ভোরে অ্যালার্ম বাজার আগেই ঘুম ভেঙে যায়। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের ধূসর হতে থাকা চুলগুলো দেখে দীর্ঘশ্বাস ফেলেন এক বেসরকারি চাকরিজীবী। হাতে ধরা বাজারের ফর্দটি মনে করিয়ে দেয় যে গত এক বছরে বেতন না বাড়লেও চাল, ডাল আর তেলের দামসহ নিত্যপণ্যের ব্যয় বেড়েছে কয়েক দফা।
এক সময় এই মানুষটি অবসরের পর নিজের একটি ফ্ল্যাট বা সন্তানের বিদেশে উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন দেখতেন। আজ সমস্ত চিন্তাজুড়ে কেবল মাস শেষে ঘরভাড়া আর বিদ্যুৎ বিল পরিশোধের গ্লানি এবং নানা খরচের হিসাব মেলানো। এই দৃশ্যটি আজকের বাংলাদেশের কোটি মধ্যবিত্তের জীবনের এক বাস্তবতা। এক সময়ের আকাশছোঁয়া স্বপ্নগুলো এখন ডানা মেলে ধরার বদলে কেবল টিকে থাকার লড়াইয়ে সংকুচিত হয়ে আসছে। এটি কেবল একটি নির্দিষ্ট ব্যক্তির গল্প নয় বরং বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক চাপে পিষ্ট একটি বৃহৎ জনগোষ্ঠীর যাপিত জীবনের চিত্র।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ২০২৪-২৫ অর্থবছরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী দেশে গড় মূল্যস্ফীতি টানা নবম মাসের মতো ৯ শতাংশের উপরে অবস্থান করছে। বিশেষ করে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ছাড়িয়েছে ১০ শতাংশের ঘর। মধ্যবিত্তের জন্য এই পরিসংখ্যান কেবল গাণিতিক সংখ্যা নয় বরং একটি যন্ত্রণাদায়ক জীবনধারা। অর্থনীতির ভাষায় মধ্যবিত্ত হলো একটি রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতার মেরুদণ্ড এবং প্রধান চালিকাশক্তি। কিন্তু যখন আয়ের চেয়ে ব্যয়ের পাল্লা ভারি হয় তখন সেই মেরুদণ্ড নুয়ে পড়তে শুরু করে। এক দশক আগে একজন মধ্যবিত্ত মানুষ সঞ্চয়কে প্রধান শক্তি মনে করত। অথচ বর্তমানে সঞ্চয় তো দূরের কথা জীবনযাত্রার মান ধরে রাখতে গিয়ে অনেককেই ক্রেডিট কার্ডের ঋণ কিংবা জমানো টাকা ভেঙে চলতে হচ্ছে। ফলে বড় কোনো বিনিয়োগ বা ভবিষ্যতের পরিকল্পনা করা এখন অনেকের কাছে বিলাসিতা মাত্র।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন মধ্যবিত্তের এই সঞ্চয়হীনতা দীর্ঘমেয়াদে জাতীয় বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। কারণ একটি দেশের অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগের বড় উৎস হলো এই শ্রেণির মানুষের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সঞ্চয়।
শিক্ষাব্যবস্থা ও স্বাস্থ্যসেবার আকাশছোঁয়া ব্যয় মধ্যবিত্তের স্বপ্ন ছোট হওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ। বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত শ্রেণি সবসময়ই সন্তানের শিক্ষার পেছনে সবচেয়ে বেশি বিনিয়োগ করে থাকে। কিন্তু বর্তমানে বেসরকারি স্কুল-কলেজের বেতন এবং উচ্চশিক্ষার খরচ মেটাতে গিয়ে অনেক পরিবারকে মৌলিক স্বাচ্ছন্দ্য বিসর্জন দিতে হচ্ছে। এর ওপর যদি পরিবারে কেউ জটিল রোগে অসুস্থ হয়ে পড়ে তবে সেই চিকিৎসা ব্যয় মেটাতে গিয়ে একটি পরিবার নিঃস্ব হয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে পড়ছে। সরকারি স্বাস্থ্যসেবার সীমাবদ্ধতার কারণে বেসরকারি হাসপাতালের ওপর এই অতিনির্ভরশীলতা মধ্যবিত্তের অর্জিত সম্পদকে গ্রাস করে নিচ্ছে। পরিসংখ্যান বলছে বাংলাদেশে মোট স্বাস্থ্য ব্যয়ের প্রায় ৭০ শতাংশই সাধারণ মানুষকে নিজের পকেট থেকে মেটাতে হয় যার বড় শিকার হচ্ছে এই মধ্যবিত্ত সমাজ। যখন একজন অভিভাবক দেখেন যে তার সারা জীবনের সঞ্চয় একটি সাধারণ অস্ত্রোপচারে শেষ হয়ে যাচ্ছে তখন তিনি ভবিষ্যৎ নিয়ে বড় স্বপ্ন দেখার সাহস হারিয়ে ফেলেন।
চাকরির বাজারে তীব্র প্রতিযোগিতা এবং সুযোগের সীমাবদ্ধতাও এই স্বপ্নকে সীমিত করছে। প্রতি বছর প্রায় ২০ লাখ মানুষ শ্রমবাজারে যুক্ত হলেও মানসম্মত কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে না। ফলে বাবা-মায়ের দেখা বড় স্বপ্নগুলো যখন সন্তানের দীর্ঘস্থায়ী বেকারত্বের কাছে হোঁচট খায় তখন পুরো পরিবারের মনোবল ভেঙে পড়ে। এই অনিশ্চয়তা থেকেই অনেকে এখন আর বড় স্বপ্ন দেখে না বরং একটি নিরাপদ চাকরির আশায় জীবনযাপনই তাদের মূল লক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। মেধার সঠিক মূল্যায়ন না হওয়া এবং নিয়োগ প্রক্রিয়ায় বিভিন্ন স্বচ্ছতার অভাব এই হতাশাকে আরও ঘনীভূত করছে। বেসরকারি খাতের অনেক প্রতিষ্ঠান অর্থনৈতিক মন্দার অজুহাতে কর্মী ছাঁটাই করছে অথবা বেতন বৃদ্ধি স্থগিত রাখছে। এটি মধ্যবিত্তের মনে এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক অস্থিরতা তৈরি করছে যা তাদের উদ্ভাবনী শক্তিকে বাধাগ্রস্ত করছে।
নগরায়ণের খরচও মধ্যবিত্তের পিঠ দেয়ালে ঠেকিয়ে দিয়েছে। ঢাকা বা চট্টগ্রামের মতো বড় শহরগুলোতে আয়ের প্রায় ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ চলে যাচ্ছে ঘরভাড়া মেটাতে। যাতায়াত খরচ গ্যাস ও বিদ্যুতের দামের দফায় দফায় বৃদ্ধি এই শ্রেণির বিনোদন ও সৃজনশীল কাজের সুযোগ কেড়ে নিয়েছে। আগে যে পরিবারটি বছরে অন্তত একবার ভ্রমণে যেত কিংবা সামাজিক অনুষ্ঠানে অংশ নিত এখন তারা সেই খরচ দিয়ে মাসের বাজার সওদা সারছে। স্বপ্ন যখন কেবল উদরপূর্তিতে সীমাবদ্ধ হয় তখন সেই সমাজ মানসিকভাবে স্থবির হয়ে পড়ে। জীবনযাত্রার মান ক্রমাগত কমে যাওয়া এই শ্রেণির মানুষের আত্মমর্যাদায় আঘাত হানছে যা সামাজিক অস্থিরতারও একটি কারণ হতে পারে। অনেক মধ্যবিত্ত মানুষ এখন সামাজিক অনুষ্ঠান এড়িয়ে চলেন কারণ উপহার কেনার সামর্থ্যও তাদের সংকুচিত হয়ে এসেছে। এই বিচ্ছিন্নতা সমাজকে আরও ব্যক্তিকেন্দ্রিক করে তুলছে।
অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও মেগা প্রকল্পের দৃশ্যমান উন্নয়ন বাংলাদেশে অভাবনীয়। কিন্তু অর্থনীতির মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত সাধারণ মানুষের জীবনমানের উন্নয়ন। যখন জিডিপি বাড়ে অথচ সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যায় তখন সেই উন্নয়ন সুষম হয় না। মধ্যবিত্ত সমাজ এখন এক ধরনের নীরব দারিদ্র্যের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এরা সাহায্যের জন্য হাত পাততে পারে না আবার বর্তমান জীবনযাত্রার ভার সইতেও পারছে না। এই অবস্থাকে সমাজবিজ্ঞানীরা একটি সংকটাপন্ন পরিস্থিতি হিসেবে অভিহিত করছেন। যদি এই বিশাল জনগোষ্ঠীকে অর্থনৈতিকভাবে সুরক্ষা দেওয়া না যায় তবে দেশের অভ্যন্তরীণ বাজার সংকুচিত হবে। কারণ মধ্যবিত্ত হলো ভোগ ও চাহিদার প্রধান জোগানদাতা। এরা খরচ কমিয়ে দিলে ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিল্পোৎপাদন ব্যাহত হতে পারে।
রাষ্ট্রকে বুঝতে হবে মধ্যবিত্তের এই সংকুচিত হয়ে আসা স্বপ্ন কেবল একটি শ্রেণির সমস্যা নয় বরং এটি সামগ্রিক উন্নয়নের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। যখন একটি রাষ্ট্রের সৃজনশীল ও শিক্ষিত শ্রেণিটি কেবল বেঁচে থাকার লড়াইয়ে ব্যস্ত থাকে তখন সেই দেশে উদ্ভাবন ও নেতৃত্বের বিকাশ থমকে যায়। বড় বড় অবকাঠামো উন্নয়ন দিয়ে প্রবৃদ্ধি মাপা গেলেও মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা ও জীবনমানের উন্নয়নই হলো আসল সমৃদ্ধি। অর্থনৈতিক অসমতা বৃদ্ধি পাওয়ায় মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তের মধ্যবর্তী দেওয়ালটি ক্রমেই পাতলা হয়ে আসছে যা একটি ভিন্নমুখী উন্নয়নের চিত্র ফুটিয়ে তুলছে।
সময় এসেছে এই নীরব পরিস্থিতিকে গুরুত্ব দেওয়ার। বাজার ব্যবস্থার তদারকি মানসম্মত সরকারি সেবার পরিধি বাড়ানো এবং মেধাভিত্তিক কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি না হলে এই স্বপ্নগুলো আরও ক্ষুদ্র হতে থাকবে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা কেবল কাগজ-কলমের কাজ নয় এটি সাধারণ মানুষের জীবন-মরণ সমস্যা। সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় মধ্যবিত্তকেও কোনোভাবে অন্তর্ভুক্ত করা যায় কিনা সেটি নিয়ে রাষ্ট্রকে ভাবতে হবে। বিশেষ করে গৃহঋণ সহজ করা এবং স্বাস্থ্য বীমার প্রসার ঘটানো গেলে এই শ্রেণিটি কিছুটা স্বস্তি পেতে পারে।
বাংলাদেশ যদি সত্যিই উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত হতে চায় তবে সবার আগে মধ্যবিত্তের ডানা মেলার পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। কারণ যে রাষ্ট্রের মধ্যবিত্ত শ্রেণি স্বপ্ন দেখতে ভয় পায় সেই রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ কখনোই টেকসই হতে পারে না। এই সংকট উত্তরণে প্রয়োজন সুদূরপ্রসারী নীতি এবং সাধারণ মানুষের জীবনের বাস্তবতার সাথে রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনার সমন্বয়। আগামীর পথে মধ্যবিত্ত যেন কেবল টিকে থাকার লড়াই না করে বরং জাতীয় উন্নয়নে সক্রিয় অংশীদার হতে পারে সেই নিশ্চয়তা প্রদান করাই এখন সময়ের দাবি।
(এই বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)








