তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ও আমরাই পারি পারিবারিক নির্যাতন জোটের সভাপতি সুলতানা কামাল বলেছেন, রাষ্ট্রের কাউকে প্রান্তিক, ক্ষুদ্র বলার অধিকার নেই। কারণ রাষ্ট্র মানুষকে সৃষ্টি করে না। মানুষই রাষ্ট্রকে সৃষ্টি করে।
মঙ্গলবার বিকেলে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে প্রান্তিকের ঐক্য, প্রান্তিকের অধিকার বিষয়ক জাতীয় সম্মেলন-২০২৫ এর সমাপনী অনুষ্ঠানে তিনি এ কথা বলেন।
১৬ দিনের কর্মসূচি উপলক্ষে সারা দেশে বিভিন্ন উন্নয়ন সংগঠনসমূহ বিভিন্ন কার্যক্রম পালন করছে। এরই অংশ হিসেবে মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন, আমরাই পারি ও ক্রিশ্চিয়ানএইড যৌথভাবে সারা দিনব্যাপী এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে।
ক্রিশ্চিয়ান এইডের কান্ট্রি ডিরেক্টর নুজহাত জাবিনের সঞ্চালনায় সমাপনী অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক শাহীন আনাম। অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন সমাজসেবা অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক মো. সাজ্জাদুল ইসলাম, ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রোগ্রাম ম্যানেজার লায়লা জেসমিন বানু, আমরাই পারি-এর প্রধান নির্বাহী জিনাত আরা হক, ইউল্যাব অ্যাডজাংক ফ্যাকাল্টির অবন্তী হারুন ও জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক শাহানাজ মুন্নী।
এ আয়োজনে সারাদেশের ৪০টি নাগরিক সংগঠনের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। সমাপনী অধিবেশনে প্রান্তিক মানুষের অধিকার আদায়ে একটি ঘোষণাপত্র উপস্থাপনও করা হয়।
সাবেক উপদেষ্টা বলেন, বাংলাদেশের জন্মই হয়েছিল বৈষম্য নির্মূল করার জন্য এবং মানুষের সমান অধিকার বাস্তবায়নের জন্য। প্রতিটি মানুষ নিজের কথা নিজের ভাষায় বলবেন।
সুলতানা কামাল বলেন, সরকার ও রাজনৈতিক দল শুধু সংবিধান অনুযায়ী মানুষকে সেবা করতে পারে অনধিকার চর্চা না। অধিকারের সঙ্গে সঙ্গে মর্যাদার বিষয়টিও খেয়াল রাখতে হবে।
তিনি বলেন, পরিবর্তন পরিবার থেকে শুরু করতে হবে এরপর সমাজ ও সংস্কৃতির মাধ্যমে পরিবর্তন করতে হবে। যারা অধিকার চায় শুধু তারাই নয়, যারা অধিকার বাস্তবায়নের দায়িত্বে রয়েছেন বা দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন তাদেরও সচেতন করতে হবে। যেন তারা সঠিকভাবে তাদের দায়িত্ব পালন করতে পারেন।
শাহীন আনাম বলেন, প্রান্তিক জনগোষ্ঠী আসলে পিছিয়ে নেই, আমরাই তাদের পিছিয়ে রেখেছি।
অবন্তি হারুন বলেন, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সংজ্ঞায়নের ক্ষেত্রে সব প্রান্তিকের বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি। প্রতিবন্ধীদের সংজ্ঞায়নের ক্ষেত্রে শারীরিক বিষয়ের সঙ্গেও মানসিক বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য শুধু পলিসি তৈরি নয়, পলিসি বাস্তবায়ন ঠিক মত হচ্ছে কিনা তা নিবিড় মনিটরিংয়ের মধ্যে রাখতে হবে।
তিনি বলেন, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মানুষেরা যদি মর্যাদাপূর্ণ জীবন-যাপন করতে চান, সেক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদে মূল ধারায় যাওয়ার জন্য একটি রোডম্যাপ থাকতে হবে। নির্বাচনকে সামনে রেখে সব রাজনৈতিক দলের কাছে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর দাবিসমূহ দৃঢ়ভাবে তুলে ধরতে হবে।
শাহানাজ মুন্নী বলেন, এ সম্মেলনে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর উন্নয়নের জন্য যেসব সুপারিশ এসেছে, সেগুলো খুব দ্রুত বাস্তবায়ন করা দরকার। সাম্যের বাংলাদেশ গড়ার জন্য সব বৈচিত্র্যের জনগোষ্ঠীকে গ্রহণ করতে হবে। যখন প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মানুষেরা নিজেদের কথা নিজেরা বলতে পারবে এবং যথাযথ কর্তৃপক্ষকে জবাবদিহিতার আওতায় আনতে পারবে তখনই পরিবর্তন আসবে।
অনুষ্ঠানে মো. সাজ্জাদুল ইসলাম বলেন, এ পর্যন্ত ৩৬ লাখ প্রতিবন্ধী সনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে। যা আন্তর্জাতিক সমীক্ষা অনুযায়ী ১ কোটি ৭০ লাখ হওয়ার কথা। প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর (প্রতিবন্ধী, ট্রান্সজেন্ডার, দলিত, আদিবাসী) সংজ্ঞা নিরূপণ করা একটি চ্যালেঞ্জ। প্রতিবন্ধী কল্যাণ আইন এখন প্রতিবন্ধী অধিকার আইন হয়েছে। জনগণকে সমাজ কল্যাণের সেবা দেওয়ার ক্ষেত্রে বর্তমানে ২ হাজার ৭০০ জনকে সেবা দেওয়ার জন্য মাত্র একজন সমাজকর্মী রয়েছেন। যা পূর্বে ছিল ৩০ জনের বিপরীতে একজন সমাজকর্মী।
জিনাত আরা হক সমাপনী বক্তব্যে বলেন, এ সম্মেলনের সব সুপারিশ সরকারের কাছে পৌঁছে দিতে হবে । প্রান্তিক মানুষের হয়ে কথা বলতে হবে।
মুক্ত আলোচনায় বলা হয়, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সহায়তার বিষয়টি শুধু সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ে না রেখে সব মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে করা যায় কী না, সেটা ভেবে দেখা প্রয়োজন। ৫০ বছরের বেশি বয়সের দলিত নাগরিকদের একটি বিশেষ ভাতার ব্যবস্থা রয়েছে। যা সরকারিভাবে প্রচার নেই। হিজড়া জনগোষ্ঠী, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি ও নারী গৃহকর্মীদের সঠিক পরিসংখ্যান নেই। এ ক্ষেত্রে বিবিএস-এর মাধ্যমে সঠিক ডাটাবেজ তৈরি করা জরুরি।








