২০০৫ সালের সিরিজ বোমা হামলার ঘটনার যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত জঙ্গি তুহিন রেজা দীর্ঘ ১৮ বছর ধরে পলাতক জীবন যাপন করছিলেন। পলাতক জীবনে জীবিকা নির্বাহের জন্য বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ভিডিও এডিটর হিসেবে কাজ করেন জঙ্গি তুহিন।
র্যাব-৩ জানায়, তুহিন রেজা নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠন জামায়াতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ (জেএমবি) এর সদস্য। বিগত ২০০৫ সালের সিরিজ বোমা হামলায় সারাদেশের মতই ঝিনাইদহ জেলার ডিসি অফিস, জজ কোর্ট ও পায়রা বন্দরসহ কয়েকটি এলাকায় হামলা হয়। সেই হামলার সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত তুহিন রেজাকে যাবজ্জীবন সাজা দেন আদালত।
সর্বশেষ গোয়েন্দা নজরদারির ভিত্তিতে বৃহস্পতিবার রাতে রাজধানীর তেজগাঁও রেলগেইট এলাকা থেকে জঙ্গি তুহিনকে গ্রেপ্তার করে র্যাব-৩।
শুক্রবার ২৩ জুন রাজধানীর কারওয়ান বাজারে অবস্থিত র্যাব মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান র্যাব-৩ এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল আরিফ মহিউদ্দিন আহমেদ।
কর্নেল আরিফ মহিউদ্দিন আহমেদ জানান, সিরিজ বোমা বিস্ফোরনের প্রকৃত রহস্য উদঘাটনসহ অপরাধীদের চিহ্নিত করার লক্ষ্যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দ্রুততার সঙ্গে তদন্ত শুরু করে। এরই ধারাবাহিকতায় ২০০৫ সালে বিস্ফোরনের ঘটনায় ঝিনাইদহ সদর থানায় অজ্ঞাতনামা জড়িতদের বিরুদ্ধে বিস্ফোরক দ্রব্য আইনে একটি মামলা দায়ের করা হয়। মামলাটির তদন্তে হামলার সঙ্গে জেএমবির সদস্যরা জড়িত প্রমাণিত হয়। ঝিনাইদহের হামলার সঙ্গে মোট ২১ জন জড়িত উল্লেখ করে ২০০৫ সালের নভেম্বর মাসে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন তদন্তকারী কর্মকর্তা।
তিনি আরও জানান, মামলাটির বিচার শেষে অভিযুক্ত ২১ জনের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ রাষ্ট্রপক্ষ সন্দেহাতীত ভাবে প্রমাণ করতে সক্ষম হয় আদালতে। অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় আদালত অভিযুক্ত ২১ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেন। কিন্তু আসামিরা মৃত্যুদণ্ডাদেশের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপিল করে। পরে বিগত ২০০৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে উচ্চ আদালত ২১ জনের মধ্যে ১৪ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডসহ ৫০ হাজার টাকা করে অর্থদণ্ড দেন। এছাড়া বাকি ৭ জনকে খালাস দেন উচ্চ আদালত।
আদালতের রায়ের পর সাজাপ্রাপ্ত পলাতক আসামিদের গ্রেপ্তার আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী তৎপরতা চালানো শুরু করে। এরই প্রেক্ষিতে সাজাপ্রাপ্ত ১৪ জন আসামির মধ্যে ১২ জন আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়। বাকি পলাতক দুই আসামির মধ্যে জঙ্গি তুহিন একজন। দীর্ঘ গোয়েন্দা নজরদারির ভিত্তিতে জঙ্গি তুহিনকে গতকাল তেজগাঁও রেলগেইট এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
গ্রেপ্তার জঙ্গি তুহিনকে জিজ্ঞাসাবাদের ভিত্তিতে র্যাব-৩ এর অধিনায়ক বলেন, বিগত ২০০৪ সালে জেএমবি’র ঝিনাইদহ সদর শাখায় সদস্য হিসেবে যোগদান করে তুহিন। যোগদানের পর থেকে সে এই শাখার লিফলেট তৈরি, লিখিত প্রচার-প্রচারণার সম্পাদনা, গোপন ও নাশকতমূলক খবরা-খবর আদান-প্রদান করতো। এছাড়া বিভিন্ন ভিডিও এডিটিংয়ের মাধ্যমে তৈরি করা বিভ্রান্তিমূলক প্রামাণ্যচিত্র দ্বারা তরুণদের পথভ্রষ্ট করত।
বিগত ২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট হামলাকে কেন্দ্র করে দীর্ঘ সময় ধরে তারা হামলার নীলনকশা সাজায়। পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী ১৭ আগস্ট ভোর থেকে অন্যান্য হামলাকারীদের সাথে তুহিন আদালত চত্বরের আশেপাশে অবস্থান নেয় এবং হামলার সময় সক্রিয় ভূমিকা পালন করে। এলোপাথাড়ি বোমা হামলার পর তারা বিভিন্ন দিকে দৌড়ে পালিয়ে যায়।
তিনি আরও বলেন, তুহিন বোমা হামলার পর ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে এসে ঝিনাইদহ সদরে জঙ্গি ক্যাম্পে কিছুদিন গা-ঢাকা দিয়ে থাকে। এরপর এ ঘটনায় মামলা হলে এবং গ্রেপ্তারী পরোয়ানা জারি হলে জঙ্গি তুহিন ঝিনাইদহ থেকে পালিয়ে ঢাকায় চলে আসে। এখানে সে প্রথমে যাত্রাবাড়ী পরবর্তীতে খিলগাঁও, উত্তরা, মহাখালীসহ বিভিন্ন জায়গায় স্থান পরিবর্তন করে বসবাস করে। তুহিন গ্রেপ্তার এড়াতে বিভিন্ন সময় বাসা পরিবর্তন করে ভিন্ন ভিন্ন জায়গায় বসবাস শুরু করে। ২০২১ সাল থেকে সে তেজগাঁও এলাকায় একটি বাসা ভাড়া নিয়ে বসবাস করতে থাকে এবং সেখান থেকেই গোপন সংবাদের ভিত্তিতে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। পলাতক অবস্থায় সে বেসরকারী প্রতিষ্ঠানে ভিডিও ডিটিংসহ বিভিন্ন সফট্ওয়্যার ভিত্তিক কাজের মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করত।
গ্রেপ্তারের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন বলেও তিনি জানান।








