শিক্ষাবিদ ও কথাসাহিত্যিক ড. মুহম্মদ জাফর ইকবাল ছাত্র আন্দোলনের পর থেকেই বেশ সমালোচিত। সম্প্রতি তার লেখা বই পোড়ানোর কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে, যেখানে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন বহু মানুষ।
ফেসবুকে ‘মুক্তমঞ্চে জাফর ইকবালের বই পোড়ানো কর্মসূচি’ নামের একটি ইভেন্ট খোলা হয়েছে যেখানে ইতিমধ্যে ২১ হাজার ব্যবহারকারী ইভেন্টটি নিয়ে তাদের আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। ৩৩৭ জন ইভেন্টে যোগ দেওয়ার পক্ষে আছেন।

দেশেে চলমান পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ এবং গণতন্ত্রের বিকাশ নিয়ে যে আন্দোলন চলছে, সেই প্রেক্ষাপটে বই পোড়ানোর মত বিষয় কীসের আভাস দিচ্ছে জানতে চাইলে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক শিক্ষাবিদ রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, আমরা দাবি করি আমরা মানুষ হয়েছি, কিন্তু এগুলো মনুষ্যত্বর অংশ না। একজন মানুষের বই পছন্দ নাও হতে পারে, তার কথা পছন্দ না হতে পারে, তাই বলে বই পোড়ানো, এটা কী বিষয়? নীতি-নৈতিকতা যদি থেকে থাকে তাহলে এটা অন্যায়।
এই বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক রুশাদ ফরিদী ফেসবুক পোস্টে লিখেছেন, মুহম্মদ জাফর ইকবাল ও অন্যান্য লেখকদের রাজনৈতিক অবস্থানের কারণে যে বা যারা তাদের বই পোড়ানোর উদ্যোগ নিচ্ছেন, তারা সবাই একশত ভাগ ফ্যাসিস্ট। আপনাদের নিন্দা জানানোর ভাষা আমার নাই। আমি এমনকি এদের বই বিক্রি বন্ধের সিদ্ধান্তেরও বিপক্ষে। ব্যক্তি জাফর ইকবালকে আপনি চরম অপছন্দ করেও তার বই আপনি পড়তে পারেন। আবার নাও পড়তে পারেন। যেমন আমার পড়ার আগ্রহ নাই। কিন্তু বই পড়ার বা লেখার স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করা নিন্দনীয় অপরাধ।

রাশেদ কে চৌধুরী চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন, যদি পর্ণগ্রাফি নিয়ে কোন বই হত, তাহলে আলাদা কথা। কিন্তু এটা তো সেরকম কিছু না। আমাদের স্বাধীনতা আছে। আমরা লিখতে পারি, বই প্রকাশ করতে পারি। তাই বলে কারও বই পছন্দ না হলে পুড়িয়ে ফেলা হবে। গণতন্ত্রে এটা একদমই ঠিক না।
এই কর্মসূচির সাথে জড়িতরা আন্দোলনের সাথে যুক্ত নয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, যে বা যারাই এই সংস্কৃতির মধ্যে থাকবে তারা ছাত্র আন্দোলনের সাথে যায় না। এই শিক্ষাবিদ বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণে সমন্বয়কদের প্রতি তার আহব্বান জানান।
একজন মানুষের বই পছন্দ নাও হতে পারে, তার কথা পছন্দ না হতে পারে তাই বলে বই পোড়ানো, এটা কী বিষয়? নীতি-নৈতিকতা যদি থেকে থাকে তাহলে এটা অন্যায়। -রাশেদা কে চৌধুরী
বিষয়টি নিয়ে চ্যানেল আই অনলাইনের সাথে কথা হয় কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ বিভাগের সহকারী অধ্যাপক কাজী আনিসুল হকের সাথে। বই পোড়ানোর বিষয়ে একদমই সহমত নেই জানিয়ে তিনি বললেন, কারও বই ভালো নাও লাগতে পারে। তাই বলে পোড়ানোটাকে সমর্থন করি না আমি। এটা বাক স্বাধীনতার বিপক্ষে। আজ তার বই ভালো লাগছে না দেখে পোড়ানো হবে, কাল আরেকজনের বই পোড়ানো হবে এটা কাম্য নয়।
বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের মাঝখানে শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ায় সমালোচিত হন দেশের সুপরিচিত কথাসাহিত্যিক, বিজ্ঞান কল্পকাহিনী লেখক, কলাম লেখক, পদার্থবিদ ও শিক্ষাবিদ ড. মুহম্মদ জাফর ইকবাল। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার রাজাকার আখ্যা দেওয়া বক্তব্যের প্রতিবাদে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কোটা সংস্কার আন্দোলনকারী ‘আমি কে, তুমি কে, রাজাকার, রাজাকার’ স্লোগান দিলে শিক্ষার্থীদের এমন প্রতিবাদের প্রতিক্রিয়া জানানো জাফর ইকবালের একটি চিরকুট সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়।

যেখানে তিনি লিখেছিলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আমার বিশ্ববিদ্যালয়, আমার প্রিয় বিশ্ববিদ্যালয়। তবে আমি মনে হয় আর কোনোদিন এই বিশ্ববিদ্যালয়ে যেতে চাইবো না। ছাত্র-ছাত্রীদের দেখলেই মনে হবে, এরাই হয়তো সেই রাজাকার। আর যে কয়দিন বেঁচে আছি, আমি কোনো রাজাকারের মুখ দেখতে চাই না। একটাই তো জীবন। সেই জীবনে আবার কেন নতুন করে রাজাকারদের দেখতে হবে?
জাফর ইকবালের এমন মন্তব্যের পর থেকেই আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের মধ্যেও ব্যাপক ক্ষোভ দেখা দেয়। সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শাবিপ্রবি) আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা তখন শিক্ষার্থীদের দাবির বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ায় তাকে আজীবন নিষিদ্ধ এবং অবাঞ্ছিত ঘোষণা করেন। এমনকি তখনও দেশের বিভিন্ন স্থানে পুড়িয়ে ফেলা হয় জাফর ইকবালের লেখা বই।








