যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার এল মন্টে শহরের এক ছোট্ট বাড়িতে এখন শুধুই নিস্তব্ধতা। যে ঘরে একসময় মায়ের ভালোবাসায় মুখরিত ছিল, সেখানে আজ অঝোরে কাঁদছে সিতলালি। বয়স মাত্র ১৬, অথচ জীবন তাকে এমন এক বাস্তবতার সামনে দাঁড় করিয়েছে, যেখানে সে কেবলই হারিয়ে ফেলছে প্রিয়জনদের।
সংবাদমাধ্যম এনবিসি এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে।
সিতলালির শরীর দুর্বল, কারণ সে লড়াই করছে বোন-ক্যান্সারের সঙ্গে। কিন্তু তার চেয়েও বড় যুদ্ধটা এখন শুরু হয়েছে—তার মা ইয়োলান্ডাকে কেড়ে নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষ (আইসিই)।
গত বৃহস্পতিবার সকালে, অপ্রত্যাশিতভাবে আইসিই-এর কর্মকর্তারা সিতলালির মা ইয়োলান্ডা (৫০) এবং তার ভাই জনাথনকে তাদের বাড়ি থেকে আটক করে। মা আর ছেলের কান্না, প্রতিবাদ, আত্মীয়-স্বজনদের অনুরোধ—কোনো কিছুই তাদের মুক্তি দিতে পারেনি।
সিতলালি তখন মায়ের হাত ধরে কাঁদছিল। সে বলছিল, “মা, তুমি তো কিছু ভুল করোনি!” কিন্তু মায়ের চোখে শুধু ছিল আতঙ্ক আর অসহায়ত্ব।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার দ্বিতীয় দফায় ক্ষমতায় আসার পর থেকেই অবৈধ অভিবাসীদের বিরুদ্ধে কঠোর অভিযান শুরু করেছেন। তিনি আইসিই-কে আরও বেশি ক্ষমতা দিয়েছেন, যাতে অবৈধ অভিবাসীদের দ্রুত খুঁজে বের করে নির্বাসন দেয়া যায়।
গত কয়েক মাস ধরে যুক্তরাষ্ট্রে শত শত অভিবাসী পরিবার থেকে মা-বাবাকে আলাদা করে দেওয়া হচ্ছে। এর পেছনে ট্রাম্প প্রশাসনের যুক্তি, “অবৈধ অভিবাসীরা দেশের জন্য হুমকি”।
কিন্তু ইয়োলান্ডার গল্প একেবারেই ভিন্ন। তিনি কোনো অপরাধ করেননি, কারও ক্ষতি করেননি। শুধু মেয়ের জীবন বাঁচানোর জন্য, ভালো থাকার জন্য তিনি এই দেশে ছিলেন। আর তার ছেলে জনাথন, যে এক দশক আগের এক মামলায় সাজা খেটেছে, তাকেও টেনে নেয়া হলো এই দমননীতির শিকার হিসেবে।
ক্যান্সারে আক্রান্ত সিতলালি এখন ভীষণ একা। কেমোথেরাপির পর তার শরীর এতটাই দুর্বল হয়ে পড়ে যে সে নিজে থেকে কিছুই করতে পারে না। তার মা-ই তাকে গোসল করিয়ে দিতেন, খাবার বানিয়ে খাইয়ে দিতেন, সারাক্ষণ আগলে রাখতেন।
কিন্তু এখন সে একা। “আমি ঘুম থেকে উঠতে পারি না। হাঁটতে পারি না। আমার মা-ই সব করত। এখন কীভাবে চলব?”—বলে কেঁদে ওঠে সিতলালি।
আর জনাথন ছিল পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। তার উপার্জনেই চলত বাড়ির খরচ, চিকিৎসা ব্যয়। এখন সে বন্দী, তার ভবিষ্যৎ অন্ধকার।
আইসিই কর্মকর্তারা যখন ইয়োলান্ডাকে ধরে নিয়ে যাচ্ছিলেন, তখন তার সন্তানরা বারবার তাদের কাছে ডিটেনশন ওয়ারেন্ট দেখতে চেয়েছিল। কিন্তু কোনো উত্তর মেলেনি। এক মুহূর্তের মধ্যেই তারা মাকে ছিনিয়ে নিয়ে গেল।
সিতলালি বলছিল, “আমার মা কি চোর? ডাকাত? তিনি তো শুধু আমার মা!” এমন অনেক ইয়োলান্ডা, অনেক জনাথন যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন বন্দিশিবিরে আটকে আছেন, শুধু এই কঠোর নীতির কারণে।
আইনজীবী ডেভিড আকালিন বলছেন, মানবিক কারণে আইসিই চাইলে ইয়োলান্ডাকে আইনি লড়াইয়ের সুযোগ দিতে পারে। কিন্তু সেটি শতভাগ নিশ্চিত নয়।
এই মুহূর্তে সিতলালির একমাত্র ভরসা হলো—তার বন্ধু এবং শুভাকাঙ্ক্ষীদের সহায়তায় অনলাইনে তহবিল সংগ্রহ করা, যাতে তারা আইনি লড়াই চালিয়ে যেতে পারে।
একটি পরিবার ভেঙে যাচ্ছে। একটি কিশোরী তার ক্যান্সারের বিরুদ্ধে লড়াই করছে, অথচ তার পাশে থাকার মতো কেউ নেই। যে মা একসময় মেয়ের জীবন রক্ষা করতেন, আজ তিনি নিজেই বন্দী।
এই ঘটনা শুধু সিতলালির পরিবার নয়, যুক্তরাষ্ট্রের হাজারো অভিবাসী পরিবারের জন্য এক করুণ বাস্তবতা।
এই কঠোর আইন, এই নির্মম বাস্তবতা কি সত্যিই দরকার? মানবিকতা কি রাজনীতির ঊর্ধ্বে থাকতে পারে না?
সিতলালির সেই প্রশ্ন আজো বাতাসে ভাসছে, “আমার মা তো কিছুই করেনি, তাহলে কেন তাকে নিয়ে গেল?”








