বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর বন্ধু হতে চায় বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর দেশ যুক্তরাষ্ট্র। কী অবাক হচ্ছেন? ওয়াশিংটন পোস্টের ২২ জানুয়ারি প্রকাশিত এক বিশেষ রিপোর্টে অন্তত এমনটাই দাবি করা হয়েছে। প্রথমেই আপনাদের নিয়ে যেতে চাই ওয়াশিংটন পোস্টের প্রতিবেদনটির অন্দরমহলে।
ঢাকায় মার্কিন দূতাবাসে কয়েকজন নারী সাংবাদিকের সঙ্গে একজন কূটনীতিকের বৈঠকের কথোপকথনের ফাঁস হওয়া অডিও রেকর্ড ওয়াশিংটন পোস্টের দিল্লী ব্যুরো প্রধান প্রাণশু ভার্মার দীর্ঘ প্রতিবেদনের মূল খোরাক। পত্রিকাটি তাদের লেখার শিরোনাম করেছে একসময় নিষিদ্ধ থাকা দল জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে বন্ধুত্ব করতে চায় যুক্তরাষ্ট্র। ভারতকে চাপে রাখতেই দেশটির এই কৌশল বলে মনে করছে ওয়াশিংটন পোস্ট। তারা বলছে, ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ইসলামপন্থী দলটি ইতিহাসের সেরা ফল করতে যাচ্ছে এমন প্রেক্ষাপটে মার্কিন কূটনীতিকরা দলটির সঙ্গে যোগাযোগ বৃদ্ধিতে আগ্রহী।
৫ আগস্ট শেখ হাসিনার পতনের পর পরিবর্তিত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ইসলামপন্থী দলগুলো বেশ গুরুত্বপূর্ন হয়ে উঠেছে মার্কিন কূটনীতিকদের কাছে। ১লা ডিসেম্বরের ঐ বৈঠকে মার্কিন কূটনীতিক নারী সাংবাদিকদের বলেন, আমরা চাই তারা আমাদের বন্ধু হোক। এমনকি তিনি সাংবাদিকদের কাছে জানতে চান, জামায়াতে ইসলামীর ছাত্রসংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবিরের নেতারা, বিশেষ করে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংসদ নির্বাচনে বিজয়ীদের সঙ্গে তারা কথা বলতে পারেন কিনা কিংবা ডাকলে তাদের শোতে আসবেন কিনা? নিরাপত্তা বিবেচনায় ওয়াশিংটন পোস্ট ঐ কূটনীতিকের নাম প্রকাশ করে নাই। জামায়াত ক্ষমতায় গেলে শরীয়াহ আইন কার্যকর করবে সাংবাদিকদের এমন শংকা নাকচ করে ঐ কূটনীতিক বলেন, এমন কিছু হলে পরদিনই যুক্তরাষ্ট্র তাদের ওপর ১০০শতাংশ শুল্ক আরোপ করবে। এ বিষয়ে ঢাকাস্থ মার্কিন দূতাবাসের মূখপাত্র মনিকা শাই ওয়াশিংটন পোস্টকে বলেছেন, ডিসেম্বর মাসের ঐ বৈঠকটি দূতাবাসের কর্মকর্তাদের সঙ্গে স্থানীয় সাংবাদিকদের নিয়মিত অফ দ্য রেকর্ড আলোচনা।
তিনি বলেন, সেখানে আরো রাজনৈতিক দলের কথা আসে আলোচনায়। আর সবচে বড় কথা হল, যুক্তরাষ্ট্র কোন একটি দলকে বিশেষ অগ্রাধিকার দেয়না, বরং ভোটে নির্বাচিত যেকোন দলের সঙ্গে কাজ করবে তার সরকার।
বিষয়টির সুদূরপ্রসারী প্রভাব নিয়ে জানতে ওয়াশিংটন পোস্ট আটলান্টিক কাউন্সিলের দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক জ্যেষ্ঠ ফেলো মাইকেল কুগেলম্যানের সঙ্গে কথা বলেছে। তার মতে ভূ-রাজনৈতিক বেশ কিছু কারণে ভারতের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক তলানিতে। বাংলাদেশ নিয়ে ভারতের বড় ভয়ের জায়গা জামায়াতের উত্থান, কারণ দলটি পাকিস্তানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ এবং এটা আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য হুমকি। অবশ্য ঢাকায় মার্কিন দূতাবাসের মুখপাত্র মনিকা সাই তার বিবৃতিতে বলেছেন, বাংলাদেশের নির্বাচন যুক্তরাষ্ট্র-ভারত সম্পর্কে উল্ল্যেখযোগ্য কোন প্রভাব ফেলবে না। ঢাকা-দিল্লী সম্পর্ক নিজ নিজ ভিত্তির ওপর দাড়িয়ে আছে।
জামায়াতে ইসলামী কেন এভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠল সেই বিষয়ে পত্রিকাটি বলছে, স্বাধীনতার পর আওয়ামী লীগ, বিএনপির নেতৃত্বাধীন সরকার, সামরিক ক্যু, অভ্যুত্থান, দীর্ঘ স্বৈরশাসন দেখেছে বাংলাদেশের মানুষ। ২০০৯ থেকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণঅভ্যত্থানে শেখ হাসিনার পালিয়ে যাওয়ার আগ পর্যন্ত জামায়াত ইসলামীর নেতা-কর্মীরা জেল-জুলুম, অত্যাচারের শিকার হয়েছেন। রাজনীতি নিষিদ্ধ থাকায় দলটি অত্যন্ত কৌশলে সাংগঠনিক শক্তি বাড়িয়েছে। দলটির একজন মুখপাত্র মোহাম্মদ রহমানের বরাত দিয়ে পত্রিকাটি বলেছে, নারীদের কর্মঘন্টা কমানোর বিষয়টি এখনো প্রাথমিক পর্যায়ের আলোচনায় আছে, তবে শরিয়াহ আইন বাস্তবায়নের কোন পরিকল্পনা নাই তার দলের। বার্তাসংস্থা রয়টার্সের সঙ্গে এমাসেই জামায়াত আমীর ডা: শফিকুর রহমানের এক সাক্ষাৎকারের চুম্বক অংশ উল্ল্যেখ আছে রিপোর্টে যেখানে তিনি বলেছেন, দলগুলো এক হলে আমরা একসঙ্গে সরকার চালাব। ২০০১ থেকে ২০০৬ সময়কালে ৪ দলীয় জোটে বিএনপির নেতৃত্বাধীন সরকারের অন্যতম শরীক ছিল জামায়াতে ইসলামী। সেসময় মতিউর রহমান নিজামী এবং আলী আহসান মুজাহিদ গুরুত্বপূর্ণ ২ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে ছিলেন।
শেখ হাসিনার পতনের পর এ পর্যন্ত জামায়াতে ইসলামীর শীর্ষনেতারা ঢাকা এবং যুক্তরাষ্ট্রে মার্কিন কর্মকর্তাদের সঙ্গে একাধিক বৈঠক করেছে বলে ওয়াশিংটন পোস্টকে জানিয়েছেন দলটির মুখপাত্র মোহাম্মদ রহমান। এমনকি গত আগস্টে ভারতের একজন জ্যেষ্ঠ কূটনীতিক জামায়াতের আমীরের সঙ্গে দেখা করেছেন। ১লা ডিসেম্বর মার্কিন দূতাবাসে নারী সাংবাদিকদের বৈঠকে ঐ কূটনীতিক জানান, জামায়াতে ইসলামীর পাশাপাশি হেফাজতে ইসলামসহ অন্য ধর্মভিত্তিক দলগুলোর সঙ্গে যোগাযোগের কথা ভাবছেন তারা।
জামায়াত ইসলামী ক্ষমতায় এসে যদি মার্কিনীদের অপছন্দের কোন পদক্ষেপ নেয় তবে গার্মেন্টস রপ্তানীতে শুল্ক বসিয়ে শায়েস্তা করার কৌশলের কথাও বলেন যুক্তরাষ্ট্রের ঐ কূটনীতিক। তিনি বলেন, শরীয়াহ আইন কিংবা নারীদের কর্মঘন্টা কমিয়ে ৫ ঘন্টা বা তাদের শ্রমশক্তি থেকে বাদ দেওয়ার মত কিছু চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে তবে যুক্তরাষ্ট্র কোন পোশাক কিনবেনা। তাহলে বাংলাদেশের অর্থনীতি টিকতে পারবেনা বলে মন্তব্য করেন তিনি। অবশ্য শেষ পর্যন্ত জামায়াতে ইসলামী এমন কিছু করবেনা বলে আত্মবিশ্বাসী তিনি। কারণ দলটিতে বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া স্মার্ট লোকজন আছে। ফাস হওয়া অডিও ক্লিপটিতে নারী সাংবাদিকদের সঙ্গে কথোপকথনের এক পর্যায়ে মার্কিন কূটনীতিক বলেন, আমরা জামায়াতের সঙ্গে এমন বন্ধুত্ব চাই যেন ফোন করে বলতে পারি, আপনারা যেটা বলছেন বা করতে যাচ্ছেন তাতে আমাদের সায় নাই কিংবা তার ফলাফল এরকম হতে পারে।
জাতীয় সংসদের ১৩তম নির্বাচনের ঠিক ৩ সপ্তাহ আগে বহুল প্রচারিত প্রভাবশালী গণমাধ্যমের এমন রিপোর্টের পর অনেেেকই হয়তো নড়েচড়ে বসেছেন। নানারকম সমীকরণ মেলাতে শুরু করেছেন। তবে একটু চোখ কান খোলা রাখা পাঠক এবং শ্রোতার জন্য বিষয়টা বোধ করি অতো রোমাঞ্চকর নাও হতে পারে। ধর্মভিত্তিক রাজনীতিক দল কিংবা সংগঠনকে পৃষ্ঠপোষকতা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য নতুন কিছু নয়। দক্ষিণ এশিয়ার দেশ আফগানিস্তানে তালেবান সরকারের সঙ্গে দেশটির সখ্যতার কথা মনে করতে পারেন নিশ্চয়ই। অবশ্য অন্য যেকোন সময়ের চেয়ে আগামী নির্বাচনে জমায়াতে ইসলামী ভালো করবে এমন দাবী করে আসছেন দলটির শীর্ষ নেতৃত্ব। এটা নিয়ে কোন সন্দেহের অবকাশও থাকার কথা নয়। পশ্চিমা কয়েকটি দেশ বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যে এবার জামায়াতে ইসলামীকে নির্বাচনে খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভাবছে তা বাংলাদেশের কয়েকজন অর্থনীতিবিদের সঙ্গে দেশটির কূটনীতিকদের মধ্যাহ্ন কিংবা নৈশভোজ সভার আলাপ থেকে আমিও জেনেছি।








