যুদ্ধ, অর্থনীতি, বাণিজ্যসহ নানা ক্ষেত্রে অত্যন্ত সঙ্কটময় সময় পার করছে পুরো বিশ্ব। ঠিক এই পরিস্থিতিতে ইরানি প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম রাইসির আকস্মিক মৃত্যুর ঘটনায় বিশ্ব রাজনীতিকে ঘিরে তৈরি হচ্ছে নানা প্রশ্ন।
২০২১ সালে ইরানের ক্ষমতায় আসেন ইব্রাহিম রাইসি। এরপর থেকেই বিভিন্ন আন্তর্জাতিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয় তার সরকার। ভিন্ন ভিন্ন কৌশলে এই ধরণের চ্যালেঞ্জে মোকাবিলা করে ইরানকে নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন রাইসি। তার মৃত্যুতে ইরান এবং এর প্রতিবেশী দেশগুলোসহ পশ্চিমা বিশ্বের রাজনীতিতে প্রভাব পড়তে চলেছে।
ইরান পরিস্থিতি
ইরানে রাষ্ট্রের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি। ইরানের পারমাণবিক প্রকল্প ও পররাষ্ট্রনীতির বিষয়ে সর্বোচ্চ সিদ্ধান্ত খামেনির কাছ থেকেই আসে। এরপরই ক্ষমতায় ছিলেন প্রেসিডেন্ট রাইসি। তার মৃত্যুতে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা খামেনি দেশবাসীর উদ্দেশে বলেছেন, এই ঘটনায় রাষ্ট্র পরিচালনার কাজে কোন ধরনের ব্যাঘাত ঘটবে না।
ইসরায়েল-ইরানের সম্পর্ক
ইসরায়েল এবং ইরানের মধ্যে বহুদিন ধরেই বৈরি সম্পর্ক বিদ্যমান। যা গত মাসে সিরিয়ার দামেস্কে ইরানের কন্স্যুলেট ভবনে ইসরায়েলের হামলার ঘটনার মাধ্যমে প্রকাশ্যে আসে। তবে প্রেসিডেন্ট রাইসির কৌশলগত সিদ্ধান্তের কারণে ২ দেশের পাল্টাপাল্টিভাবে বিচ্ছিন্ন কিছু হামলার ঘটনা ঘটলেও তা যুদ্ধে পরিণত হয়নি। তবে তার মৃত্যুতে ২ দেশের বৈরি সম্পর্কে নতুন কোন প্রভাব সৃষ্টির আশঙ্কা আছে।
মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতি
মধ্যপ্রাচ্য বিশেষ করে গাজায় চলমান সংঘাতকে কেন্দ্র করে ফিলিস্তিনি স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাস, লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ, ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের পরোক্ষভাবে সমর্থন দিয়ে চলেছে ইরান। এই বিদ্রোহীগোষ্ঠীগুলোও পরক্ষ সমর্থন দিয়ে আসছে ইরানকে। গেল বছরের শুরুতে সৌদি আরব-ইরানের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনঃপ্রতিষ্ঠার চুক্তির মধ্য দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে নতুন যুগের সূচনা করে ইরান। এসময় ইরানের ক্ষমতায় ছিলেন রাইসি। তাই তার মৃত্যুতে গাজা পরিস্থিতিসহ মধ্যপ্রাচ্যে বিশৃঙ্খলা দেখা যেতে পারে।
অর্থনীতিতে প্রভাব
ইরানের অর্থনীতিতে তেল এবং গ্যাসের রপ্তানি একটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে। যা মধ্যপ্রাচ্যের অন্য দেশগুলোর জন্যও প্রযোজ্য। বিশ্বের প্রায় ৫০ ভাগ বাণিজ্য হয় ইরানের হরমুজ প্রণালি দিয়ে। যুদ্ধ বা রাজনৈতিক কারণে ইরান এই প্রণালি বন্ধ করে দিলে তার নেতিবাচক প্রভাব বিশ্বে অর্থনীতিতেও পড়বে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়া
ইরান পারমাণবিক দিকে থেকে শক্তিশালী হওয়ার পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সম্পর্কে অবনতি দেখা গেছে। গাজা-ইসরায়েল যুদ্ধকে কেন্দ্র করে এই সম্পর্ক আরও খারাপের দিকে যেতে থাকে। ইরানের ওপর একের পর এক নিষেধাজ্ঞা দিতে থেকে যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা জোট। এই আঞ্চলিক হামলাকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা এড়ানোর জন্য ইরানের কর্মকর্তাদের সঙ্গে পরোক্ষ আলোচনায় লিপ্ত ছিলেন বাইডেন প্রশাসনের কর্মকর্তারা। কিন্তু এখন রাইসির মৃত্যুতে ওই অঞ্চল আবার অস্থিতিশীল হয়ে উঠার আশঙ্কা আছে। অস্থিতিশীল এই অঞ্চলে শান্তি নিশ্চিত করার দিকে দৃষ্টি দিতে পারে যুক্তরাষ্ট্র।
চীন ও রাশিয়ার সাথে সম্পর্ক
১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর যুক্তরাষ্ট্রকে মধ্যপ্রাচ্য থেকে সরানো, আঞ্চলিক প্রাধান্য বজায় রাখা এবং চীন ও রাশিয়ার সঙ্গে মূল্যবান জোটগুলোকে শক্তিশালী করা সবটাই করেছে ইরান। বেইজিংয়ের সঙ্গে চুক্তি করে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে প্রতি মাসে ইরান কয়েক মিলিয়ন ব্যারেল ক্রুড তেল চীনে বিক্রি করে। ইরান, চীন ও রাশিয়া কেন্দ্রিক মধ্যপ্রাচ্যে যে বলয় সৃষ্টি হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণে তা গুরুত্বপূর্ণ প্রভাবক হয়ে কাজ করছে ইরান। তাই রাইসির পরে ইরানের ক্ষমতায় যিনি আসবেন তিনি এই সম্পর্ককে কতটা এগিয়ে নিতে পারবেন তা নিয়েও তৈরি হয়েছে সংসয়।








