যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপ্রধান ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন ইরানকে একটি সর্বাত্মক যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে ঠেলে দিচ্ছেন, তখন তার নিজ প্রশাসনের উপদেষ্টারাই চরম উৎকণ্ঠায় দিন পার করছেন। আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে এমন সামরিক উত্তেজনা ট্রাম্প এবং তার দল রিপাবলিকান পার্টির জন্য বড় ধরনের রাজনৈতিক বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
ভোটারদের মূল মনোযোগ যখন দৈনন্দিন অর্থনৈতিক সংকটের দিকে, তখন নতুন করে যুদ্ধের দামামা বাজানোকে আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখছেন অনেকেই।
গত কয়েক সপ্তাহ ধরে মধ্যপ্রাচ্যে নজিরবিহীন সামরিক সমাবেশ ঘটিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান, বিমানবাহী রণতরী ও বিপুলসংখ্যক সেনা মোতায়েন করে ইরানের ওপর যেকোনো মুহূর্তে বিমান হামলার প্রস্তুতি চূড়ান্ত করে রাখা হয়েছে। শুধু এই প্রস্তুতির পেছনেই প্রতিদিন যুক্তরাষ্ট্রের কোষাগার থেকে গড়ে দেড় থেকে দুই কোটি ডলার বা প্রায় দুই শ কোটি টাকা খরচ হচ্ছে।
কিন্তু ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর কেন সবচেয়ে বড় এই সামরিক সংঘাতের দিকে যুক্তরাষ্ট্রকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, তার কোনো সুনির্দিষ্ট ও বিশ্বাসযোগ্য ব্যাখ্যা এখনো জনগণের সামনে তুলে ধরতে পারেনি ট্রাম্প প্রশাসন। ২০০৩ সালে ইরাক আক্রমণের আগে তৎকালীন বুশ প্রশাসন যেভাবে তথ্যপ্রমাণ হাজির করার চেষ্টা করেছিল, এবার তার ছিটেফোঁটাও নেই। কখনো বলা হচ্ছে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির কথা, কখনো সরকার পরিবর্তনের কথা, আবার কখনো দেশটির অভ্যন্তরীণ বিক্ষোভ দমনের অজুহাত দেওয়া হচ্ছে। এই অস্পষ্টতা সাধারণ মার্কিন নাগরিকদের মনে চরম সন্দেহের জন্ম দিয়েছে।
ইরান ইস্যুর বাইরেও গত কয়েক মাসে বেশ কিছু বিতর্কিত ও অপরিণামদর্শী সিদ্ধান্তের কারণে চরম সমালোচনার মুখে পড়েছেন ট্রাম্প। বিশেষ করে অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি সামাল দেওয়ার ক্ষেত্রে তার প্রশাসনের চরম ব্যর্থতা জনমনে ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করতে না পারা, আবাসন সংকট এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় ওষুধের দাম কমানোর প্রতিশ্রুতি পূরণে চরম ব্যর্থতার কারণে সাধারণ ভোটাররা এমনিতেই ক্ষুব্ধ।
এর ওপর সম্প্রতি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে আকস্মিক ও খামখেয়ালিভাবে বন্ধুপ্রতিম দেশগুলোর ওপরও অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বাজার আরও অস্থিতিশীল হয়ে পড়েছে। গত মাসে ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে ক্ষমতাচ্যুত করার একটি ঝটিকা অভিযান চালিয়ে ট্রাম্প তার কট্টর সমর্থকদের কিছুটা সন্তুষ্ট করতে পারলেও, ইরান সম্পূর্ণ ভিন্ন এক হিসাব। ভেনিজুয়েলার মতো দুর্বল প্রতিপক্ষের সঙ্গে ইরানের সামরিক সক্ষমতা ও ভৌগোলিক অবস্থানের কোনো তুলনাই চলে না।
জনমত জরিপগুলো বলছে, সাধারণ মার্কিন নাগরিকদের কাছে এখন সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার হলো জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো।
হোয়াইট হাউসের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, ইরানে হামলার বিষয়ে প্রশাসনের ভেতরেই তীব্র মতভেদ রয়েছে। উপদেষ্টাদের ভয়, দোদুল্যমান ভোটাররা যখন সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছেন, তখন বিদেশে হাজার কোটি টাকা উড়িয়ে নতুন যুদ্ধ শুরুর খবর তাদের পুরোপুরি রিপাবলিকানদের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে বাধ্য করবে।

দলীয় নীতিনির্ধারকেরা মনে করছেন, ট্রাম্পের মূল সমর্থক গোষ্ঠী বিদেশের মাটিতে ‘অন্তহীন যুদ্ধ’ বা দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতের ঘোর বিরোধী। কারণ, বিদেশে মার্কিন অর্থ ও সেনার অপচয় বন্ধ করাই ছিল ট্রাম্পের অন্যতম প্রধান নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি। এখন সেই অবস্থান থেকে সরে এসে ইরানের মতো শক্তিশালী সামরিক বাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধে জড়ালে খোদ নিজ দলের ভেতরেই বড় ধরনের বিদ্রোহ দেখা দিতে পারে।
ইরান এরই মধ্যে কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে রেখেছে যে, তাদের ওপর কোনো ধরনের হামলা হলে মধ্যপ্রাচ্যে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিটি সামরিক ঘাঁটি ‘বৈধ লক্ষ্যবস্তু’ হিসেবে পরিগণিত হবে এবং সেখানে তীব্র পাল্টা আঘাত হানা হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, ভোটাররা কেবল তখনই এমন সামরিক পদক্ষেপ মেনে নিতে পারে, যদি তা খুব দ্রুত শেষ হয় এবং চূড়ান্ত সাফল্য আসে। কিন্তু ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ কোনোভাবেই স্বল্পমেয়াদি হবে না, বরং এটি আফগানিস্তান বা ইরাকের মতো আরেকটি দীর্ঘ, ব্যয়বহুল ও রক্তক্ষয়ী চোরাবালিতে পরিণত হওয়ার প্রবল আশঙ্কা রয়েছে।
আগামী নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে নির্ধারিত হবে মার্কিন আইনসভার (কংগ্রেস) নিয়ন্ত্রণ কাদের হাতে থাকবে। ডেমোক্র্যাটরা যদি আইনসভার উচ্চকক্ষ বা নিম্নকক্ষের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পায়, তবে ট্রাম্পের মেয়াদের বাকি সময় চরম প্রশাসনিক পক্ষাঘাতের মুখে পড়বে।
সব মিলিয়ে ট্রাম্প এখন এমন এক উভয় সংকটে আটকা পড়েছেন, যেখান থেকে ফেরা বেশ কঠিন। ইরান যদি নিজেদের অবস্থান থেকে সরে না আসে এবং ট্রাম্প যদি শেষ মুহূর্তে হামলা থেকে পিছিয়ে যান, তবে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তাকে ‘দুর্বল’ ভাবা হবে।
অন্যদিকে, হামলা চালালে দেশের ভেতরে অর্থনীতিতে ধস নামবে এবং আসন্ন নির্বাচনে ভরাডুবির ঝুঁকি তৈরি হবে। এই খাদের কিনারায় দাঁড়িয়ে নেওয়া চূড়ান্ত সিদ্ধান্তই এখন নির্ধারণ করে দেবে মার্কিন রাজনীতির আগামী দিনের ভবিষ্যৎ।








