌঁছাতে ফিটনেসবিহীন ও নগর পরিবহনের ব্যবহৃত স্বল্পপাল্লার যানবাহন নিজেরাই ভাড়া করে দূরপাল্লায় যাত্রা করেন। দূরপাল্লার হাইওয়েতে চলাচলের উপযুক্ত নয় সেই ফিটনেসবিহীন যানবাহনগুলোই সড়কে পথে-পথে অকেজো হয়ে অকাঙ্খিত যানজটের কারণ হয় এবং নানান দুর্ঘটনাও ঘটায়। এছাড়া যানবাহনগুলোর অসম প্রতিযোগিতায় নির্ধারিত গতির চেয়ে বেশি গতিতে যানবাহন চালানোয় সড়কে দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব হয় না।
তিনি বলছেন, পানি পথে লঞ্চ দুর্ঘটনা কমাতে অসদুপযুক্ত প্রতিযোগিতা বন্ধে ‘নৌ পুলিশী তৎপরতা’ বাড়াতে হবে। সময়মত লঞ্চে ঘাটে পৌঁছানোর ইতিবাচক সুবিধাগুলো জনসচেতনতার জন্য বেশি প্রচারও দরকার। কারণ লঞ্চ ছাড়ার পরে অনেক যাত্রী মাঝ নদী থেকে ছেড়ে যাওয়া লঞ্চে উঠতে ট্রলার ভাড়া করে এবং তখনই নানা দুর্ঘটনা ঘটে।
ইতোমধ্যে উত্তরের জেলামুখী সড়ক পথে সিরাজগঞ্জ জেলার সয়দাবাদ গোলচত্বর, মুলিবাড়ি চেকপোস্ট, কড্ডার মোড়, নলকা ও হাটিকুমরুল গোলচত্বর এলাকায় দেখা যায়, ঢাকা-বগুড়া, ঢাকা-রাজশাহী ও ঢাকা-রংপুর মহাসড়কে যানবাহনের সংখ্যা অতিরিক্ত বাড়ছে। তবে সড়কের শৃঙ্খলা বজায় রাখতে এবার অভিনব পদ্ধতি গ্রহণ করেছে সিরাজগঞ্জ জেলা পুলিশ।
প্রায় ১,২০০ পুলিশ সদস্যের পাশাপাশি আকাশে উড়ছে ড্রোন ক্যামেরা, যার মাধ্যমে সার্বক্ষণিক নজরদারি চালানো হচ্ছে পুরো সড়ক জুড়ে। গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে বিশেষ নজরদারি বসানো হয়েছে। ড্রোনের লাইভ ফুটেজ দেখে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে, যা যান চলাচল স্বাভাবিক রাখতে বড় ভূমিকা রাখছে।
তারপরও দুর্ঘটনা থেমে নেই। এক্ষেত্রে দুর্ঘটনার পর উদ্ধার তৎপরতায় অনেকটাই সময়ক্ষেপণ দেখা গেছে। বিভিন্ন দুর্ঘটনার পর দেখা গেছে আক্রান্তরা দুর্ঘটনার পরে থাকছেন, বাকিরা যে যার গন্তব্যে ছুটছেন। এই পরিস্থিতিতে অমানবিক পরিবেশকে নিয়ন্ত্রণে আনতে ডিএমপি কমিশনার মো. সরওয়ার জানিয়েছেন, ঢাকা মেট্রোপলিটন এলাকায় ৩’শত মত মোবাইল টিম কাজ করছে।
পুলিশি পেট্রোলিং ও চেকপোস্টগুলো তৎপর রয়েছে। দেশের বিভিন্ন হাইওয়েতে ‘হাইওয়ে পুলিশ’ ও ‘জেলা পুলিশ’ তৎপর। মূলত পুলিশ হেড কোয়ার্টার থেকে কোনো দুর্ঘটনার পরই দ্রুত ঘটনাস্থলে সংশ্লিষ্ট জেলা পুলিশের তদারকি টিম, ফায়ার সার্ভিস ও রেড ক্রিসেন্টের মত দ্রুত রেসপন্ড টিম পৌঁছানোর নির্দেশনা দেওয়া আছে। একই সঙ্গে আহতদের উদ্ধার করে দ্রুততম সময়ে অ্যাম্বুলেন্স কল করে চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়।
তবে ‘নিরাপদ সড়ক চাই’-এর ভাইস প্রেসিডেন্ট এস এম আজাদ হোসেন বলছেন, ১২ই মার্চ একসঙ্গে ১৩ জনের মৃত্যু স্মরণ করিয়ে দেয় এদেশে সড়কগুলো কতটা অনিরাপদ। তিনি বলেন, অতীতের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, ঈদের আগে যতটা দুর্ঘটনা ঘটে, ঈদ শেষে রাজধানীতে ফেরার ঢলে তখনো আরও বেশি দুর্ঘটনা ঘটে।
নিরাপদ সড়ক চাইসহ সড়কে নিরাপত্তা নিয়ে বিভিন্ন বেসরকারি সংগঠনের দাবীর মুখে বিভিন্ন সময়ে ‘ঈদের আগে-পরে’ অঞ্চল কেন্দ্রিক ‘রেসকিউ টিম’ বা ‘দ্রুত উদ্ধারকারী সহায়তা টিম’ গঠন করা হতো। এবারও এখনও পর্যন্ত ‘রেসকিউ টিম’ বা ‘দ্রুত উদ্ধারকারী সহায়তা টিম’-এর কার্যকর উপস্থিতি দেখা যায়নি। তিনি বলছেন, ঈদের আগে-পরে দুর্ঘটনার শিকার আহতদের দ্রুত চিকিৎসার আওতায় আনলে প্রাণহানি কমানো সম্ভব। এজন্য প্রতি ৩০ কিলোমিটার পরপর স্থানীয় ও অঞ্চলিক পর্যায়ের প্রতিনিধিদের নিয়ে ‘রেসকিউ টিম’ গঠন করার জন্য সরকারকে আহ্বান জানাচ্ছেন। সংশ্লিষ্টরা জোর পরামর্শ দিয়েছেন।








