বাংলাদেশে জ্বালানি তেলের মজুত পরিস্থিতি ক্রমশ উদ্বেগজনক রূপ নিচ্ছে। পরিবহন, কৃষি ও বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত ডিজেলের মজুত নেমে এসেছে মাত্র ১৪ দিনের চাহিদার সমপরিমাণে।
সরকারি হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে ১ লাখ ৮৫ হাজার টন সরবরাহযোগ্য ডিজেল মজুত রয়েছে, যা মোট সক্ষমতার এক-তৃতীয়াংশের চেয়েও কম। এছাড়া অন্যান্য প্রধান জ্বালানির মধ্যে অকটেন ৯ দিন এবং পেট্রল প্রায় ১১ দিন চলার মতো রয়েছে। তবে ফার্নেস অয়েল, জেট ফুয়েল, কেরোসিন এবং মেরিন ফুয়েলের মজুত তুলনামূলকভাবে নিরাপদ অবস্থানে আছে, যা দিয়ে অন্তত তিন থেকে ছয় সপ্তাহ পর্যন্ত চাহিদা মেটানো সম্ভব।
দেশের একমাত্র শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারিতে মজুত থাকা ৮০ হাজার টন অপরিশোধিত তেল দিয়ে বর্তমান উৎপাদন হারে আরও ১৭ থেকে ১৮ দিন কার্যক্রম অব্যাহত রাখা যাবে।
জ্বালানি বিশ্লেষকদের মতে, স্বাভাবিক আমদানি পরিস্থিতিতে এই মজুত ব্যবস্থাপনা পর্যাপ্ত হলেও বর্তমানে একটি ত্রিবিধ সংকট তৈরি হয়েছে।
আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা, পণ্যবাহী জাহাজ পৌঁছাতে বিলম্ব এবং ভোক্তাদের মাঝে আতঙ্কজনিত বাড়তি চাহিদার কারণে সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের ঝুঁকি দেখা দিয়েছে। সময়মতো নতুন চালান এসে না পৌঁছালে দেশজুড়ে উৎপাদন ও সরবরাহ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা
বাংলাদেশের জ্বালানি বিশ্লেষকরা আন্তর্জাতিক বাজারে যে অস্থিরতা এবং সরবরাহ চেইনে বিলম্বের কথা উল্লেখ করছেন, তার মূল কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত। হরমুজ প্রণালিতে ইরানের অবরোধের কারণে বিশ্বজুড়ে তেল ও গ্যাস সরবরাহ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। উদ্ভূত অর্থনৈতিক সংকট এড়াতে বিশ্বের অনেক দেশই এখন তাদের কৌশলগত তেলের মজুত ব্যবহার করতে শুরু করেছে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যে সংঘাত শুরু হওয়ার পর তেহরান হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল বন্ধ করে দেয়। উল্লেখ্য, বিশ্বের মোট তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) ২০ শতাংশ এই প্রণালি দিয়েই পরিবাহিত হয় এবং উপসাগরীয় অঞ্চলের তেল ও গ্যাস উৎপাদনকারীদের জন্য খোলা মহাসাগরে পৌঁছানোর এটিই একমাত্র জলপথ। যুদ্ধের আগে যেখানে ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম ছিল ব্যারেলপ্রতি প্রায় ৬৫ ডলার, গত সপ্তাহে তা ১০০ ডলার ছাড়িয়ে গেছে।
ট্রাম্প প্রশাসন এই প্রণালি পুনরায় খোলার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছে। প্রথমে তারা পশ্চিমা দেশগুলোকে এই প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে নিরাপত্তা দিতে যুদ্ধজাহাজ পাঠানোর আহ্বান জানায়, কিন্তু সব দেশই এই প্রস্তাবে সাড়া দিতে অনাগ্রহ দেখায়।
রোববার (২২ মার্চ) মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানকে হরমুজ প্রণালি খুলে দিতে ৪৮ ঘণ্টার আলটিমেটাম দেন, অন্যথায় ইরানের বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে মার্কিন হামলার হুমকি দেওয়া হয়। জবাবে ইরান জানায়, যুক্তরাষ্ট্র হামলা চালালে তারা ইসরায়েলের বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে বিদ্যুৎ সরবরাহকারী আঞ্চলিক কেন্দ্রগুলোতে পাল্টা আঘাত হানবে।
সোমবার (২৩ মার্চ) ইরান আরও সতর্ক করে জানায়, তাদের জ্বালানি অবকাঠামোতে মার্কিন হামলা অব্যাহত থাকলে তারা হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি বন্ধ করে দেবে।
গত তিন সপ্তাহে উপসাগরীয় অঞ্চলজুড়ে জ্বালানি অবকাঠামোতে ইরানি হামলার পর সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ইরাক এবং কুয়েত তাদের তেল উৎপাদন কমিয়ে দিয়েছে, যা বিশ্বব্যাপী তেল ও গ্যাস সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে। সোমবার ট্রাম্প তাঁর হরমুজ আলটিমেটাম থেকে কিছুটা পিছু হটেছেন বলে প্রতীয়মান হচ্ছে; তিনি ইরানে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে মার্কিন হামলা পাঁচ দিনের জন্য স্থগিত করার নির্দেশ দেন এবং দাবি করেন যে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ইরানের আলোচনা চলছে, যদিও ইরান এই দাবি অস্বীকার করেছে।
এই বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির মধ্যে ১১ মার্চ ইন্টারন্যাশনাল এনার্জি এজেন্সির (আইইএ) ৩২টি সদস্য দেশ তাদের কৌশলগত জরুরি মজুত থেকে ৪০ কোটি (৪০০ মিলিয়ন) ব্যারেল তেল বাজারে ছাড়ার বিষয়ে সম্মত হয়েছে, যা এই সংস্থার ইতিহাসে সবচেয়ে বড় মজুত ছাড়ের ঘটনা।
কৌশলগত তেলের মজুত কী?
কৌশলগত তেলের মজুত বা স্ট্র্যাটেজিক পেট্রোলিয়াম রিজার্ভ (এসপিআর) হলো অপরিশোধিত তেলের এমন একটি জরুরি ভান্ডার, যা কোনো দেশের সরকার রাষ্ট্রীয় স্থাপনায় সংরক্ষণ করে। যুদ্ধ এবং অর্থনৈতিক সংকটের মতো জরুরি পরিস্থিতিতে এই তেলের মজুত ব্যবহার করা যায়। মজুত পূর্ণ রাখার জন্য সরকারগুলো সাধারণত বেসরকারি কোম্পানিগুলোর সাথে চুক্তির মাধ্যমে এই তেল কিনে থাকে।
আইইএ-র তথ্যমতে, বর্তমানে এর সদস্য দেশগুলোর কাছে ১২০ কোটি (১.২ বিলিয়ন) ব্যারেলের বেশি সরকারি জরুরি মজুত রয়েছে। এর পাশাপাশি, সরকারের নির্দেশনায় জরুরি প্রয়োজন মেটানোর জন্য বেসরকারি সংস্থাগুলোর কাছে আরও ৬০ কোটি (৬০০ মিলিয়ন) ব্যারেল শিল্পের মজুত সংরক্ষিত রয়েছে। আইইএ-র সদস্য নয় এমন কিছু দেশ, যেমন চীনের কাছেও এ ধরনের বিশাল মজুত রয়েছে।
বিশ্বজুড়ে কার কত মজুত?
চীন: আইইএ-র সদস্য না হলেও বিশ্বের বৃহত্তম কৌশলগত তেলের মজুত চীনের হাতেই রয়েছে। বিশ্বজুড়ে জ্বালানির দামের ওঠানামা চীনের অভ্যন্তরীণ বাজারে যে প্রভাব ফেলে, তা প্রশমিত করতে বেইজিং ২০০৪ সালে একটি রাষ্ট্রীয় কৌশলগত তেল মজুত কর্মসূচি শুরু করে। চীন আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের অপরিশোধিত তেলের মজুত সম্পর্কে তথ্য গোপন রাখলেও, জ্বালানি বিশ্লেষক প্রতিষ্ঠান ভরটেক্সার মতে, ২০২৫ সালের শেষে চীনের স্থলভাগের অপরিশোধিত তেলের মজুত রেকর্ড ১১৩ কোটি (১.১৩ বিলিয়ন) ব্যারেলে পৌঁছায়।
কেপলারের তথ্যমতে, ২০২৫ সালে ইরান থেকে জাহাজে করে রপ্তানি করা তেলের ৮০ শতাংশেরও বেশি কিনেছিল চীন। ইরানে যুদ্ধ তীব্রতর হওয়ার প্রেক্ষাপটে সিনোপেকের মতো চীনা শোধনাগার কোম্পানিগুলো দেশটির কৌশলগত মজুত থেকে তেল ব্যবহারের অনুমতির জন্য চাপ দিচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্র: আইইএ সদস্যদের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে অন্যতম বৃহত্তম কৌশলগত তেলের মজুত রয়েছে, যার পরিমাণ ৪১ কোটি ৫০ লাখ (৪১৫ মিলিয়ন) ব্যারেল। যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি বিভাগ নিশ্চিত করেছে যে, চলতি বছর এই মজুত থেকে ১৭ কোটি ২০ লাখ (১৭২ মিলিয়ন) ব্যারেল তেল বাজারে ছাড়া হবে। এই মজুতগুলো যুক্তরাষ্ট্রের বড় শোধনাগার বা পেট্রোকেমিক্যাল কেন্দ্রগুলোর কাছাকাছি অবস্থিত এবং এখান থেকে প্রতিদিন সর্বোচ্চ ৪৪ লাখ ব্যারেল তেল বিশ্বজুড়ে সরবরাহ করা সম্ভব।
জাপান: আইইএ সদস্য জাপানের কাছেও রয়েছে বিশাল মজুত। নিক্কেই এশিয়ার তথ্যমতে, ২০২৫ সালের শেষে দেশটির কাছে প্রায় ৪৭ কোটি (৪৭০ মিলিয়ন) ব্যারেল জরুরি মজুত ছিল, যা দিয়ে ২৫৪ দিনের অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটানো সম্ভব। ১৬ মার্চ জাপান তাদের জরুরি মজুত থেকে তেল ছাড়তে শুরু করার ঘোষণা দেয় এবং প্রধানমন্ত্রী সানাই তাকাইচি জানান যে, তাঁরা একতরফাভাবে মজুত থেকে ৮ কোটি ব্যারেল তেল ছাড়বেন।
যুক্তরাজ্য ও ইউরোপ: যুক্তরাজ্যের জ্বালানি নিরাপত্তা বিভাগের তথ্যমতে, ২৬ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত তাদের কাছে কৌশলগত মজুত হিসেবে প্রায় ৩ কোটি ৮০ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল এবং ৩ কোটি ব্যারেল পরিশোধিত পণ্য রয়েছে, যা দিয়ে প্রায় ৯০ দিনের চাহিদা মেটানো সম্ভব।
চলমান সংকটে তারা ১ কোটি ৩৫ লাখ ব্যারেল তেল বাজারে ছাড়বে। এছাড়া জার্মানির কাছে ১১ কোটি ব্যারেল, ফ্রান্সের মজুতে প্রায় ১২ কোটি ব্যারেল এবং স্পেনের কাছে প্রায় ১৫ কোটি ব্যারেল অপরিশোধিত তেলের মজুত রয়েছে। ইতালির কাছে রয়েছে প্রায় ৭ কোটি ৬০ লাখ ব্যারেল মজুত।
বাংলাদেশের শঙ্কা ও সম্ভাবনা
মধ্যপ্রাচ্যের এই ভূরাজনৈতিক সংঘাত এবং পরাশক্তিগুলোর জ্বালানি যুদ্ধের সরাসরি কোনো অংশীদার না হলেও, এর সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগীদের একটি হতে যাচ্ছে বাংলাদেশ।
মাত্র ১৪ দিনের ডিজেল মজুত নিয়ে এই বৈশ্বিক সংকট মোকাবিলার চেষ্টা ঢাকার জন্য এক ভয়াবহ অশনিসংকেতের মতো; যা যেকোনো মুহূর্তে দেশের পরিবহন, কৃষি ও উৎপাদন খাতকে স্থবির করে দিতে পারে। তবে মুদ্রার উল্টো পিঠে, প্রতিটি চরম সংকটই একটি নতুন সম্ভাবনার জন্ম দেয়।
বিশ্লেষকদের মতে, এই দমবন্ধ পরিস্থিতি বাংলাদেশের সামনে একটি কঠোর বার্তাই দিচ্ছে: পরনির্ভরশীল জীবাশ্ম জ্বালানির মোহ চিরতরে ত্যাগ করে দ্রুত নবায়নযোগ্য শক্তির দিকে হাঁটার এবং নিজস্ব সামুদ্রিক গ্যাস অনুসন্ধানে সর্বশক্তি নিয়োগ করার এখনই সবচেয়ে উপযুক্ত সময়।
আন্তর্জাতিক এই জ্বালানি-দাবার বোর্ডে বাংলাদেশ হয়তো কেবলই এক অসহায় সৈন্য, কিন্তু নিজেদের জ্বালানি নিরাপত্তার নিজস্ব ঢাল তৈরি করতে না পারলে, এই দর্শককেই শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে চড়া মূল্য চোকাতে হবে।








