বিবিসি-র চলচ্চিত্র সমালোচক ক্যারিন জেমস ও নিকোলাস বারবার বেছে নিয়েছেন এ বছরের উল্লেখযোগ্য ১৬টি সিনেমা। মিস্ট্রি হররের মতো ভিন্নধর্মী ছবি ‘ওয়েপনস’ থেকে শুরু করে প্রায় রোমান্টিক কমেডির মতো মনোমুগ্ধকর ‘ম্যাটেরিয়ালিস্টস’— এর মতো নানা স্বাদের সিনেমা আছে তালিকায়-
১. ওয়েপনস
একটি শহরতলির প্রেক্ষাপটে রাত ২টা ১৭ মিনিটে শুরু হয় গল্প। হঠাৎ ১৭ জন শিশু একসাথে ঘর থেকে বেরিয়ে অদৃশ্য হয়ে যায়। এরপর শিক্ষক (জুলিয়া গার্নার), প্রধানশিক্ষক (বেনেডিক্ট ওং), অভিভাবক (জশ ব্রোলিন), পুলিশ (অলডেন এহরেনরেইক)– প্রত্যেকের চোখ দিয়ে এগোতে থাকে রহস্য। শেষ পর্যন্ত সমাধান সহজ হলেও, পরিচালক জ্যাক ক্রেগার ভয়ের নানা উপাদানকে মিশিয়ে তৈরি করেছেন একেবারেই নতুন ধরনের হরর।
২. হায়েস্ট ২ লয়েস্ট
কুরোসাওয়ার ‘হাই এন্ড লো’ এর অনুপ্রেরণায় স্পাইক লি নির্মিত থ্রিলার এটি৷ গল্পে দেখা যায়, ডেনজেল ওয়াশিংটন অভিনয় করেছেন ডেভিড কিং নামের এক সংগীতশিল্প ব্যবসায়ীর ভূমিকায়। কিং-এর কিশোর ছেলে অপহৃত হয়েছে ভেবে সবাই ভয় পায়, কিন্তু পরে জানা যায় অপহৃত হয়েছে আসলে কিং-এর সহকারী (জেফ্রি রাইট)-এর ছেলে। প্রশ্ন হলো—অর্থকষ্টে থাকা কিং কি অন্যের সন্তানের মুক্তিপণের টাকা দেবেন?
স্পাইক লি তার স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতেই এই নৈতিক দ্বন্দ্বকে রূপ দিয়েছেন। এখানে জাতি ও শ্রেণির সামাজিক বাস্তবতা উঠে এসেছে, পাশাপাশি দেখা যায় ঝলমলে ভিজ্যুয়াল—কিং-এর ব্রুকলিনের বিলাসবহুল অ্যাপার্টমেন্ট, যেখানে ভরে আছে কৃষ্ণাঙ্গ শিল্পীদের কাজ। ছবিতে রয়েছে সজীব সংগীত—র্যাপ থেকে সালসা, এমনকি পূর্ণ অর্কেস্ট্রাল সাউন্ডট্র্যাক পর্যন্ত।
অপহরণকারীর সঙ্গে কিং-এর টানটান লড়াই গিয়ে পৌঁছায় নিউ ইয়র্কের সাবওয়েতে, পুয়ের্তো রিকান ডে উৎসবের ভিড়ের মধ্যে এক দমবন্ধ করা ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ায়। ডেনজেল ওয়াশিংটন এখানে তার সেরাটাই দিয়েছেন, আর সহ-অভিনয়ে এএসএপি রকি এনে দিয়েছেন শাণিত অভিনয়।
৩. ব্রিং হার ব্যাক
টক টু মি- দিয়ে আলোচনায় আসা ফিলিপো ভ্রাতৃদ্বয় এবার এনেছেন এক আতঙ্কময় আবহে গড়া গল্প। অনাথ ভাইবোন এক পালক মায়ের কাছে গেলে সামনে আসে দানবীয় আবিষ্টতা ও জম্বির ভয়াবহতা। সিনেমায় স্যালি হকিন্সের অভিনয় আলাদা মাত্রা যোগ করেছে।
৪. ম্যাটেরিয়ালিস্টস
জেন অস্টেন জানতেন, অর্থ আর বিয়ে চিরকালই অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত—আর সেই ধারণাকেই আধুনিক সময়ে বুদ্ধিমত্তা ও হালকা ব্যঙ্গরস নিয়ে হাজির করেছেন সেলিন সঙ তার নতুন ছবিতে। ‘ম্যাটেরিয়ালিস্টস’ দেখতে হয়তো প্রচলিত রোমান্টিক কমেডির মতো, কিন্তু আসলে এটি সেই ঘরানার বাঁধাধরা ধারা ভেঙে সম্পর্ককে বাস্তব জগতে, অর্থ ও অনুভূতির জটিলতায় নতুনভাবে তুলে ধরে।
ডাকোটা জনসন এখানে লুসি চরিত্রে, পেশায় একজন ম্যাচমেকার, যিনি নিজের জীবনেই দুই পুরুষের মধ্যে সিদ্ধান্তহীনতায় পড়েছেন। একদিকে তার প্রাক্তন প্রেমিক (ক্রিস ইভান্স)—যিনি এখনও তাকে ভালোবাসেন, কিন্তু তার সংগ্রামী অভিনেতাজীবনের কারণে লুসিকে দারিদ্র্যের ঝুঁকি নিতে হবে। অন্যদিকে আছেন পেদ্রো পাস্কাল—একজন বিলিয়নিয়ার, তবে একইসাথে মনোযোগী ও আন্তরিক। পাস্কাল, স্বভাবসুলভ আকর্ষণ ও আন্তরিকতার সমন্বয়ে চরিত্রটিকে অনন্যভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন।
গুরুত্বপূর্ণ হলো, নির্মাতা সেলিন সঙ অর্থ আর সম্পর্কের বাস্তব দিকগুলোকে নিরপেক্ষভাবে দেখালেও ভালোবাসা নিয়ে কখনও নিরাশাবাদী হননি। তার আগের ছবি ‘পাস্ট লাইভস’-এর মতোই, ম্যাটেরিয়ালিস্টস-ও প্রমাণ করে তিনি আজকের সময়ের অন্যতম মৌলিক ও সূক্ষ্ম চলচ্চিত্র নির্মাতা।
৫. দ্য ব্যালাড অব ওয়ালিস আইল্যান্ড
ব্রিটিশ কমেডি। কেয়ারি মুলিগান ও টম বাসডেন অভিনীত এক ভাঙা সংগীতদলকে জোর করে একত্র করেন এক অদ্ভুত লটারিজয়ী। রসিকতা, আবেগ আর মনোমুগ্ধকর দৃশ্যে ভরপুর পুরো সিনেমা।
৬. লার্কার
সোশ্যাল মিডিয়া যুগের খ্যাতি ও ভক্তির ভ্রান্তি নিয়ে সাইকোলজিক্যাল থ্রিলার। ম্যাথিউ (থিওডর পেল্লেরিন) এক তারকা গায়কের (আর্চি ম্যাডেকওয়ে) ভক্ত থেকে ধীরে ধীরে অন্ধ অনুগামীতে পরিণত হয়। খুবই সময়োপযোগী কাহিনি।
৭. কোম্পানিয়ন
ড্রু হ্যানককের ৯৭ মিনিটের আমেরিকান ইন্ডি ফিল্ম। প্রথমে রোমকম বা থ্রিলার মনে হলেও আসলে প্রযুক্তি ও পুরুষতন্ত্র নিয়ে ব্যঙ্গাত্মক সাই-ফাই থ্রিলার এটি। অভিনয়ে জ্যাক কুয়েড ও সোফি থ্যাচার।
৮. সিনারস
রায়ান কুগলারের ‘ব্ল্যাক প্যান্থার’ যতটা চমকপ্রদ ছিল, তারচেয়ে ঢের বেশি চমকপ্রদ তার নতুন ছবি ‘সিনারস’! এখানে মাইকেল বি জর্ডন অভিনয় করেছেন জমজ দুই ভাই—স্মোক আর স্ট্যাক—এর ভূমিকায়। তারা ১৯৩২ সালের জিম ক্রো আমলের মিসিসিপিতে শিকাগো থেকে ফিরে আসে একটি জুউক জয়েন্ট (ব্লুজ সংগীত আর নাচের আসর) খোলার জন্য।
কুগলার বিশাল কল্পনা ও দক্ষতায় নানা ঘরানা একসাথে মিশিয়ে তৈরি করেছেন এক অভিনব সিনেমা, যেখানে বাস্তব আর অতিপ্রাকৃত এক হয়ে গেছে। সিনারস- একদিকে পিরিয়ড ড্রামা, আবার অন্যদিকে ভ্যাম্পায়ার চলচ্চিত্র। এর ভেতরে বর্ণবাদ, পরিবার, কুসংস্কার আর আধ্যাত্মিকতার মতো গুরুতর বিষয় জায়গা করে নিয়েছে, সঙ্গে আছে তীব্র যৌনতা ও উচ্ছ্বাসে ভরা ব্লুজ সংগীত।
৯. আর্ট অব এভরিবডি
থোমাস কিনকেডের জীবনীঘন ডকুমেন্টারি। একদিকে ‘পেইন্টার অব লাইট’ নামে বাজারজোড়া খ্যাতি, অন্যদিকে তার লুকানো অন্ধকার দিক।
১০. ওয়ারফেয়ার
অ্যালেক্স গারল্যান্ড ও প্রাক্তন নেভি সিল রে মেনডোজার সহ-নির্মাণ। ইরাক যুদ্ধে নেভি সিল বনাম আল-কায়েদার লড়াই বাস্তবসম্মত ও নির্মম ভঙ্গিতে ধরা হয়েছে সিনেমায়।
১১. ব্রিং দেম ডাউন
আয়ারল্যান্ডের ভেড়ার খামার ঘিরে রক্তাক্ত দ্বন্দ্ব। ব্যারি কিওঘান, ক্রিস্টোফার অ্যাবট ও কোলম মিনির অনবদ্য অভিনয় মুগ্ধ করেছে দর্শকদের। প্রতিশোধের গল্প থেকে ট্র্যাজেডিতে রূপ নেয়া সিনেমাটি বছরের অন্যতম আলোচিত সিনেমা হিসেবেই থাকবে।
১২. মিসেরিকর্ডিয়া
আলাঁ গুইরোদি পরিচালিত এটি একটি ফরাসি ছবি। গ্রামে ফেরা এক যুবক নানা অদ্ভুত সম্পর্ক, কামনা আর হত্যার রহস্যে জড়িয়ে পড়ে। নাটক, কমেডি ও থ্রিলারের মিশ্রণ আছে সিনেমায়।
১৩. হলি কাউ
ফরাসি গ্রামীণ পটভূমি। হঠাৎ বাবার মৃত্যুতে এক কিশোর বোনকে নিয়ে টিকে থাকার লড়াইয়ে নামে, আর্থিক সংকট কাটাতে শুরু করে বিলাসবহুল চিজ তৈরি। হৃদয়স্পর্শী কামিং-অব-এইজ ড্রামা। যে কোনো দর্শককে সিনেমাটি অনুপ্রাণিত করবে।
১৪. দ্য ফ্রেন্ড
সিগ্রিড নুনেজের উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত এই সিনেমা। নাওমি ওয়াটস তার প্রয়াত বন্ধুর কুকুরকে সামলাতে গিয়ে আসলে শোক সামলানোর উপায় খুঁজে পান। বিল মারে আছেন ফ্ল্যাশব্যাকে!
১৫. ওয়ালেস অ্যান্ড গ্রোমিট: ভেঞ্জেন্স মোস্ট ফাউ
আর্ডম্যান স্টুডিওর দুই মহান নায়ক আবার ফিরেছে—আর সঙ্গে এসেছে তাদের সবচেয়ে চালাক প্রতিদ্বন্দ্বী, এক শয়তানি পেঙ্গুইন ফেদারস ম্যাকগ্রো। নিক পার্ক ও মার্লিন ক্রসিংহ্যামের পরিচালনায় নির্মিত ব্রিস্টল-ভিত্তিক স্টুডিওর এই নতুন ছবিতে নস্টালজিয়ায় মাতবেন দর্শক। তবে সমালোচক বলছেন, ওয়ালেস আর গ্রোমিটের গল্পটা ‘মিশন ইম্পসিবল’ ধাঁচের উত্তেজনায় গড়ায়। ছবিটি এবার ছুঁয়ে যায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে আশঙ্কার প্রসঙ্গও।
১৬. অন বিকামিং আ গিনি ফাউল
অত্যন্ত মেধাবী নির্মাতা রুংগানো নিয়োনি, যার ‘আই অ্যাম নট আ উইচ’ (২০১৭) ব্রিটিশ ডেবিউ হিসেবে বাফটা পুরস্কার জিতেছিল, তিনি এমন সব চলচ্চিত্র বানান যেগুলো একইসঙ্গে শিল্পসম্মত ও সহজবোধ্য, আর ভিজ্যুয়ালে ভরপুর নান্দনিকতার ছোঁয়া। তাঁর সর্বশেষ ছবি একটি তীক্ষ্ণ দৃষ্টির ড্রামা, যেখানে সাংস্কৃতিক ও প্রজন্মগত দ্বন্দ্ব ফুটে উঠেছে।
নায়িকা শুলা, একজন আধুনিক নারী, সম্প্রতি শহর থেকে তার জাম্বিয়ার গ্রামে ফিরে এসেছেন। নিয়োনি শুরুতেই এই দ্বন্দ্ব তুলে ধরেন—শুলা যখন এক কস্টিউম পার্টি থেকে ফিরছে ঝলমলে রুপালি হেলমেট ও গাঢ় সানগ্লাস পরে (যা মিসি এলিয়ট-এর একটি মিউজিক ভিডিওকে শ্রদ্ধা জানানোর ভঙ্গি), তখনই সে কাদামাটির রাস্তায় তার আঙ্কেল ফ্রেডের মৃতদেহ খুঁজে পায়।
এরপর কাহিনি এগোয় পরিবারের ঐতিহ্যবাহী অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার আচার-অনুষ্ঠানের ভেতর দিয়ে, আর ধীরে ধীরে প্রকাশিত হয় যে শিশু অবস্থায় শুলা ও তার দুই কাজিন ফ্রেডের দ্বারা নির্যাতনের শিকার হয়েছিল। কিন্তু তাদের মায়েরা শোকের আবহে সেই সত্যটিকে একপাশে সরিয়ে রাখে।
নিয়োনির শৈলী একদিকে বাস্তববাদী, অন্যদিকে মাঝেমধ্যে তিনি সুররিয়াল ইমেজও ব্যবহার করেন। গোপনীয়তা আর যৌন নির্যাতনের ট্রমা নিয়ে গড়া এই আখ্যান ক্রমশ শক্তি সঞ্চয় করে চূড়ান্ত মুহূর্তে পৌঁছায়—যখন শুলা একটি শিশুতোষ টেলিভিশন প্রোগ্রামকে স্মরণ করে, আর সেই সময়েই ছবির শিরোনামের প্রকৃত তাৎপর্য দর্শকের কাছে উন্মোচিত হয়। বিবিসি








