কোথায় কতটুকু সাফল্য অর্জন করতে পেরেছি, কোথায় ব্যর্থ হয়েছি—সে বিচারের ভার আপনাদের ওপর থাকল। বিদায় ভাষণে এভাবেই দেশের জনগণের কাছে নিজের সরকারের মূল্যায়নের দায়িত্ব তুলে দিলেন প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস।
সোমবার ১৬ ফেব্রুয়ারি রাতে জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে তিনি দেশের ক্রান্তিলগ্নে দায়িত্ব নেওয়ার প্রেক্ষাপট স্মরণ করেন এবং অন্তর্বর্তী সরকারের নেয়া সংস্কার, বিচার ও নির্বাচন কার্যক্রমের কথা তুলে ধরেন। মঙ্গলবার বিকালে জাতীয় সংসদ ভবনের দাক্ষিণ প্লাজায় নতুন সরকারের মন্ত্রিসভার শপথের মধ্য দিয়ে তার প্রায় দেড় বছরের দায়িত্বের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটবে।
প্রধান উপদেষ্টা বলেন, দল-মত, ধর্ম-বর্ণ, নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সবাইকে একটি ন্যায়ভিত্তিক, মানবিক ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ে তোলার সংগ্রাম অব্যাহত রাখতে হবে। গত ১৮ মাসে দেশে গণতান্ত্রিক চর্চা, বাক-স্বাধীনতা ও জবাবদিহিতার সংস্কৃতি পুনরুজ্জীবিত হয়েছে বলেও তিনি দাবি করেন। তার ভাষায়, উৎসবমুখর পরিবেশে নির্বাচন আয়োজনের মাধ্যমে জনগণের ভোটাধিকার নিশ্চিত হয়েছে। এই ধারা যেন কোনোভাবেই হাতছাড়া না হয়।
অন্তর্বর্তী সরকারের তত্ত্বাবধানে গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে তিনি ভবিষ্যতের জন্য একটি ‘উৎকৃষ্ট উদাহরণ’ হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, হার-জিতই গণতন্ত্রের সৌন্দর্য। এই নির্বাচনে জয়ী হয়ে সরকার গঠন করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ-এর টানা ১৫ বছরের শাসনের অবসানের পর ২০২৪ সালের ৮ আগস্ট ছাত্রনেতাদের আমন্ত্রণে অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব নেন ইউনূস।
‘সংস্কার, বিচার ও নির্বাচন’ বিষয়ে তিনি বলেন, দায়িত্ব নেওয়ার সময় দেশ গভীর রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সংকটে ছিল। রাষ্ট্রযন্ত্রের ওপর মানুষের আস্থা নষ্ট হয়েছিল। সেই প্রেক্ষাপটে তাকে তিনটি দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল—সংস্কার, বিচার ও নির্বাচন। তার দাবি, অন্তর্বর্তী সরকার প্রায় ১৩০টি নতুন আইন ও সংশোধনী প্রণয়ন এবং প্রায় ৬০০টি নির্বাহী আদেশ জারি করেছে, যার অধিকাংশই বাস্তবায়িত হয়েছে। মানবতাবিরোধী অপরাধ, দুর্নীতি ও অনিয়মের বিচার প্রক্রিয়া রাজনীতি ও প্রতিশোধের ঊর্ধ্বে রাখার চেষ্টা করা হয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা জোরদার করতে পৃথক সচিবালয় গঠন, বিচারক নিয়োগে স্বচ্ছ কাঠামো প্রণয়ন এবং মানবাধিকার সুরক্ষায় নতুন উদ্যোগ নেওয়ার কথাও তুলে ধরেন তিনি।
‘নতুন বাংলাদেশের জন্ম’ প্রসজ্ঞে ইউনূস বলেন, এবারের নির্বাচন কেবল ক্ষমতা হস্তান্তর নয়; এটি বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার নতুন অভিযাত্রার সূচনা। জুলাইয়ের অভ্যুত্থানে শহীদ ও আহতদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে তিনি বলেন, তাদের ত্যাগ ছাড়া এই পরিবর্তন সম্ভব হতো না। বিদায়বেলায় তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন, বাংলাদেশের জনগণ ও রাজনৈতিক শক্তিগুলো ঐক্যের মাধ্যমে গণতন্ত্রের এই ধারা রক্ষা ও সমৃদ্ধ করবে।








