এই খবরটি পডকাস্টে শুনুনঃ
৩ জানুয়ারি ২০২৬, ভোররাত, ভেনেজুয়েলা। বিশ্বের রাজনীতি ও সামরিক ইতিহাসে এক বিস্ময়কর ঘটনা ঘটে। যুক্তরাষ্ট্র কোনো সেনা হতাহত ছাড়াই ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে আটক করে। এই অভিযানের নাম ছিল ‘অপারেশন অ্যাবসলুট রিজলভ’। ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে ভেনেজুয়েলার ঘটনাটি তুলনা হচ্ছে পানামার স্বৈরশাসক মানুয়েল নোরিয়েগা ও ইরাকের সাদ্দাম হোসেনের গ্রেফতারের সঙ্গে। তবে সেসব ছিল পূর্ণাঙ্গ সামরিক আক্রমণ ও দীর্ঘ অভিযান। আর ভেনেজুয়েলার ক্ষেত্রে মাত্র ২ ঘণ্টার অভিযানে ‘দ্রুততম রেজিম চেঞ্জ’ যা আধুনিক মার্কিন সামরিক কৌশলের নতুন নজির।
এই অপারেশনটি ছিল আধুনিক যুদ্ধের এক ভিন্ন রূপ- যেখানে বোমা বা ট্যাঙ্কের চেয়ে তথ্য, প্রযুক্তি ও গোপন পরিকল্পনা বেশি শক্তিশালী হয়ে উঠেছে।
কীভাবে নিজের লোকেরাই বিপক্ষে গেল
দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক সংকট ও যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার কারণে অনেক সিনিয়র সামরিক কর্মকর্তার পরিবার যুক্তরাষ্ট্র বা কলম্বিয়ায় বসবাস করছিল।
সিআইএ এই সুযোগ কাজে লাগায়। তারা এসব কর্মকর্তাদের পরিবারের নিরাপত্তা, আর্থিক সহায়তা এবং ভবিষ্যতে আশ্রয়ের প্রতিশ্রুতি দেয়। এর ফলে অনেক কর্মকর্তা ধীরে ধীরে “ফ্লিপ” করে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে কাজ শুরু করেন।
এমনকি ভেনেজুয়েলার গোয়েন্দা সংস্থার ভেতরেও ডাবল এজেন্ট ছিল, যারা প্রকাশ্যে মাদুরোর পক্ষে কাজ করার ভান করলেও গোপনে যুক্তরাষ্ট্রকে তথ্য দিত। এছাড়া জনগণের কাছে অজনপ্রিয় হওয়ায় জনতার তেমন কোনো চাপ ও আগ্রহ ছিল না এই বিষয়ে।
মাসের পর মাসের নিখুঁত গোয়েন্দা প্রস্তুতি
এই অভিযানের মূল ভিত্তি ছিল দীর্ঘদিনের গোয়েন্দা তৎপরতা। যুক্তরাষ্ট্রের সিআইএ মাসের পর মাস ধরে মাদুরোর সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ নিরাপত্তা বলয়ে কাজ করে।
ভেনেজুয়েলার অভ্যন্তরীণ গোয়েন্দা সংস্থা SEBIN এবং প্রেসিডেন্সিয়াল গার্ড–এর কয়েকজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা গোপনে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুক্ত হন। তারা মাদুরোর দৈনন্দিন জীবন সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য দেন—তিনি কখন ঘুমান, কোন রুমে থাকেন, কোন গাড়ি ব্যবহার করেন, প্রেসিডেন্সিয়াল কম্পাউন্ডের লেআউট কেমন এবং নিরাপত্তা শিফট কখন পরিবর্তন হয়।
রিপোর্ট অনুযায়ী, অন্তত ২-৩ জন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি সরাসরি তথ্য দিয়েছেন, যাদের কাছে মাদুরোর বেডরুমের চাবি পর্যন্ত ছিল।
প্রেসিডেন্সিয়াল প্যালেসের থ্রি-ডি ম্যাপ
মিরাফ্লোরেস প্রেসিডেন্সিয়াল প্যালেস পর্যবেক্ষণে যুক্তরাষ্ট্র ব্যবহার করে উচ্চক্ষমতার স্যাটেলাইট ও ড্রোন। এর মধ্যে ছিল KH-11 মিলিটারি স্যাটেলাইট, Maxar-এর বাণিজ্যিক স্যাটেলাইট এবং RQ-4 Global Hawk ড্রোন।
এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে পুরো প্যালেসের একটি থ্রি-ডি ম্যাপ তৈরি করা হয়। থার্মাল ইমেজিংয়ের মাধ্যমে রাতে কোন রুমে কে অবস্থান করছে, সেটিও শনাক্ত করা সম্ভব হয়।
ফোন, ইমেইল, এনক্রিপ্টেড অ্যাপ- সব নজরদারিতে
যুক্তরাষ্ট্রের NSA মাদুরো ও তার ঘনিষ্ঠদের ফোন কল, ইমেইল এবং এনক্রিপ্টেড অ্যাপ যেমন টেলিগ্রাম ও সিগন্যাল ইন্টারসেপ্ট করে।
যদিও ভেনেজুয়েলার যোগাযোগ ব্যবস্থা রাশিয়ান ও চীনা প্রযুক্তির ওপর নির্ভরশীল ছিল, তবুও অনেক কর্মকর্তা পুরোনো বা কম সুরক্ষিত ডিভাইস ব্যবহার করছিলেন। এর ফলে মাদুরোর ফোন বা গাড়ির জিপিএস সিগন্যাল রিয়েল-টাইমে ট্র্যাক করা সম্ভব হয়।
ভুল তথ্য দিয়ে নিরাপত্তা বাহিনীকে বিভ্রান্ত করা
অপারেশনের ঠিক আগে মাদুরোর নিরাপত্তা বাহিনীকে ইচ্ছাকৃতভাবে ভুল তথ্য দেওয়া হয়। বলা হয়, কলম্বিয়া সীমান্তে বড় ধরনের সামরিক অভিযান শুরু হতে যাচ্ছে।
এর ফলে নিরাপত্তা বাহিনীর মনোযোগ রাজধানী কারাকাস থেকে সরে যায়। একই সময় কারাকাসের বিভিন্ন এলাকায় ড্রোন অ্যাকটিভিটি দেখিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি করা হয়।
প্রথমেই আকাশ প্রতিরক্ষা ধ্বংস
অভিযানের সময় যুক্তরাষ্ট্র ১৫০টিরও বেশি এয়ারক্রাফট ব্যবহার করে। এর মধ্যে ছিল F-22, F-35, EA-18G Growler এবং B-1 Bomber।
প্রথম ধাপে ভেনেজুয়েলার এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম ধ্বংস করা হয়- এটি ছিল একটি ক্লাসিক SEAD (Suppression of Enemy Air Defenses) অপারেশন।
ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ারের মাধ্যমে রাডার জ্যাম করা হয়, অ্যান্টি-রেডিয়েশন মিসাইল দিয়ে সক্রিয় রাডার ধ্বংস করা হয় এবং সাইবার আক্রমণের মাধ্যমে কমান্ড অ্যান্ড কন্ট্রোল সিস্টেম অচল করে দেওয়া হয়।
বিশেষ বাহিনীর দ্রুত আঘাত
এরপর ডেলটা ফোর্স এবং ১৬০তম স্পেশাল অপারেশনস অ্যাভিয়েশন রেজিমেন্ট–এর হেলিকপ্টার খুব নিচু দিয়ে উড়ে কারাকাসে প্রবেশ করে।
রাতের অন্ধকারে তারা রাডারের নিচ দিয়ে উড়ে মাদুরোর কম্পাউন্ডে পৌঁছায় এবং তাকে আত্মসমর্পণে বাধ্য করে।
পুরো অভিযান রাত ২টার দিকে শুরু হয়ে চার ঘণ্টারও কম সময়ের মধ্যে শেষ হয়।

কেন কাজ করেনি ভেনেজুয়েলার সেনাবাহিনী
কাগজে-কলমে ভেনেজুয়েলার সশস্ত্র বাহিনী (FANB) ল্যাটিন আমেরিকার শক্তিশালী বাহিনীগুলোর একটি। কিন্তু বাস্তবে এটি ছিল একটি “হোলো ফোর্স”- সংখ্যায় বড়, কিন্তু প্রস্তুতিতে দুর্বল।
দীর্ঘ অর্থনৈতিক সংকট ও নিষেধাজ্ঞার কারণে জ্বালানি, যন্ত্রাংশ ও প্রশিক্ষণের ঘাটতি তৈরি হয়। সেনাদের মনোবল কমে যায়, ডেজারশন বাড়ে।
রাশিয়ান ও চাইনিজ সরঞ্জামের প্রায় ৬০ শতাংশ রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে অচল ছিল। যেমন, সু-৩০ যুদ্ধবিমানের অর্ধেক গ্রাউন্ডেড এবং টি-৭২ ট্যাঙ্কগুলো ক্যানিবালাইজড অবস্থায় ছিল।
সেনাবাহিনী অতিমাত্রায় রাজনৈতিক হয়ে পড়েছিল, যেখানে দক্ষতার চেয়ে আনুগত্যই বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল। যৌথ প্রশিক্ষণ ও সমন্বিত যুদ্ধ পরিকল্পনারও ঘাটতি ছিল।
কাগজে শক্তিশালী, বাস্তবে ভঙ্গুর এয়ার ডিফেন্স
ভেনেজুয়েলার এয়ার ডিফেন্স সিস্টেমে ছিল রাশিয়ান S-300VM, Buk-M2E, Pantsir-S1, Tor-M1 এবং চাইনিজ রাডার নেটওয়ার্ক।
কিন্তু রক্ষণাবেক্ষণ ও প্রশিক্ষণের অভাবে এসব সিস্টেম কার্যত অকেজো ছিল। যুক্তরাষ্ট্র প্রি-এম্পটিভ স্ট্রাইক, ইলেকট্রনিক জ্যামিং এবং সাইবার অ্যাটাকের মাধ্যমে পুরো সিস্টেম মুহূর্তেই ভেঙে দেয়।
রাতে নিচু দিয়ে উড়া হেলিকপ্টারগুলো রাডারে ধরা পড়েনি।
এই ঘটনার শিক্ষা কী
এই অপারেশন দেখিয়ে দিয়েছে, আধুনিক যুদ্ধে শুধু উন্নত অস্ত্র থাকলেই যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন দক্ষ জনবল, নিয়মিত প্রশিক্ষণ, শক্তিশালী গোয়েন্দা ব্যবস্থা এবং সমন্বিত প্রতিরক্ষা পরিকল্পনা। উন্নত ও শক্তিশালী দেশগুলোর জন্য এগুলো স্বস্তির কথা হলেও অর্থনৈতিক-সামরিকভাবে দুর্বল দেশের জন্য শঙ্কার। এছাড়া জাতিসংঘের অধীনে থাকা দেশগুলোর নীতিমালা এবং এক দেশের সঙ্গে অন্য দেশের আচরণ-পদক্ষেপের আইনী যৌক্তিকতাও প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে এই অভিযানের পরে। আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে ক্ষমতা আর সমতার বিচারে এটি একটি নেতিবাচক উদাহরণ হয়ে থাকবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ঘটনা বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর জন্যও একটি সতর্কবার্তা- অস্ত্র কেনার পাশাপাশি গোয়েন্দা প্রস্তুতির সঙ্গে যথাযথ প্রশিক্ষণে গুরুত্ব না দিলে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কাগজেই সীমাবদ্ধ থেকে যায়। এছাড়া দেশত্ববোধের বিচারে জনগণের সমর্থন ও জনপ্রিয়তা থাকা দরকার সরকার ও সরকার প্রধানদের, যাতে করে বৈশ্বিক কোনো হস্তক্ষেপে জনগণ পাশে থাকে যেকোনো সুবিধা-অসুবিধায়।
(বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য-সংবাদের ভিত্তিতে লেখাটি তৈরি করা হয়েছে)
(এই বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)








