প্রথম টেস্টে জয়ের পর ফুরফুরে মেজাজে ছিল বাংলাদেশ। দ্বিতীয় টেস্টে টসে জিতে বল নিয়ে পাকিস্তানকে অলআউট করে নিজেরা ব্যাটিংয়ে নামে। দ্বিতীয় দিনের শেষবেলা ঠিকঠাক কাটিয়ে দিলেও তৃতীয় দিন সকালে ধস নামে নাজমুল হোসেন শান্তদের। আগেরদিনের ১০ রানের সাথে আর ১৬ যোগ করতেই টাইগাররা হারিয়ে ফেলে ৬ উইকেট। সেখান থেকে রচিত হয় ইতিহাস, মহাকাব্যিক এক জুটিতে ম্যাচে ফেরে বাংলাদেশ। দেড়শ পেরোনো জুটি আনেন লিটন দাস ও মেহেদী হাসান মিরাজ। যার কল্যাণে আরেকটি ইতিহাস রচিত হল বাংলাদেশ ক্রিকেটে। টেস্টে পাকিস্তানকে প্রথমবার হোয়াইটওয়াশ, ২-০তে তাদেরই মাটিতে সিরিজ জয়, দেশের বাইরে তৃতীয়বার টেস্ট সিরিজ জয় লাল-সবুজদের।
বাংলাদেশের জন্য ২৬ রানে প্রথম ৬ উইকেট হারানোর ঘটনা প্রথম ছিল না, তবে ঘুরে দাঁড়ানো ছিল অসাধারণ। সাউথ আফ্রিকার বিপক্ষে ২০২২ সালে ডারবানে প্রথমবার এমন ঘটনার মুখোমুখি হয়েছিল টিম টাইগার্স। সবচেয়ে কম রানে প্রথম ৬ উইকেট হারানোর রেকর্ড বাংলাদেশের দখলে। এবার আরেকটি রেকর্ডের মালিক হয়েছে বাংলাদেশ। ৫০ রানের আগে ৬ উইকেট হারানোর পর প্রথমবার ২০০ রানের গণ্ডি পার করেছে টিম টাইগার্স।
ওই অবস্থা থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর নেতৃত্ব দেন লিটন-মিরাজ, দেড়শ পেরোনো জুটিতে আড়াইশ পার করেন দলকে। তাদের দৃঢ়তার পর পাকিস্তান দমে যায়, প্রথম ইনিংসে মাত্র ১২ রানের লিড তুলতে পারে তারা। দ্বিতীয় ইনিংসে পাকিস্তান ব্যাটে নেমে বিপর্যয়ের মুখে পড়ে, অলআউট হয় ১৭২ রানে। বাংলাদেশের জয়ের জন্য লক্ষ্য দাঁড়ায় ১৮৫। দ্বিতীয় ইনিংসে কোনো বিপর্যয় হতে দেয়নি টিম টাইগার্স, সহজে পৌঁছে যায় লক্ষ্যে। জাকির হাসানের ৪০, শান্তর ৩৮ এবং মুমিনুল হকের ৩৪ রানে ভর করে ৬ উইকেট হাতে রেখে মুশফিকুর রহিম (২২*) ও সাকিব আল হাসান (২১*) দলকে জয়ের বন্দরে নোঙর করান।
প্রথম ইনিংসে ওইরকম ধসের অবস্থা থেকে ২৬২ রানে যেয়ে থেমেছিল বাংলাদেশ। যা নাজুক অবস্থা থেকে দলীয় সর্বোচ্চ রানের রেকর্ড। আগের সর্বোচ্চ রান ছিল ২৫৫, ১৯৬৭ সালে ওভালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে পাকিস্তান ৪১ রানে ৬ উইকেট হারানোর পর সর্বোচ্চ সেই রান করেছিল।
বাংলাদেশের আড়াইশর ভিত গড়া লিটন-মিরাজের সপ্তম উইকেট জুটি ভেঙেছিল ১৬৫ রানে যেয়ে। টেস্টে পঞ্চাশের আগে ৬ উইকেট হারানোর পর সপ্তম উইকেট জুটিতে যেটি সর্বোচ্চ রানের রেকর্ড। আগের সর্বোচ্চ ১১৫ রানের জুটি ছিল। সেই জুটি করেছিলেন পাকিস্তানের অলরাউন্ডার আব্দুর রাজ্জাক ও উইকেটকিপার-ব্যাটার কামরান আকমল। ২০০৬ সালে করাচি টেস্টে, ভারতের বিপক্ষে ৩৯ রানে ৬ উইকেট হারানোর পর জুটিটি গড়েছিলেন তারা। তবে সপ্তম উইকেট জুটিতে বাংলাদেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ জুটি এটি, প্রথমটি কদিন আগের টেস্টে মুশফিক-মিরাজের ১৯৬ রানের।
৫০ রানের আগে ৬ উইকেট হারিয়ে শতরানের জুটির ইতিহাস ছিল টেস্টে মাত্র একবার। ২০২১ সালে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে গলে যে কীর্তি গড়েছিল ওয়েস্ট ইন্ডিজ। ১৮ রানে ৬ উইকেট হারানোর পর ১০০ রানের ওই জুটি গড়েছিলেন এনক্রুমাহ বোনার ও জসুয়া ডি সিলভা।
সিরিজে সপ্তম উইকেট জুটিতে দারুণ আরেকটি রেকর্ডের মালিক হয়েছে বাংলাদেশ। রাওয়ালপিন্ডিতে প্রথম টেস্টে মুশফিকুর রহিম ও মিরাজ ১৯৬ রানের জুটি গড়েছিলেন এবং যে জুটি এই উইকেটে সর্বোচ্চ। দ্বিতীয় টেস্টেও একই উইকেটে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ জুটির রেকর্ড হয়েছে। সঙ্গে সপ্তম উইকেট জুটিতে দেড়শ রানের একাধিক জুটি হওয়া প্রথম কোনো দল বাংলাদেশ।
পঞ্চাশের আগে ৬ উইকেট পড়ার পর সপ্তম উইকেট জুটিতে পঞ্চাশের বেশি রান পাওয়ার ইনিংস হিসেবে বাংলাদেশের জন্য এটি দ্বিতীয়বার। ২০০৮ সালে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে মিরপুর টেস্টে ৪৪ রানে ষষ্ঠ উইকেট পড়ার পর ৭৮ রান যোগ করেছিলেন সাকিব আল হাসান ও মাশরাফী বিন মোর্ত্তজা।
নবম উইকেট জুটিতে লিটন এবং হাসান মাহমুদ ১৪৯ বল খেলেছিলেন। বলের দিক থেকে নবম উইকেট জুটিতে এটি পঞ্চম সর্বোচ্চ জুটি, এতে রান এসেছিল ৬৯। ২০২১ সালে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ এবং তাসকিন আহমেদ ২৭০ বল খেলে ১৯১ রানের জুটি গড়েন। শেষ দুই উইকেটে এটি ছিল তাদের সর্বোচ্চ বল খেলার রেকর্ড।
রাওয়ালপিন্ডিতে বিপর্যয়ে পড়া বাংলাদেশের হাল ধরে সেঞ্চুরি তুলে নিয়েছেন উইকেটকিপার-ব্যাটার লিটন দাস। ২৭ মাস পর ক্যারিয়ারের চতুর্থ সেঞ্চুরির দেখা পান তারকা ব্যাটার। পাকিস্তানের মাটিতে এটি প্রথম হলেও দেশটির বিপক্ষে লিটনের দ্বিতীয় সেঞ্চুরি। প্রথমটি ছিল বাংলাদেশে ২০২১ সালে, চট্টগ্রামের জহুর আহমেদ চৌধুরী স্টেডিয়ামে পাকিস্তানের বিপক্ষে প্রথম সেঞ্চুরির দেখা পান এ ডানহাতি ব্যাটার।
শেষপর্যন্ত লিটন ২২৮ বলে ১৩৮ রানে আঘা সালমানের বলে ক্যাচ দেন। তার ইনিংসে ১৩ চার এবং ৪ ছক্কার মার ছিল। তবে লিটন যে অবস্থায় ব্যাটে নেমে সেঞ্চুরি করেছেন সেটিও আবার রেকর্ড। দলীয় রান ৫০ হওয়ার আগে পাঁচের পরে নেমে তিনটি সেঞ্চুরি পেয়েছেন লিটন। তার আগে এ অবস্থায় ব্যাটে নেমে দুটি সেঞ্চুরির রেকর্ড ছিল, পাকিস্তানের বিপক্ষে সেঞ্চুরি পাওয়ায় সেই রেকর্ড টপকে গেছেন টাইগার তারকা।
ডানহাতি অলরাউন্ডার মিরাজ ১২৪ বলে ৭৮ রানে খুররাম শেহজাদের হাতে ফিরতি ক্যাচ দিয়ে সাজঘরে ফিরে যান। তার ইনিংসে ১২ চার এবং এক ছক্কার মার ছিল। আউট হওয়ার আগে দ্বিতীয়বার একই টেস্টে ৫ উইকেট এবং ফিফটির কীর্তি গড়েছেন ২৬ বর্ষী তারকা। প্রথম ইনিংসে ৬১ রানে ৫ উইকেট নিয়েছেন। প্রথমবার কীর্তিটি গড়েছিলেন ২০১৮ সালে, জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে। অপরাজিত ৬৮ রানের পাশাপাশি ৩৮ রানে ৫ উইকেট নিয়েছিলেন।
তৃতীয় দিন সকালে ২৬ রানের মধ্যে ৬ উইকেট পড়ার পর, আটে ব্যাটিংয়ে নেমে ফিফটির ইনিংস খেলা বিশ্বের চতুর্থ ব্যাটার মিরাজ। বাকি তিন ইনিংসে সর্বোচ্চ রান ছিল ৭০, সেটা ছাড়িয়ে মিরাজের ইনিংসটি সর্বোচ্চ রানের রেকর্ড গড়েছে। টানা তৃতীয় ইনিংসে আট নম্বরে নেমে ফিফটির দেখা পেলেন তিনি।
লিটন-মিরাজের যে জুটি শুধু ম্যাচের মোড়ই ঘুরিয়ে দেয়নি, দারুণ জয়ের ভিত গড়ে দিয়েছে। পাকিস্তানকে তাদেরই মাটিতে হোয়াইটওয়াশের পথ করে দিয়েছে।








