ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েল যুদ্ধের প্রভাবে জ্বালানি দামের উল্লম্ফন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতে বড় ধরনের চাপ তৈরি করতে পারে। এমন এক সময়ে এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, যখন জীবনযাত্রার ব্যয় ইতোমধ্যেই মার্কিন নাগরিকদের প্রধান উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠেছে।
সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানিয়েছে।
যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি প্রতি ব্যারেল অপরিশোধিত তেলের দাম ছিল প্রায় ৬৭ ডলার। কিন্তু সংঘাতের কারণে বিশ্বের অন্যতম জ্বালানি সমৃদ্ধ অঞ্চলে উৎপাদন ও পরিবহন ব্যাহত হওয়ায় সোমবার তা বেড়ে প্রায় ৯৭ ডলারে পৌঁছেছে। রবিবার সাময়িকভাবে তেলের দাম ১০০ ডলারও ছাড়িয়ে যায়, পরে কিছুটা কমে আসে।
জ্বালানি দামের পর্যবেক্ষক প্রতিষ্ঠান গ্যাসবাডি জানিয়েছে, গত এক সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রে গ্যাসোলিনের গড় দাম প্রতি গ্যালনে ৫১ সেন্ট বেড়েছে।
ক্যালিফোর্নিয়ার উপকূলীয় শহর গোয়েলেটার একটি গ্যাস স্টেশনে ৫২ বছর বয়সী আলমা নিউয়েল বলেন, দাম বাড়া নিয়ে তিনি উদ্বিগ্ন। কাঁধে আঘাত পাওয়ায় বর্তমানে তিনি কাজ করতে পারছেন না, ফলে বাড়তি খরচ তার সীমিত বাজেটকে আরও চাপে ফেলছে।
তিনি বলেন, আমি এখন কাজ করছি না, তাই দামের প্রভাবটা অনেক বেশি পড়ছে। খাবার আর বাড়িভাড়াই ইতোমধ্যে খুব ব্যয়বহুল।
যুদ্ধের প্রসঙ্গ টেনে তিনি আরও বলেন, এটা সত্যিই পাগলামি। কারণ এই যুদ্ধ একেবারেই অপ্রয়োজনীয়।
জীবনযাত্রার ব্যয়ের চাপ
বিশ্লেষকদের মতে, জ্বালানি দামের এই ঊর্ধ্বগতি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের ওপর রাজনৈতিক চাপ আরও বাড়াতে পারে। বিশেষ করে চলতি বছরের শেষের দিকে গুরুত্বপূর্ণ মধ্যবর্তী নির্বাচন (মিডটার্ম) অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।
ইউরেশিয়া গ্রুপের ইরান ও জ্বালানি বিশ্লেষক গ্রেগরি ব্রু বলেন, বর্তমান তেলের দাম বৃদ্ধির প্রবণতা বলছে, আগামী সপ্তাহের মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রে গ্যাসোলিনের দাম প্রতি গ্যালনে ৩ দশমিক ৫০ থেকে ৪ ডলার হতে পারে এবং ডিজেলের দাম এই সপ্তাহেই ৫ ডলার ছুঁতে পারে।
গ্যাসবাডির তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে গ্যাসোলিনের গড় সর্বোচ্চ দাম রেকর্ড হয়েছিল ২০২২ সালের জুনে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর কয়েক মাস পর যখন প্রতি গ্যালনের দাম ৫ দশমিক ৩৪ ডলারে পৌঁছেছিল।
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতির প্রভাব অর্থনীতির চেয়ে রাজনৈতিক ক্ষেত্রেই বেশি দেখা যেতে পারে। কারণ গ্যাসোলিনের উচ্চ দাম সরকারের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে জনমনে নেতিবাচক ধারণা তৈরি করতে পারে।
যুদ্ধের প্রভাব বৈশ্বিক সরবরাহে
যুদ্ধের কারণে বিশ্ব বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ পথ হরমুজ প্রণালীর কার্যক্রমও বাধাগ্রস্ত হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরেই ইরান বলে আসছিল, যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলের সঙ্গে বড় সংঘাত হলে তারা এই প্রণালী বন্ধ করে দিতে পারে।
বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল এবং উল্লেখযোগ্য পরিমাণ প্রাকৃতিক গ্যাস এই প্রণালী দিয়ে পরিবাহিত হয়, যার বড় অংশই এশিয়ায় যায়। বর্তমানে এই সরু জলপথে জাহাজ চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সরবরাহও আটকে পড়েছে।
এ ছাড়া, অঞ্চলের বিভিন্ন দেশে জ্বালানি অবকাঠামোর ওপর ইরানি হামলার কারণে কিছু দেশ উৎপাদন কমাতে বাধ্য হয়েছে।
অন্য খাতেও চাপ
যুদ্ধের প্রভাব অন্য অর্থনৈতিক খাতেও পড়তে শুরু করেছে। কৃষি উৎপাদনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সারসহ বিভিন্ন পণ্যের দামও বাড়তে শুরু করেছে। বৈশ্বিক সার বাণিজ্যের প্রায় এক-তৃতীয়াংশই হরমুজ প্রণালী দিয়ে পরিবাহিত হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, এই সংঘাতের প্রভাব পুরো বৈশ্বিক অর্থনীতিতে ছড়িয়ে পড়তে পারে, বিশেষ করে দরিদ্র দেশগুলো বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
ইতোমধ্যে পাকিস্তান জ্বালানি ভর্তুকি কমানোসহ একাধিক কৃচ্ছ্রসাধন পদক্ষেপ ঘোষণা করেছে। অন্যদিকে বাংলাদেশ যুদ্ধের প্রভাবে জ্বালানি ব্যবহারে বিধিনিষেধ আরোপ এবং বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধের ঘোষণা দিয়েছে।
তেলের মজুত ছাড়ার আলোচনা
জ্বালানি দামের ধাক্কা কমাতে যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ কৌশলগত মজুত তেল বাজারে ছাড়ার সম্ভাবনাও বিবেচনা করছে।
জি–৭ দেশগুলো সোমবার জানায়, জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে তারা প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে। তবে এখনো কৌশলগত মজুত ছাড়ার ঘোষণা দেওয়া হয়নি। এ বিষয়ে আরও আলোচনার জন্য মঙ্গলবার জ্বালানি মন্ত্রীদের বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে।
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত তেলের মজুত রয়েছে প্রায় ৪১৫ মিলিয়ন ব্যারেল, যা বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ রিজার্ভ।
তবে এই মজুত ছাড়ার সিদ্ধান্ত কবে কার্যকর হবে এবং যুদ্ধজনিত ঘাটতি কতটা পূরণ করতে পারবে তা এখনও স্পষ্ট নয়।
যুদ্ধ দীর্ঘ হলে ঝুঁকি বাড়বে
সেন্টার ফর আ নিউ আমেরিকান সিকিউরিটির জ্যেষ্ঠ ফেলো র্যাচেল জিয়েম্বা বলেন, যুদ্ধ দ্রুত শেষ হবে নাকি সপ্তাহ বা মাসজুড়ে চলবে তার ওপরই অনেক কিছু নির্ভর করছে।
তিনি বলেন, যদি যুদ্ধ চলতে থাকে, তাহলে তেলের দাম শুধু উচ্চ পর্যায়েই থাকবে না, বরং আরও বাড়তে পারে।
তবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল কিংবা ইরান কোনো পক্ষই এখনো যুদ্ধ থামানোর ইঙ্গিত দেয়নি। যদিও সোমবার সিবিএস নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প দাবি করেন, যুদ্ধ প্রায় সম্পূর্ণভাবে শেষ হয়ে গেছে যা বাজারে কিছুটা স্থিতি আনতে সহায়তা করেছে।
যুক্তরাষ্ট্রে জনমতের বিরোধিতা
যুক্তরাষ্ট্রে যুদ্ধটি জনপ্রিয় নয় বলেও ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। সোমবার প্রকাশিত কুইনিপিয়াক বিশ্ববিদ্যালয়ের এক জরিপে দেখা গেছে, অংশগ্রহণকারী ভোটারদের ৫৩ শতাংশ ট্রাম্পের ইরানবিরোধী সামরিক পদক্ষেপের বিরোধিতা করেছেন।
বিশেষ করে রাজনৈতিকভাবে নিরপেক্ষ ভোটারদের মধ্যে ৬০ শতাংশই এর বিরোধিতা করেছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধের কারণে যদি জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়তে থাকে এবং ভোটাররা সেটিকে যুদ্ধের সঙ্গে যুক্ত করেন, তাহলে তা ট্রাম্প এবং তার রিপাবলিকান পার্টির জন্য রাজনৈতিকভাবে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
তবে ট্রাম্প নিজে এসব উদ্বেগকে তেমন গুরুত্ব দিচ্ছেন না। রবিবার ট্রুথ সোশ্যাল–এ দেওয়া এক পোস্টে তিনি বলেন, ইরানের পারমাণবিক হুমকি ধ্বংস হলে তেলের দাম দ্রুত কমে যাবে। যুক্তরাষ্ট্র ও বিশ্বের নিরাপত্তা ও শান্তির জন্য এটি খুবই ছোট মূল্য।








