জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে বিভিন্ন মহলে উদ্বেগ থাকলেও সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থা ও নির্বাচন কমিশন আশাবাদী, নির্বাচনের পরিবেশ শান্তিপূর্ণ রাখা সম্ভব হবে।
সম্প্রতি নির্বাচনের প্রস্তুতি বিষয়ে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর এক পর্যালোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়।
ইতোমধ্যে পুলিশ সদস্যদের জন্য বাড়তি সরঞ্জাম, বডিক্যাম এবং আধুনিক অস্ত্র সরবরাহের সিদ্ধান্ত হয়েছে। পাশাপাশি নির্বাচনকালীন যেকোনো সহিংসতা প্রতিরোধে মাঠ পর্যায়ে জোরদার করা হয়েছে গোয়েন্দা নজরদারি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্তমানে দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নির্বাচন আয়োজনের জন্য অনুকূল। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় আছে। তবে যে কোনো অন্যায় দেখলে জনগণকে তা প্রতিহত করতে আহ্বান জানিয়েছেন তারা।
ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে প্রস্তুতি নিতে নির্দেশ দিয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। নির্বাচনের আগে সব আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের সমন্বয়ে অন্তত দুটি মহড়া দিতে বলা হয়েছে। একটি মহড়া হবে সেপ্টেম্বরে, অন্যটি নির্বাচনের ঠিক আগে।
নির্বাচন কমিশন বলছে, নির্বাচনের একটি পূর্ণাঙ্গ রোডম্যাপ চূড়ান্ত করা হচ্ছে। আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে খুব বেশি উদ্বেগজনক মনে করছি না। তবে নিরাপত্তা জোরদারে সব বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় চলছে।
সারা দেশের বিভিন্ন থানা ও ফাঁড়ি থেকে লুট হওয়া ১ হাজার ৪০৫টি ভয়ানক অস্ত্র এখনো উদ্ধার হয়নি। এর মধ্যে গণভবন থেকে স্পেশাল সিকিউরিটি ফোর্সের (এসএসএফ) লুট হওয়া ৩২টি অস্ত্রও রয়েছে। এ ছাড়া সরকারি হিসাবে লুট হওয়া ২৪ শতাংশ অস্ত্রের হদিস এখনো পাওয়া যায়নি, যার পরিমাণ ১ হাজার ৩৭৩টি। পাশাপাশি প্রায় আড়াই লাখ গোলাবারুদ ও সব মিলিয়ে সন্ত্রাসীদের হাতে রয়ে গেছে অনেক অস্ত্র। যা নির্বাচনের জন্য বড় ঝুঁকি হয়ে দাঁড়াতে পারে।
গত বছরের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের পতন পর সারাদেশে ৪৬২ টি থানায় হামলা হয়। এসব থানা থেকে লুট হয় পুলিশের অনেক অস্ত্র ও গুলি। ড. মুহাম্মদ ইউনুসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের পর লুন্ঠিত অস্ত্র ও গুলি উদ্ধারে উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। অপারেশন ডেভিল হান্ট, বিশেষ অভিযান, চিরুনি অভিযানসহ বিভিন্ন উদ্যোগের পরও এসএসএফ-এর ৩২টি অত্যাধুনিক অস্ত্রসহ লুন্ঠিত ১ হাজার ৩৬৩টি অস্ত্র ও প্রায় আড়াই লাখ গোলাবারুদ এখনো উদ্ধার হয়নি।

স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী জানান, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর আনুমানিক ৭০০ অস্ত্র উদ্ধার এখনো বাকি রয়েছে। এসব অস্ত্র উদ্ধার করতে বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। দ্রুত এ সংক্রান্ত একটি কমিটি গঠন করা হবে। যারা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হারানো অস্ত্রের সন্ধান দিতে পারবে, তাদেরকে পুরস্কৃত করা হবে।
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য মতে, ওই সময়ে পুলিশের কাছ থেকে লুট হয় ৫ হাজার ৭৫৩টি অস্ত্র। এর মধ্যে উদ্ধার হয়েছে ৪ হাজার ৩৯০টি অস্ত্র। ৬ লাখ ৫১ হাজার ৮৩২ রাউন্ড গুলি লুট হয়। পরে ৩ লাখ ৯৪ হাজার ১১২ রাউন্ড উদ্ধার হয়েছে। লুট হওয়া অস্ত্র ও গোলাবারুদের মধ্যে ছিল বিভিন্ন ধরনের রাইফেল, এসএমজি, এলএমজি, পিস্তল, শটগান, গ্যাসগান, কাঁদানে গ্যাস লঞ্চার, কাঁদানে গ্যাসের শেল, কাঁদানে গ্যাসের স্প্রে, সাউন্ড গ্রেনেড ও বিভিন্ন ধরনের গুলি।
লুট হওয়া এসব অস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধারে গত বছরের ৪ সেপ্টেম্বর শুরু হয় যৌথ অভিযান। এ পর্যন্ত ৭৬ শতাংশ অস্ত্র এবং ৬০ শতাংশ গোলাবারুদ উদ্ধার হয়েছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (গণমাধ্যম ও জনসংযোগ) এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন বলেন, আমরা নিয়মিত অভিযান চালাচ্ছি। পুলিশের লুট হওয়া বেশিরভাগ অস্ত্র, গোলাবারুদ এরই মধ্যে উদ্ধার হয়েছে। নিয়মিত অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার হচ্ছে। এর মধ্যে অনেক অস্ত্রধারী গ্রেপ্তার হয়েছে। বাকিদের আইনের আওতায় আনতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সচেষ্ট রয়েছে।
আইন-শৃঙ্খলার বর্তমান পরিস্থিতিতে নির্বাচন সম্ভব
দেশে বর্তমানে আইন-শৃঙ্খলার যে পরিস্থিতি বিরাজ করছে, সেই পরিস্থিতিতে আগামী নির্বাচন করা সম্ভব বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী। তিনি বলেছেন, ভোট সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ করতে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর পাশাপাশি সব দলকেও সহযোগিতা করতে হবে।
তিনি বলেন, নির্বাচন উপলক্ষে পুলিশ সদস্যদের শরীরে থাকা ৪০ হাজার বডিক্যামেরা সেন্টার থেকে মনিটর করা হবে। সেই সঙ্গে অতিরিক্ত পুলিশ, আনসার মোতায়েনসহ ৮০ হাজার সেনাবাহিনী ও বিজিবি সদস্য থাকবে।
যে কোনো অন্যায় দেখলে জনগণকে তা প্রতিহত করতে আহ্বান জানান তিনি।
অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনে প্রস্তুত সেনাবাহিনী
সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান বলেছেন, ‘এখন নির্বাচনের দিকে যাচ্ছে দেশ। অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানে সরকারকে সহযোগিতা করার জন্য সেনাবাহিনী সব ধরনের প্রস্তুতি নিয়েছে।

গত মঙ্গলবার সকালে ঢাকা সেনানিবাসে ‘অফিসার্স অ্যাড্রেস’ অনুষ্ঠানে সেনাসদস্যদের উদ্দেশে দেওয়া বক্তব্যে সেনাপ্রধান বলেন, দীর্ঘ সময় ধরে সেনারা মাঠে দায়িত্ব পালন করছেন। আগে এত দীর্ঘ সময় মাঠে থাকতে হয়নি। তাই সবার সঙ্গে ভালো সম্পর্ক বজায় রাখতে হবে। দূরত্ব থাকলে তা দূর করতে হবে।’
নির্বাচনে সেনাবাহিনীকে লাগবেই কেন?
স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম নির্বাচন থেকেই নির্বাচনকে ঘিরে সেনাবাহিনী মোতায়েনের চল শুরু হয়েছে। নির্বাচনকে ঘিরে পুলিশ, আনসার, র্যাব, বিজিবি’র মতো বাহিনীগুলোর সাথেই দায়িত্ব পালন করবে সেনাবাহিনী। অতীতেও নির্বাচনের সময় বেসামরিক প্রশাসনকে সহায়তা করতে সেনাবাহিনী ‘স্ট্রাইকিং ফোর্স’ হিসেবে কাজ করেছে।
স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে, নির্বাচনকে ঘিরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বেসামরিক বাহিনীগুলো সক্রিয় থাকার পরও কেন সেনাবাহিনীকে নির্বাচনের দায়িত্ব পালন করার জন্য আহ্বান করা হয়?
নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর জেনারেল (অব.) মাসুদ রাজ্জাক চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন, আমাদের পুলিশ ও আনসাররা খুবই প্রশিক্ষিত। নিরাপত্তা নিশ্চিতের শেষ হাতিয়ার হচ্ছে সেনাবাহিনী। অসময়ে যদি সেনাবাহিনীকে ব্যবহার করা হয় সেটা যেমন ভুল হবে, তেমনি আবার পরিস্থিতি যদি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় সেখানে সেনাবাহিনী যেয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতেই পারবে– এটা কেউ শতভাগ নিশ্চয়তা দিয়ে বলতে পারবে না।

তিনি বলেন: সেনাবাহিনীর কাছে প্রাণঘাতী অস্ত্র থাকে, ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা থাকায় তাদের গুলি করার অনুমতিও থাকে। কিন্তু সেনাবাহিনী কি জনগণের উপর গুলি করবে? এটা নিয়ে একটা প্রশ্ন থেকেই যায়।
‘‘এখন কথা হল আপনি পরিস্থিতি গুলি পর্যন্ত নেবেন কেন? আরেকটা বিষয় যেটা ‘সেলফ সেফটি’– সে ক্ষেত্রে গুলি করা হয়। সেটা পুলিশ বা আনসার যে কেউ করতে পারে,’’ বলে যোগ করেন তিনি।
জেনারেল মাসুদের মতে, নির্বাচনে সেনাবাহিনী মোতায়েনের একটি বড় কারণ– বাংলাদেশের মানুষের কাছে সেনাবাহিনীর ‘ভাবমূর্তি’।
‘‘বাংলাদেশের মানুষ সেনাবাহিনীকে ‘নিরপেক্ষ’ বাহিনী হিসেবে মনে করে এবং তাদের উপস্থিতিতে মানুষ ‘নিরাপত্তার বিষয়ে আস্থা’ পায়,” বলে মন্তব্য করেন তিনি।
মেজর জেনারেল (অব.) মাসুদ রাজ্জাক বলেন: আসলে আমাদের জনগণের সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে। জনগণ সচেতন থাকলে খুব শান্তিপূর্ণভাবে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।







