রাজধানীর বসিলার বাসিন্দা মাহামুদ আলী। পৈত্রিক জমিতে ঘর তুলে পরিবারের ৭ সদস্য নিয়ে বসবাস তার। কথা হচ্ছিল তার সঙ্গে। জানালেন, আগের বছরগুলোতে ফ্যান চালিয়ে গরম সামাল দেওয়া গেলেও এ বছর তেমনটা হচ্ছে না। বলছেন, এখন ফ্যান চালালে গরম বাতাসে আরও বেশি কষ্ট হয়। এই গরম থেকে বাঁচতে এখন বাসায় এয়ার কন্ডিশনার (এসি) লাগানোর চিন্তা করছেন তিনি। কিন্তু এই বাড়তি খরচের জোগাড় কিভাবে করবেন এ নিয়ে তার কপালে চিন্তার ভাঁজ। সঞ্চয় ভেঙে হলেও এসি কেনার বিকল্প নেই বলে আমাদের জানান মাহামুদ আলী।
এমন পরিস্থিতি শুধু মাহামুদ আলীর না। এক সময়ের বিলাসী পণ্য হিসেবে বিবেচিত এসি- এয়ার কুলারের মতো পণ্য এখন নাম লিখিয়েছে জরুরী পণ্যের খাতায়। তাই মধ্যবিত্তরা তাদের সাধ্য মতো পুঁজি ভেঙে কিনছেন এসি-রুম কুলার। যার সাধ্যে কুলাচ্ছে না তিনি বাসার জন্য নতুন ফ্যান কিনছেন। আর সেটাও যার সম্ভব হচ্ছে না তারা পুরাতন ফ্যান নিয়ে ছুটছেন মেকানিকের দোকানে, এই গরমে একটুকু বাতাসের আশায়।
রাজধানীসহ সারাদেশে চলছে তীব্র তাপদাহ। তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রির আশপাশে ওঠানামা করছে। এমন পরিস্থিতিতে শুধু দিনে নয় রাতেও ঘুমানো দুঃসহ হয়ে দাঁড়িয়েছে। গরমের সঙ্গে সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে এসি-রুম কুলার-ফ্যানসহ শরীরকে ঠাণ্ডা রাখার নানা উপকরণের দাম। সপ্তাহ ব্যবধানে এসি টনে বেড়েছে ৩ থেকে ৫ হাজার টাকা। ফ্যানে বেড়েছে ৪শ’ থেকে ১ হাজার টাকা পর্যন্ত।
রাজধানীর এলিফ্যান্ড রোড, গুলিস্তান স্টেডিয়াম মার্কেট, পল্টনসহ রাজধানীর বিভিন্ন ইলেক্ট্রনিক্স পণ্যের মার্কেট ঘুরে এ তথ্য পাওয়া গেছে।
কবির হোসেন মিরপুর থেকে এসি কিনতে এসেছেন গুলিস্তানের স্টেডিয়াম মার্কেটে, দামে একটু কম পাওয়ার আশায়। তিনি জানান: গরমে অসহ্য হয়ে পড়েছি। ফ্যানের বাতাসে কাজ হয় না। এসিটা খুবই প্রয়োজন। মধ্যবিত্ত আমাদের মতো লোকেদের সমস্যাই সব থেকে বেশি। আমরা এদিকেও যেতে পারছি না, ওদিকেও যেতে পারছি না। ফ্যান ২৪ ঘণ্টা চলছে, কোন লাভ হচ্ছে না। শেষ পর্যন্ত এসি কিনতে এসেছি। দুই সপ্তাহ আগে যে এসি ৪৫ থেকে ৫২ হাজারের মধ্যে পাওয়া যেত এখন সেটা ৬০ হাজার টাকার বেশি। ভাবছি, এখান থেকে কিনতে না পারলে পুরাতন মার্কেট থেকে ১৮-২০ হাজার টাকার মধ্যে একটা এসি কিনে নেবো।
ইশতিয়াক আলম নামের এক ইলেক্ট্রনিক্স ব্যবসায়ী, বলছেন: গত মাসের শুরুতে যে এসির দাম ৩৫ হাজার ছিল, ১৫-২০ দিনের ব্যবধানে দাম বেড়ে হয়েছে ৩৮ হাজার টাকা। বাধ্য হয়ে ক্রেতারা বেশি দামে কিনছেন। অতিরিক্ত চাহিদা মেটাতে গিয়ে পণ্য পর্যাপ্ত থাকছে না। ফলে কিছুসংখ্যক ক্রেতা ফেরতও যাচ্ছেন। ডলার সঙ্কটের কারণে সঠিক সময়ে শিপমেন্টও আসছে না। ডিলার পর্যায়ে দাম বেড়েছে। তাই বাড়তি দাম না রেখে উপায় নেই। সরবরাহ নেইসহ নানা অজুহাতে ডিলাররা দাম বাড়াচ্ছেন। চাহিদা এতো যে সরবরাহ ব্যবস্থা ঠিক রাখাই কষ্টকর হয়ে যাচ্ছে।
তথ্য বলছে: সারাদেশে প্রতিবছর ৫ হাজার কোটি টাকার এসি বিক্রি হয়। এপ্রিল, মে, জুন এই তিন মাসে এসি বিক্রি সর্বোচ্চ থাকে। সারাদেশে বিক্রিত এসির ৯০ শতাংশই বিক্রি হয় বছরের এ সময়টাতে। এসি ব্যবসার সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চলতি বছর এসির চাহিদা ৩০ শতাংশ বেড়েছে। যার যোগান দিতে হিমশিম খাচ্ছে প্রস্তুতকারী কোম্পানিগুলো। দেশের বাজারে প্রতিবছর বাসাবাড়ির জন্য ৫ লাখ এসির প্রয়োজন হয়ে থাকে। এ বছর সেটি ৬ লাখ ছুঁতে পারে।
গরমের এ অর্থনীতিতে খরচ বেড়েছে সব শ্রেণীর মানুষের। যার প্রভাব পড়ছে ব্যাংকের তারল্য থেকে শুরু করে সার্বিক অর্থনীতিতে। এ প্রসঙ্গে বিশিষ্ট অর্থনীতিবীদ ড. মাহফুজ কবীর বলছেন: গরমের কারণে মধ্যবিত্ত-নিম্নবিত্তের জীবনযাপনের ব্যয় বেড়ে গেছে। সঙ্গে যোগ হয়েছে মূল্যস্ফীতি। এতে করে তাদের প্রকৃত আয় কমে যাচ্ছে। ব্যাংকে সঞ্চয় করে মূলত মধ্যবিত্তরা। তাদের যখন সঞ্চয় কমে যায়, তখন জাতীয় সঞ্চয় কমে যায়। ব্যাংক এমনিতে তারল্য সঙ্কটের মধ্যে আছে। এর মঝে যদি সঞ্চয় কমে যায় তাহলে তার অবশ্যই নেতিবাচক প্রভাব রয়েছে।








