ইরানের দুই শক্তিশালী কূটনৈতিক মিত্র রাশিয়া ও চীন। তেহরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের চাপিয়ে দেওয়া এ যুদ্ধকে আন্তর্জাতিক আইনের চরম লঙ্ঘন বলে অভিহিত করেছে দেশ দুটি। চলমান এ যুদ্ধে এখন পর্যন্ত এক হাজারের বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন।
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির হত্যাকাণ্ডের ঘটনাকে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ‘মানবিক নৈতিকতার সব নিয়মকানুনের নিষ্ঠুর লঙ্ঘন’ বলে বর্ণনা করেছেন।
চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই ইসরায়েলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী গিডন সারের সঙ্গে আলাপকালে বলেছেন, শক্তি দিয়ে কখনোই সমস্যার প্রকৃত সমাধান সম্ভব নয়। একই সঙ্গে তিনি সব পক্ষকে উত্তেজনা পরিহার করার আহ্বান জানিয়েছেন।
রাশিয়া ও চীন যৌথভাবে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের জরুরি বৈঠকের আবেদনও জানিয়েছে।
রাশিয়া-ইরান: কৌশলগত অংশীদার, সামরিক মিত্র নয়
২০২৫ সালের জানুয়ারিতে রাশিয়া ও ইরান একটি ব্যাপকভিত্তিক ‘কৌশলগত অংশীদারত্ব চুক্তি’ স্বাক্ষর করেছে। এর আওতায় বাণিজ্য ও সামরিক সহযোগিতা থেকে শুরু করে বিজ্ঞান, সংস্কৃতি ও শিক্ষা পর্যন্ত নানা বিষয় অন্তর্ভুক্ত ছিল।
এই চুক্তির ফলে দেশ দুটির মধ্যে প্রতিরক্ষা ও গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান আরও গভীর হয়। পাশাপাশি ইরানের ভেতর দিয়ে রাশিয়াকে উপসাগরীয় অঞ্চলের সঙ্গে যুক্ত করতে পরিবহন করিডর নির্মাণের মতো প্রকল্প গুরুত্ব পায়।
এসব প্রতিক্রিয়া মূলত ইরান, রাশিয়া ও চীনের মধ্যকার ঘনিষ্ঠ সম্পর্কেরই প্রতিফলন। মস্কো ও বেইজিং ইতিমধ্যে দ্বিপক্ষীয় চুক্তি স্বাক্ষর করেছে এবং যৌথ নৌ মহড়ার মাধ্যমে নিজেদের মধ্যে সমন্বয় বাড়িয়েছে। এর মাধ্যমে তারা মূলত যুক্তরাষ্ট্র-নিয়ন্ত্রিত বিশ্বব্যবস্থার বিরুদ্ধে একজোট থাকার বার্তাই দিতে চেয়েছে, যারা দীর্ঘকাল ধরে এই দেশগুলোকে একঘরে করে রাখার চেষ্টা করছে।
তবে রাশিয়া ও চীন কড়া ভাষায় নিন্দা জানালেও কোনো দেশই এখন পর্যন্ত ইরানের পক্ষে সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপ করার কোনো ইঙ্গিত দেয়নি। এমনকি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে হামলা চালানোর মাত্র এক সপ্তাহ আগে গত ফেব্রুয়ারির শেষের দিকেও ভারত মহাসাগরে যৌথ সামরিক মহড়া চালিয়েছে এই দুই দেশ।
তবে ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের আগ্রাসন শুরুর পর মস্কোর জন্য সরাসরি কোনো সামরিক পদক্ষেপে যাওয়ার আইনি বাধ্যবাধকতা ছিল না। কারণ, সেই চুক্তিতে কোনো ‘পারস্পরিক প্রতিরক্ষা ধারা’ বা যুদ্ধের সময় পাশে দাঁড়ানোর শর্ত অন্তর্ভুক্ত ছিল না, অর্থাৎ এটি কোনো আনুষ্ঠানিক সামরিক জোট ছিল না।
রাশিয়ার চিন্তক প্রতিষ্ঠান ‘ভালদাই ডিসকাশন ক্লাব’-এর সদস্য আন্দ্রেই কর্তুনভ মস্কো থেকে ভিডিও কলে আল-জাজিরাকে বলেন, ২০২৪ সালে উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে রাশিয়ার করা প্রতিরক্ষা চুক্তিটি ছিল অনেক বেশি শক্তিশালী।
কর্তুনভ বলেন, ওই চুক্তির আওতায় উত্তর কোরিয়া কোনো যুদ্ধে জড়ালে রাশিয়া তাদের সহায়তা করতে বাধ্য। কিন্তু ইরানের ক্ষেত্রে চুক্তিতে কেবল বলা হয়েছে, এক পক্ষ যুদ্ধে জড়ালে অন্য পক্ষ কোনো শত্রুতামূলক কাজ থেকে বিরত থাকবে।
কর্তুনভ মনে করেন, রাশিয়া ইরানের হয়ে সরাসরি যুদ্ধে নামার ঝুঁকি নেবে না। কারণ হিসেবে তিনি জানান, মস্কো এখন ইউক্রেন সংকট সমাধানে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতাকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। এর আগে গত জানুয়ারিতে ভেনেজুয়েলায় মার্কিন হামলার পরও রাশিয়া কেবল নিন্দাই জানিয়েছিল, সরাসরি কোনো পদক্ষেপ নেয়নি।
যদিও চুক্তিতে রাশিয়ার হস্তক্ষেপের কোনো বাধ্যবাধকতা নেই, তবু তেহরানের নীতিনির্ধারকদের মধ্যে এ নিয়ে কিছুটা হতাশা দেখা গেছে।
কর্তুনভ বলেন, তেহরান আশা করেছিল, জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে কূটনৈতিক তৎপরতার বাইরেও রাশিয়া হয়তো কার্যকর আরও কিছু করবে।
চীন-ইরান সম্পর্কে সীমাবদ্ধতা
২০২১ সালে চীন ও ইরান ২৫ বছর মেয়াদি একটি সহযোগিতা চুক্তি সই করে। এর লক্ষ্য ছিল জ্বালানি খাতে সম্পর্ক বৃদ্ধি করা ও ইরানকে চীনের ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড’ প্রকল্পের অন্তর্ভুক্ত করা।
চীনের সিনহুয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল সিকিউরিটি অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজির (সিআইএসএস) ফেলো জোডি ওয়েন আল-জাজিরাকে বলেন, বেইজিং এই সম্পর্ককে অত্যন্ত বাস্তবসম্মত ও স্থিতিশীল হিসেবে দেখে।
বেইজিং থেকে ফোনে ওয়েন বলেন, ‘রাজনৈতিকভাবে আমাদের মধ্যে নিয়মিত যোগাযোগ রয়েছে এবং অর্থনৈতিকভাবেও সহযোগিতা অনেক গভীর। চীনের অনেক প্রতিষ্ঠান ইরানে বিনিয়োগ করেছে।’
তবে ওয়েন জোর দিয়ে বলেন, বেইজিং এই অংশীদারত্বের ক্ষেত্রে, বিশেষ করে সামরিক হস্তক্ষেপের বিষয়ে একটি পরিষ্কার সীমারেখা টেনে রেখেছে।
জোডি ওয়েন বলেন, ‘চীন সরকার সব সময়ই অন্যের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার নীতি মেনে চলে। আমার মনে হয় না, চীন ইরানে কোনো অস্ত্র পাঠাবে।’
এর বদলে বেইজিং মূলত কূটনীতি ও সংকট নিরসনেই মনোযোগী থাকবে। তিনি মনে করেন, পরিস্থিতি শান্ত রাখতে যুক্তরাষ্ট্র ও উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে আলোচনার চেষ্টা করছে চীন।
তবে এই ফেলো এ–ও উল্লেখ করেন, এই সম্পর্ক ভারসাম্যপূর্ণ নয়। তথ্য অনুযায়ী, ইরানের বার্ষিক অপরিশোধিত তেল রপ্তানির প্রায় ৮৭ দশমিক ২ শতাংশই যায় চীনে। এটি তেহরানের জন্য চীনকে অর্থনৈতিকভাবে কতটা গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে, তা স্পষ্ট করে দেয়। অথচ চীনের বিশ্ববাণিজ্যের তুলনায় ইরান তাদের ক্ষুদ্র এক অংশীদার মাত্র।
সিঙ্গাপুরের নানিয়াং টেকনোলজিক্যাল ইউনিভার্সিটির সহযোগী অধ্যাপক ডিলান লোহ আল-জাজিরাকে বলেন, ইরানের বিষয়ে চীনের ভূমিকা এখন অনেকটা ‘সুরক্ষামূলক’ হয়ে উঠেছে। চীন চাইছে দ্রুত মধ্যস্থতার মাধ্যমে আঞ্চলিক বিপর্যয় এড়াতে, যা তাদের নিজেদের অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা স্বার্থ রক্ষা করবে।
লোহ বলেন, রাজনৈতিক ঝুঁকি কীভাবে কমানো যায় এবং হাতে কী কী বিকল্প আছে, তা নিয়ে নতুন করে ভাবা শুরু হয়েছে। সত্যি বলতে, ভেনেজুয়েলায় মার্কিন হামলার পর থেকেই বেইজিং এই পুনর্মূল্যায়ন শুরু করেছিল।







