নেপালের নাম উচ্চারিত হলেই চোখে ভেসে ওঠে পাহাড়ে ঘেরা শহর, ঘণ্টাধ্বনির মতো বেজে ওঠা হাওয়া, আর মেঘে হারিয়ে যাওয়া তুষারচূড়া। নেপালের সৌন্দর্যের কেন্দ্রে যদি কারও নাম উঠে আসে, তা নিঃসন্দেহে—পোখরা। শান্ত, স্বপ্নময়, অথচ অদ্ভুত পরিমাণে জীবন্ত এই শহরটি আমার কাছে কেবল একটি ভ্রমণস্থান নয়—এ যেন আত্মার প্রশান্তির এক লুকানো আস্তানা।
এই ভ্রমণকাহিনি সেই অভিজ্ঞতারই গল্প—যেখানে যাত্রাপথ, মানুষ, পাহাড়, হ্রদ, আলো, নির্মল বাতাস আর সবুজ প্রকৃতির সৌন্দর্য মিলেমিশে তৈরি করেছে এক অমলিন স্মৃতি।
যাত্রা: ‘কাঠমান্ডু থেকে পোখরা’
আমরা বরাবরই ভ্রমণপ্রিয়। নদী, পাহাড়, সমুদ্র—আমাদের কাছে সবই একেকটি প্রেমের নাম। ছাত্রাবস্থায় ২০০০ সালে ভারত–নেপাল স্টাডি ট্যুর, তারপর আবার ২০০৭ সালে অফিস ট্যুরে পোখরা। আর এবার ২০২৬—পরিবারসহ সেই শহরে ফেরা।
ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহে কাঠমান্ডু থেকে যাত্রা শুরু হতেই শুরু হলো অদ্ভুত এক রোমাঞ্চ। পাহাড়ি রাস্তার প্রতিটি বাঁক যেন নিজে নিজেই নতুন কোনো দৃশ্য আঁকছিল—কখনো নিচে গভীর খাদ আর তার বুকে ছুটে চলা পাহাড়ি নদী, আবার কখনো মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা সবুজ পাহাড়। রাস্তাজুড়ে ছড়িয়ে ছোট্ট দোকান—পাহাড়ি চা, গরম মোমো আর মানুষের সহজ-সরল হাসি সেই পথকে আরও উষ্ণ করে তুলছিল।
গাড়িচালক হেসে ভাঙা বাংলায় বলল, স্যার, পোখরা যেতে যেতে পাহাড়ের রং অনেকবার বদলায়। চোখ বন্ধ করবেন না। তার কথা সত্য—এ পথে ঘুমানো মানেই অর্ধেক সৌন্দর্য হারানো।
কাঠমান্ডু থেকে প্রায় ১৪০ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করে মনকামনা নামক স্থান দর্শন ও দুপুরের খাবারের বিরতি পেলাম। মনকামনা নেপালের গোর্খা জেলার একটি বিখ্যাত হিন্দু মন্দির, যার নাম মনোকামনা মন্দির। এই মন্দিরে দেবীর কাছে নিজের মনস্কামনা বা ইচ্ছা পূরণের জন্য প্রার্থনা করা হয়। মন্দিরটি পাহাড়ের উপরে অবস্থিত এবং এখানে পৌঁছানোর জন্য কেবল কারের ব্যবস্থা আছে। এটি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১ হাজার ৩০০ মিটার উপরে অবস্থিত। সনাতন মতে বিশ্বাস করা হয় যে মনোকামনা দেবী ভক্তদের মনের ইচ্ছা পূরণ করেন। এটি নেপালের অন্যতম পবিত্র স্থান এবং এখানে প্রতি বছর নবরাত্রি বা দুর্গাপূজা এবং নাগপঞ্চমীতে প্রচুর ভক্তসমাগম হয়। সার্ক দেশের অধিবাসীদের জন্য কেবল কার ভাড়া জনপ্রতি ১০ মার্কিন ডলার। মনকামনায় রাতযাপনের জন্য হোটেল আছে।
মন্দির দর্শন করে আমরা দুপুরের খাবারে নেপালি মাটন থালি খেলাম। বিভিন্ন সবজি, পাপড়, ডাল, রুটি, মাটন আর গরম ধোঁয়া ওঠা ভাতের সমন্বয়ে খাবারটি বেশ উপভোগ্য ছিল। শেষে গরম ধোঁয়ায়িত দুধ চা খেয়ে আমরা রোপওয়ের দিকে রওনা হলাম। থালির মূল্য ছিল ৪৫০–৫০০ রুপি।
রোপওয়েতে যেতে যেতে দেখা হলো ত্রিশুলী নদী, যা নেপালের একটি প্রধান নদী এবং গোসাইকুণ্ড হ্রদ থেকে উৎপন্ন হয়েছে। দ্রুত ও তীব্র স্রোতের জন্য এটি হোয়াইট ওয়াটার রাফটিং ও কায়াকিংয়ের একটি জনপ্রিয় স্থান। এটি নেপালের চারটি জেলার (রাসুওয়া, নুওয়াকোট, ধাদিং ও চিতওয়ান) জলের একটি প্রধান উৎস।
পোখরায় আগমন: ‘শান্তির শহর’
সবুজের সমারোহের মধ্যে কখন যে পোখরায় পৌঁছে গেছি, বুঝতেই পারিনি। মসৃণ রাস্তা আর পাহাড়ঘেরা পরিবেশ একঝাঁক ঠান্ডা বাতাস দিয়ে যেন আমাদের স্বাগত জানাল। এখানে নেই অকারণ ভিড়, নেই কোলাহল—শুধুই আনন্দের এক শিল্পিত ছন্দ।
পোখরায় আমাদের হোটেল ছিল লেকপাড়ে।
হোটেলে চেক-ইন করে সোজা চলে গেলাম ফেওয়া লেকের দিকে। বিকেলের সূর্যের আলো লেকের জলে পড়ার সেই মুহূর্ত—অবর্ণনীয়। দূরে সবুজ পাহাড়, তার গায়ে ধোঁয়ার মতো মেঘ, আর নিস্তরঙ্গ জলে নীল আকাশের প্রতিফলন—মনে হচ্ছিল প্রকৃতির সবচেয়ে শান্ত ছবির সামনে দাঁড়িয়ে আছি। রাতে আমরা পুনরায় মাটন থালি খেলাম—একই রকম গরম খাবার, মূল্য ৪৫০–৫০০ রুপি।
ফেওয়া লেক: ‘এ যেন প্রকৃতির আয়না’
ফেওয়া লেক যদিও প্রাকৃতিক ঝর্ণার জল দিয়ে তৈরি, তবে বাঁধ দিয়ে ধরে রাখা হয়েছে। নেপালের দ্বিতীয় বৃহত্তম এই হ্রদের উচ্চতা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৭৪২ মিটার। আয়তন ৫.২৩ বর্গকিলোমিটার, গড় গভীরতা ৮.৬ মিটার এবং সর্বোচ্চ গভীরতা ২৪ মিটার। উত্তরে ২৮ কিলোমিটার দূরে দাঁড়িয়ে আছে অন্নপূর্ণা পর্বতশ্রেণী—হ্রদের জলে যার প্রতিবিম্ব দেখলে মনে হয় প্রকৃতি নিজেই ছবি এঁকেছে।
দ্বিতীয় দিন সকলে নাশতা শেষ করে আবার গেলাম লেকের ধারে। নিস্তব্ধতা এমন যে মনে হচ্ছিল পাহাড়, জল আর বাতাস একই সুরে মগ্ন।
হঠাৎ গাইড বলল—
“স্যার, ওটা দেখুন… মাচাপুচ্ছে পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে!”
দূরে দাঁড়িয়ে ফিশ টেইল মাউন্টেন—মাচাপুচ্ছে। সোনালি আলো তার তীক্ষ্ণ চূড়ায় ঝিলমিল করছে—পাহাড় যেন লজ্জায় মাথা নত করেছে। এমন দৃশ্য মানুষকে বাকরুদ্ধ করে দেয়।
নৌকায় চড়তেই অনুভব করলাম অন্য এক জগত। হালকা ঠান্ডা বাতাসের দোল, জলে সূর্যের রুপালি প্রতিফলন—মনে হচ্ছিল সময়ের বাইরে ভেসে চলেছি।
ফেওয়া লেকের মাঝের ছোট দ্বীপে বরাহী মন্দির—শান্ত, ধূপসুগন্ধে ভরা, ঘণ্টাধ্বনিতে পূর্ণ। মনে হচ্ছিল কোনো সাধনার প্রাচীন স্থানে দাঁড়িয়ে আছি। লেকের মাঝে অবস্থিত মন্দিরটি অসাধারণ সৌন্দর্যমণ্ডিত।
ওয়ার্ল্ড পিস প্যাগোডা: উচ্চতায় শান্তি
লেকের ওপর থেকে পাহাড়ি পথ ধরে উঠে গেলাম ওয়ার্ল্ড পিস প্যাগোডায়। উপর থেকে দেখা যায়—নিচে পুরো পোখরা শহর, নীলাভ ফেওয়া লেক, আর দূরে অন্নপূর্ণা, ধৌলাগিরি ও মাচাপুচ্ছে—সবকিছু যেন সাদা তুলোর মেঘের আস্তরণে মোড়া।
সেই মুহূর্তে মনে হয়েছিল—
“প্রকৃতির সঙ্গে মিলেমিশে থাকাই মানুষের সবচেয়ে সত্য নীরব প্রার্থনা।”
ডেভিস ফলস ও গুপ্টেশ্বর গুহা: প্রকৃতির রহস্য
ডেভিস ফলসের গর্জন প্রথমেই মন কাড়ে। উঁচু থেকে ঝাঁপিয়ে পড়া জল সোজা গভীর গহ্বরে হারিয়ে যায়। স্থানীয়রা একে ‘পাতালে চাঙ্গো’ বলেন—অর্থাৎ পাতালের জলপ্রপাত। প্রায় ১৫০ মিটার দীর্ঘ এই সুড়ঙ্গ ভূপৃষ্ঠের প্রায় ৩০ মিটার নিচে নেমে গেছে। ১৯৬১ সালে এক সুইস পর্যটক নারীর দুর্ঘটনার স্মৃতি আজও এই জলপ্রপাতকে রহস্যময় করে রেখেছে। তার পাশেই গুপ্টেশ্বর গুহা—অন্ধকার ও রহস্যে ভরা। শেষ প্রান্তে গিয়ে দেখা মেলে ডেভিস ফলসের নিম্নাংশ—যেন পৃথিবীর লুকানো সৌন্দর্য। ডেভিস ফলসে প্রবেশমূল্য নেপালি ৫০ রুপি এবং গুপ্টেশ্বর গুহায় ১০০ রুপি।
পুমডিকোট: পাহাড়চূড়ায় বিশাল শিবমূর্তি
পোখরার কাছে পুমডিকোট। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১ হাজার ৫০০ মিটার উঁচুতে নেপালের দ্বিতীয় বৃহত্তম শিবমূর্তি—৫১ ফুট উচ্চতা, নিচে সাদা স্তূপসহ মোট উচ্চতা ১০৮ ফুট। চারদিকে ১০৮টি শিবলিঙ্গ—এক অনন্য ধর্মীয় আবহ। এখান থেকে পোখরা উপত্যকা, ফেওয়া লেক ও অন্নপূর্ণা পর্বতশ্রেণী স্পষ্ট দেখা যায়।
সারাংকোটের সূর্যোদয়: ‘জীবনের সেরা সকাল’
তৃতীয় দিন ভোর চারটায় আমরা সারাংকোটের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করলাম। ঠান্ডা বাতাস শরীর কাঁপিয়ে দিলেও হৃদয়ের উত্তেজনা অটুট। চূড়ায় দাঁড়িয়ে সূর্যের প্রথম আলো যখন অন্নপূর্ণা ও ধৌলাগিরির গায়ে পড়ল, মনে হলো পৃথিবী যেন নতুন করে জন্ম নিল। নীরবতায় শুধু প্রকৃতির নিশ্বাস শোনা যাচ্ছিল।
আমি নীরবে ভাবছিলাম—
এই মুহূর্তটির জন্যই মানুষ বাঁচে।
রাতের পোখরা: ‘লেকসাইডের রঙিন জীবন’
রাতে পোখরা যেন সম্পূর্ণ অন্য শহর।
লেকসাইডে আলো, সঙ্গীত, মানুষের হাসি আর পাহাড়ি খাবারের গন্ধ—সব মিলিয়ে উজ্জ্বল এক রাত। লেকের ধারে বসে গরম দুধ চা ও থুকপা, মোমো খেতে খেতে মনে হচ্ছিল—এই শহর মানুষকে থামতে শেখায়, ধীরে চলতে শেখায়।
বিদায়—’কিন্তু অপার মুগ্ধতা রয়ে গেল’
পোখরা ছেড়ে আসার সময় মনে হচ্ছিল যেন কিছু ফেলে যাচ্ছি। এই শহরের নীরবতা, শান্ত হাওয়া, হ্রদের প্রতিচ্ছবি, পাহাড়ের রঙ বদলে যাওয়া—সব মনে গেঁথে গেল।
পৃথিবীতে এমন কিছু জায়গা আছে, যেগুলো কেবল চোখে দেখা যায় না—অনুভব করতে হয়। পোখরা ঠিক তেমনই।
এ শহর আমাকে শিখিয়েছে—
সৌন্দর্য মানে শুধু দেখা নয়; সৌন্দর্য মানে হৃদয়ের শান্তি। যেখানে প্রকৃতি ও মানুষের মিলন ঘটে, যেখানে আলো–ছায়ার সুরে আত্মা স্ফূর্ত হয়—সেখানেই পাওয়া যায় প্রকৃত প্রশান্তি।








