গত বছর নভেম্বরের পর আবারও ব্যাংক থেকে টাকা তুলে বাড়িতে বা নিজের কাছে রাখার প্রবণতা বেড়েছে। এই টাকা নিজের কাছে রাখতে সিন্দুকের চাহিদা বেড়েছে বহুগুণে। এই খাত সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা বলছেন, গত এক দশকের তুলনায় বর্তমানে সিন্দুকের চাহিদা বেড়েছে প্রায় দ্বিগুণ। তবে ম্যানুয়াল থেকে ডিজিটাল সিন্দুকের চাহিদা বেশি।
আগে কেবল ব্যাংক-বীমা ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে সিন্দুকের ব্যবহার থাকলেও এখন বাসা-বাড়ির জন্য সিন্দুক কিনছেন মানুষ। বিশ্লেষকরা বলছেন: অবৈধ টাকা গোপন রাখতে স্বভাবজাত প্রবণতার অংশ হিসেবে মানুষ টাকা রাখে গোপন জায়গায়। সেই বিবেচনায় সিন্দুকের ব্যবহার বেড়েছে।
বংশালের সিন্দুক ব্যবসায়ী রহমত আলী বলছেন: মুঘল আমল থেকে এ জনপদে সিন্দুকের ব্যবহার হয়ে আসছে। বনেদী পরিবার এবং কিছু ব্যবসা প্রতিষ্ঠা এসব সিন্দুক রাখতো। ক্রেতার অর্ডার অনুযায়ী আমরা সিন্দুক তৈরি করি।সিন্দুক বিক্রির কোনও মৌসুম নেই। সাধারণত সোনা ব্যবসায়ী ও বিভিন্ন এজেন্ট ব্যাংক আমাদের কাছ থেকে সিন্দুক কেনে। বর্তমানে সাধারণ মানুষও বাসা-বাড়িতে সিন্দুক ব্যবহার শুরু করেছে। গত ৩৫ বছর ধরে আমরা ব্যবসা করছি। সবসময়ই লকার, সিন্দুক বিক্রি হয়। ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষ সবাই কিনছে। এখন মানুষ বাসা বাড়ির জন্য বেশি সিন্দুক ও লকার কিনছে।
সিন্দুকের সঠিক পরিসংখ্যান পাওয়া না গেলেও ব্যবসায়ী বলছেন: গত বিশ বছরের মধ্যে শেষ দশ বছরে সিন্দুকের বেচাকেনা বেড়েছে দ্বিগুণ। আর শেষ পাঁচ বছরে সবচেয়ে বেশি বেড়েছে ডিজিটাল সিন্দুকের চাহিদা।
সিন্দুকের ব্যবসা সম্পর্কে খোঁজ খবর নিতে গিয়ে আমরা জানতে পেরেছি ম্যানুয়াল সিন্দুক সাধারণত দেশেই তৈরী হয়। এগুলোর বাজার মূল্য পাঁচ হাজার থেকে এক লাখ টাকা পর্যন্ত। আর ডিজিটাল সিন্দুকগুলো আসছে মূলত চীন থেকে। এছাড়া জার্মানি-ফ্রান্স থেকেও কিছু কিছু সিন্দুক এসে থাকে। এগুলোর দাম হয়ে থাকে সর্বনিম্ন ৫০ হাজার থেকে সর্বোচ্চ ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত।
একটা সময় শুধুমাত্র রাজধানীর বংশালে সিন্দুকের বেচাকেনা থাকলেও এখন ঢাকার কলাবাগান-উত্তরাসহ চট্টগ্রাম-সিলেটের মত বড় বড় শহরগুলোতে গড়ে উঠেছে সিন্দুকের বড় বড় দোকান।
পার্সনাল সিন্দুক বা লকারে টাকা রাখার প্রবণতা প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহম্মেদ বলেন: এটা কোনভাবেই উন্নতির লক্ষণ নয়। অনেকেই দুর্নীতি করে অর্থ উপার্জন করছেন। এই টাকা তারা ব্যাংকে রাখতে পারছেন না। তারা এই টাকা বাসায় সিন্দুকে হোক, লকারে হোক রাখছে। ব্যাংকে টাকা রাখলে এই টাকা একটা হিসাবায়নের মধ্যে পড়বে।
সিন্দুকে রাখা টাকা অবৈধ নাও হতে পারে। তবে সুনিদৃষ্ট তথ্য থাকলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন দুর্নীতি দমন কমিশনের চেয়ারম্যান মঈনউদ্দীন আবদুল্লাহ। তিনি বলছেন: সবাই যে অবৈধ টাকা বাসার সিন্দুকে বা লকারে রাখছেন এটা সব সময় ঠিক নাও হতে পারে। তবে এই টাকার উৎস কী এটা জানার চেষ্টা করা যেতে পারে। এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোন তথ্য থাকলে দুদক ব্যবস্থা নেবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে ২০২২ সালের মে থেকে ২০২৩ সালের মে পর্যন্ত মানুষের হাতে নগদ অর্থ বেড়েছে ১৪ শতাংশ।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন: দুর্নীতির টাকা সব সময় নগদ অর্থে হয়। এই টাকার হিসাব থাকে না আয়কর ফাইলে। তাই টাকাগুলো ব্যাংকে রাখলে নানা রকম জবাবদিহিতার মধ্যে পড়ার সম্ভাবনা থাকে। তাই মানুষ এই টাকা বাসায় রাখতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। আর এই টাকাগুলোই দেশের বাইরে পাচার হয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের আরেক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, গত অক্টোবর মাসে ব্যাংকের বাইরে থাকা টাকার পরিমাণ ছিল ২ লাখ ৪৫ হাজার ৯৪৩ কোটি টাকা, যা নভেম্বরে বেড়ে হয় ২ লাখ ৪৮ হাজার ৪৪১ কোটি টাকা।







