সত্তর ও আশির দশকে প্লেব্যাক সিঙ্গার হিসেবে অসম্ভব খ্যাতি পেয়েছিলেন প্রখ্যাত কণ্ঠশিল্পী, আমাদের সবার প্রিয় আবিদা সুলতানা। রুনা লায়লা ও সাবিনা ইয়াসমিনের গাওয়া জনপ্রিয় সব গানের ভীড়ে তিনিও উল্লেখযোগ্য সংখ্যাক মেলোডিয়াস গান গেয়ে শ্রোতাদের হ্নদয় জয় করেছিলেন।
আর তাইতো রেডিওর ‘অনুরোধের আসর’, ‘বিজ্ঞাপন তরঙ্গ’ বা সৈনিক ভাইদের অনুষ্ঠান ‘দুর্বার’-এ আবিদা সুলতানার গাওয়া গানের মধুময় সুরের প্রতিধ্বণি শোনা যেত। আবিদা সুলতানার যে সব কালজয়ী গান রয়েছে তাঁর মধ্যে প্রয়াত কিংবদন্তি সুরকার সুবল দাসের সুরের দুটি গান বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য এবং দুটি গানই সিনেমার। গত চার যুগেও এ দুটি গানের জনপ্রিয়তায় বিন্দুমাত্র ছেদ পড়েনি। উল্টো দিন যতই যাচ্ছে ততই গান দুটির জনপ্রিয়তা আরও বেড়ে চলেছে।
এই দুটি গানের মধ্যে প্রথমেই বলতে হয় ‘আমি সাতসাগর পাড়ি দিয়ে কেন সৈকতে পরে আছি’ এই গানটির কথা। গাজী মাজহারুল আনোয়ারের লেখা এই গানটি ‘আলো তুমি আলেয়া’ ছবিতে লিপ করেন ইন্ট্যারন্যাশনাল ট্যালেন্ট খ্যাত নায়িকা ববিতা। দরদি সুরের এই গানটি এখনও আগের মতোই প্রাণবন্ত ও সজীব হয়ে আছে। এই গানের সুর এখনও সব শ্রেণীর শ্রোতা হ্নদয়ে অন্যরকম অনুরণন তুলে।
আবিদা সুলতানা জানিয়েছেন, এই গানটি যখন করেন তিনি তখন একেবারেই তরুণী। বিয়েও করেননি। সুরকার সুবল দাসের সুরে এটিই ছিল তাঁর প্রথম প্লেব্যাক। তিনি জানান, এই গানটি রেকর্ড হয় ১৯৭৪ সালে এফডিসির স্টুডিওতে। প্রথমে গানটি রেকর্ড হয় পুরুষ কণ্ঠে। প্রখ্যাত প্রয়াত শিল্পী মাহমুদ উন নবী গানটিতে কণ্ঠ দেন। ফলে গানটি নিয়ে তিনি ভীষণ সংশয়ে ছিলেন। কেননা মাহমুদ উন নবীর পরে এই গানটি কেমন লাগে এই দ্বিধায়। এরপর নির্দিষ্ট তারিখে সুরকার সুবল দাসের নির্দেশনায় তাঁর কণ্ঠে গানটি রেকর্ড হয়। পরিচালক দিলীপ সোম পরিচালিত এই ছবিটি মুিক্ত লাভ করে ১৯৭৫ সালের ১১ এপ্রিল। এই গানের কারণেই ‘আলো তুমি আলেয়া’ সিনেমাটির নাম সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে। দীর্ঘ ৫০ বছর পেরিয়ে আসার পরও এই গানটির জনপ্রিয়তা কমেনি। বরং আরও বেড়েছে বললে ভুল হবে না। আশির দশকে লং প্লে’র যুগে ‘আলো তুমি আলেয়া’ ছবির এই গানটির কদর দেখা যেত বিয়ে বাড়ি বা সামাজিক অনুষ্ঠানে। মাইকে গানটি বাজতো। গানটির বিপুল জনপ্রিয়তা এখনও তুঙ্গে। নতুন প্রজন্মের শিল্পীরাও এই গানটি গাইতে ভালোবাসে। আবিদা সুলতানা নিজেও টেলিভিশন চ্যানেলে এই গানটি নিয়মিত পরিবেশন করে থাকেন।
আবিদা সুলতানার কণ্ঠে সুবল দাসের সুরের আরেকটি প্রখ্যাত গান দিলীপ সোম পরিচালিত ‘তালুকদার ছবিতে ‘একী বাঁধনে বলো জড়ালে আমায়, ভাবি যতবার মরি লজ্জায়।’ মায়াবী সুরের মূর্চ্ছনায় এ গানটি এক কথায় অনন্য এবং অনবদ্য। ‘তালুকদার’ ছবিতে এই গানটি লেখেন প্রখ্যাত প্রয়াত গীতিকার মাসুদ করীম। ‘তালুকদার’ ছবিটি মুক্তি লাভ করে ১৯৮৬ সালের ১৪ এপ্রিল। ‘তালুকদার’ ছবিতে এ গানটিতেও লিপ করেন প্রখ্যাত অভিনেত্রী ববিতা। এই গানের সুর এখনও ভীষণ রকম সজীব। গানটি বাজলেই শ্রোতাদের মাঝে অন্যরকম অনুভূতি তৈরি হয়। বলা যায় যে সব সিনেমার গান তিনপ্রজন্মের হ্নদয় জয় করতে সক্ষম এই গানটি তার মধ্যে অন্যতম। সময়ের হিসেবে এই গানটির বয়স এখন ৪১ বছর। কিন্তু গানটি আগের মতোই সুরের মাধুরী ছড়িয়ে আছে। বিগত দিনে বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেলে গানের প্রতিযোগিতামূলক অনুষ্ঠানেও দেখা গেছে শিল্পীদের এই গানটি বেশি গাইতে।
ইউটিউবে আপলোডকৃত এই গানের কমেন্ট সেকশনে শ্রোতাদের নানানরকম অনুভূতির অনুরণন পাওয়া যায়। ইউটিউবে ‘মুভি মিউজিক’ কর্তৃক আপলোডকৃত গানে মো. চয়ন নামে এক শ্রোতা লিখেছেন,‘ আমি মনে করি এই গানের জন্য আবিদাকে পাঁচ হাজার কোটি টাকা দেওয়া উচিত।’ আসলে এই গানটি এই শ্রোতার ভেতরটা এতোটাই স্পর্শ করেছে যে সে এমন আবেগ ব্যক্ত করেছে। তবে সত্যটা হলো আমাদের বাংলা আধুনিক গানে এই গানটি এক অমূল্য রত্ন, হীরের টুকরো। মায়াবী সুর আর আবিদা সুলতানার কণ্ঠের অনন্যতায় অবিস্মরণীয় হয়ে আছে এই গান। আসলেই শিল্পী আবিদা সুলতানাকে মানুষের হ্নদয় মন্দিরে বাঁচিয়ে রাখবে এই গান।
আবিদা সুলতানা জানিয়েছেন, সামাজিক অনুষ্ঠান থেকে স্টেজ শো—তিনি যেখানেই যান সেখানেই এ দু’টি গান গাওয়ার অনুরোধ পান। আর হারমোনিয়ামের রিডে আঙুল রেখে যখন এ গান গাইতে শুরু করেন তিনি নিজেও ভীষণ আবেগপ্রবণ হয়ে ওঠেন। এ দুটি গানের মাঝে কী মনিমুক্তো লুকিয়ে আছে তিনি নিজেও তা আজও আবিস্কার করতে পারেননি। তবে দুটি গানে অফুরন্ত আবেগ আছে বলেই এখনও শ্রোতারা এ গান শুনে বিমোহিত হন বলে তিনি মনে করেন। গান দুটি তিনি নিজেও কয়েক শতবার পরিবেশন করেছেন।
প্রখ্যাত সুরকার সুবল দাসের ২৪তম মৃত্যৃবার্ষিকীতে (১৬ আগস্ট) তাঁকে স্মরণে এনে এই দুটি গানের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, ‘সুবল দা ছিলেন বড় মনের অনবদ্য এক সুরকার। তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতার শেষ নেই। তিনি বরাবরই গানে অন্যরকম এক মায়ায় সুর তুলে দিতে পারতেন। গাজী ভাই এবং মাসুদ করীম ভাই এর লেখা এ দুটি গানেও তাই করেছিলেন। আর তাই এ দুটি গান সময়কে জয় করে এখনও সামনে এগিয়ে আছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘সঙ্গীত জগতে কতো কী ধারা এসেছে, পরিবর্তন এসেছে, কিন্তু শ্রদ্ধেয় সুবল দাসের সুরে আমার এ দুটি গান সবার কাছে আগের মতোই প্রাণবন্ত, আগের মতোই সতেজ। সবচেয়ে বড় কথা তিন প্রজন্মই আমার দুটি গান ভীষণ খুব পছন্দ করে। প্রবীণ থেকে নবীণ কেউ বাদ দিই নেই। একজন শিল্পী হিসেবে জীবনে এর চেয়ে বড় প্রাপ্তি আর হতে পারে না। শ্রদ্ধেয় সুবলদা’র আত্মা শান্তিতে থাকুক এই কামনা করি।’
(এই বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)








