ভারতের ইতিহাসে সবচেয়ে আলোচিত, বিতর্কিত ও আবেগঘন ধর্মীয় স্থাপনাগুলোর একটি ‘বাবরি মসজিদ’। ৫০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে এই মসজিদ ঘিরে তৈরি হয়েছে রাজনৈতিক উত্তাপ, সাম্প্রদায়িক দ্বন্দ্ব, রক্তাক্ত সহিংসতা ও দীর্ঘ আইনি লড়াই। সাম্প্রতিক সময়ে পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদে নতুন করে ‘বাবরি মসজিদ’ নির্মাণের উদ্যোগ আবারও আলোচনার কেন্দ্রে।
১৯৯২ সালের ৬ ডিসেম্বর আসলে কী ঘটেছিল, যে ঘটনার প্রতিধ্বনি আজও দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিকে নাড়িয়ে দেয়?
রাম মন্দিরের উদ্বোধনের পর বাবরি মসজিদের অধ্যায় কি সত্যিই শেষ? নাকি পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদে নতুন করে নির্মিত হতে যাওয়া ‘বাবরি মসজিদ’ সেই পুরনো বিতর্ককে আবারও ফিরে আনছে?
১৫২৮, বাবরি মসজিদের নির্মাণ
১৫২৮ সালে মুঘল সম্রাট জহির উদ্দিন মুহাম্মদ বাবরের সেনাপতি মীর বাকি অযোধ্যার সরযূ নদীর তীরে নির্মাণ করেন একটি বিশাল স্থাপনা। যা পরবর্তীকালে বাবরি মসজিদ নামে পরিচিত হয়। মুঘল স্থাপত্যশৈলীর গৌরবময় নিদর্শন হিসেবে মসজিদটির তিনটি বৃহৎ গম্বুজ, সূক্ষ্ম অলঙ্করণ এবং প্রাকৃতিক শব্দ ও তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের অনন্য নকশা বিশেষভাবে দৃষ্টি আকর্ষণ করে।
মসজিদটি নির্মিত হওয়ার পর দীর্ঘ চার শতাব্দীরও বেশি সময় অযোধ্যার মুসলিম সমাজের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। স্থাপত্যিক সৌন্দর্য, ঐতিহাসিক তাৎপর্য এবং আধ্যাত্মিকতার সমন্বয়ে বাবরি মসজিদ ধীরে ধীরে হয়ে ওঠে এলাকার একটি সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় ঐতিহ্যবাহী প্রতীক।

১৮৫৩ বিরোধের শুরু
১৮৫৩ সালে প্রথমবারের মতো বাবরি মসজিদকে ঘিরে মন্দির–মসজিদ বিরোধ প্রকাশ্যে রূপ নিতে শুরু করে। হিন্দুদের একটি অংশ দাবি তোলে যে অযোধ্যার এই স্থানটিই ভগবান রামের জন্মস্থান। এই দাবি কেন্দ্র করে হিন্দু ও মুসলমানদের মধ্যে উত্তেজনা বাড়তে থাকে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ব্রিটিশ প্রশাসন উভয় সম্প্রদায়ের জন্য উপাসনার স্থান আলাদা করে দেয়, যাতে সংঘাত এড়ানো যায়। তবে এই প্রশাসনিক ব্যবস্থা সাময়িক সমাধান দিলেও বিরোধের মূল কারণ থেকে যায় অমীমাংসিত। নীচে নীচে তীব্রতা জমতে থাকে, যা পরবর্তী সময়ে বড় ধরনের দ্বন্দ্বের ভিত্তি তৈরি করে।
১৯৪৯ থেকে ১৯৮০, দীর্ঘ জটিলতা
১৯৪৯ সালের ২২ ডিসেম্বর গভীর রাতে অযোধ্যার বাবরি মসজিদের ভেতরে হঠাৎই রাম-সীতার মূর্তি দেখা যায়। কে বা কারা এই মূর্তি স্থাপন করেছিল, তা আজও স্পষ্ট নয়। তবে হিন্দু সংগঠনগুলো এই ঘটনাকে ‘অলৌকিক’ বলে ঘোষণা করে এবং সেখানে পূজার দাবি তোলে। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠায় প্রশাসন মসজিদের মূল দরজায় তালা লাগিয়ে দেয় এবং মুসলমানদের প্রবেশ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। এরপর শুরু হয় একের পর এক আইনি লড়াই।
- ১৯৫০ সালে হিন্দু পক্ষ পূজার অধিকার নিশ্চিত করার জন্য মামলা করে।
- ১৯৬১ সালে মুসলিম ওয়াকফ বোর্ড মসজিদের সম্পূর্ণ মালিকানা পুনরুদ্ধারের জন্য আদালতের দ্বারস্থ হয়।
- দীর্ঘ টানাপোড়েনের পর ১৯৮৬ সালে আদালত মসজিদের তালা খুলে হিন্দুদের পূজার অনুমতি দেয়।
এই সিদ্ধান্তের ফলেই বিরোধ নতুন মাত্রা পায় এবং ধীরে ধীরে এটি ধর্মীয় প্রশ্ন থেকে সরে গিয়ে রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়।
১৯৮০ থেকে ১৯৯২ রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে বাবরি মসজিদ
১৯৮০-এর দশকে বাবরি মসজিদ ইস্যুটি সরাসরি ভারতীয় রাজনীতির আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসে। বিশ্ব হিন্দু পরিষদ (ভিএইচপি) এবং ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) মসজিদ ভেঙে রাম জন্মভূমিতে মন্দির নির্মাণের দাবিতে দেশজুড়ে সংগঠন ও জনমত গঠনের প্রচার শুরু করে। ধীরে ধীরে এই দাবি ধর্মীয় অনুভূতির পাশাপাশি রাজনৈতিক শক্তির মাপকাঠিতে পরিণত হয়।
১৯৯০ সালে বিজেপি নেতা লালকৃষ্ণ আদভানীর নেতৃত্বে শুরু হওয়া রথযাত্রা আন্দোলনকে জাতীয় পর্যায়ে প্রবল উত্তেজনার দিকে ঠেলে দেয়। রাজ্য থেকে রাজ্যে ছড়িয়ে পড়া এ যাত্রা বাবরি বিরোধকে এক অভূতপূর্ব রাজনৈতিক জাতীয় আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে আসে। এই সময় থেকেই মসজিদ–মন্দির ইস্যুকে ঘিরে উত্তেজনা তীব্র আকার ধারণ করে, যার পরিণতি ১৯৯২ সালের ইতিহাসবহুল সেই ঘটনার দিকে ধাবিত হতে থাকে।

১৯৯২, ধ্বংসের দিন
১৯৯২ সালের ৬ ডিসেম্বর, ভারতের ইতিহাসে একটি দুঃসময়। অযোধ্যায় জড়ো হয় দেড় লাখেরও বেশি করসেবক বা হিন্দুত্ববাদী স্বেচ্ছাসেবক কর্মী। উত্তেজনা, ধর্মীয় উন্মাদনা এবং রাজনৈতিক বিভাজনের মধ্যেই কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে হিন্দুত্ববাদীরা ষোড়শ শতকে নির্মিত ঐতিহাসিক বাবরি মসজিদ ভেঙে ফেলে।
মসজিদ ধ্বংসের ঘটনার পরপরই ভারতজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা। কয়েক হাজার মানুষ প্রাণ হারায়, যাদের বড় অংশই ছিলেন মুসলমান। দেশের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্ত পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে আগুন, আতঙ্ক ও সহিংসতার ঢেউ। এই সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার অভিঘাত ভারতের প্রতিবেশি দেশগুলোতেও ছড়িয়ে পড়ে।
১৯৯৩ থেকে ২০১৯ আইনি লড়াই
বাবরি মসজিদ ধ্বংসের পর শুরু হয় দীর্ঘ ও জটিল আইনি লড়াই।
- ১৯৯৩ সালে ভারতীয় কেন্দ্রীয় সরকার জমিটি দখল করে। এর পরবর্তী বছরের মধ্যে বহু পক্ষ আদালতে নিজেদের দাবি উপস্থাপন করে।
- ২০১০ সালে এলাহাবাদ হাইকোর্ট ঐতিহাসিক রায়ে জমিটি তিন ভাগে ভাগ করার সিদ্ধান্ত নেয়। রামলালার পক্ষে, নির্মোহী আখড়া এবং সুন্নি ওয়াকফ বোর্ডের পক্ষে ভাগ নির্ধারণ করা হয়। তবে এই রায় স্থায়ী হয় না; পরে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট স্থগিতাদেশ জারি করে।
- দীর্ঘ ১৩৪ বছরের আইনি লড়াই শেষে ২০১৯ সালের ৯ নভেম্বর সুপ্রিম কোর্ট চূড়ান্ত রায় ঘোষণা করে।
রায়ে বলা হয়, বিতর্কিত জায়গায় রাম মন্দির নির্মাণ করা হবে, এবং মুসলমানদের জন্য অন্যত্র পাঁচ একর জমিতে নতুন মসজিদ নির্মাণের ব্যবস্থা করা হবে। এই রায় ভারতের ধর্মীয় ও রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে বিবেচিত হয়।
২০২৪, রাম মন্দির নির্মাণ ও উদ্বোধন
২০২৪ সালে অযোধ্যায় রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় উদ্বোধন করা হয় রাম মন্দির। এটি দাঁড়িয়েছে সেই স্থানে, যেখানে একসময় ছিল ৫০০ বছরের ঐতিহাসিক বাবরি মসজিদ। নতুন মন্দিরটি আধুনিক স্থাপত্যশৈলীর সঙ্গে ঐতিহ্যবাহী কারুকাজে সমৃদ্ধ। দেয়ালজুড়ে খোদাই করা শিল্পকর্ম, দেব-দেবীর প্রতিমূর্তি এবং উজ্জ্বল আলোকসজ্জা পুরো এলাকা উৎসবমুখর করে তোলে। গেরুয়া পতাকা, দোলনায়ক, প্রার্থনার উচ্চারণ। সব মিলিয়ে মন্দিরটি শুধু একটি ধর্মীয় স্থাপনা নয়, বরং ভারতের সাম্প্রদায়িক ইতিহাসের একটি প্রতীকী অধ্যায় হিসেবে দৃশ্যমান হয়।
২০২৫ নতুন বিতর্ক: নতুন করে আবার বাবরি মসজিদ নির্মাণ
বাবরি মসজিদ ধ্বংসের ৩৩ বছর পর, পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ জেলার বেলডাঙায় নতুন মসজিদ নির্মাণের উদ্যোগ আবারও রাজনৈতিক উত্তাপ সৃষ্টি করেছে। এই প্রকল্পের নেতৃত্বে রয়েছেন সদ্য বহিষ্কৃত তৃণমূল কংগ্রেস নেতা হুমায়ুন কবীর।
প্রায় ৩০০ কোটি রূপির ব্যয়ে নির্মাণ পরিকল্পিত এই মসজিদের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয় ৬ ডিসেম্বর, বাবরি ধ্বংসের ঐতিহাসিক দিনে। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন প্রায় ৪০ হাজার মানুষ। স্থানীয় ও অনলাইন অনুদান থেকে ইতিমধ্যেই সংগ্রহ হয়েছে ৯৩ লাখ রুপি, নগদে গণনা করা হয়েছে প্রায় ১ কোটি ১০ লাখ রুপি। এমনকি একজন ব্যবসায়ী ৮০ কোটি রুপি দানের আগ্রহ প্রকাশ করেছেন।
রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়াও তীব্র। বিজেপি ও কংগ্রেস সমালোচনা করেছে, তৃণমূল কংগ্রেস হুমায়ুনকে বহিষ্কার করেছে। এছাড়া হাইকোর্টে পিটিশন দায়ের হলেও আদালত সরাসরি হস্তক্ষেপ না করে রাজ্য সরকারের ওপর পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার দায়িত্ব রেখেছে। হুমায়ুন কবীর দাবি করেছেন, তিন বছরের মধ্যেই নতুন বাবরি মসজিদ নির্মাণ সম্পূর্ণ হবে।
বিতর্কের শুরু যেখানে ১৮৫৩ সালে শুর হলেও ২০২৫ সালে এসেও বাবরি মসজিদ নামটি ইতিহাসের তীব্র আলোচনার বিষয়। ইতিহাস সব সময় অতীতের গল্প নয়; কখনও কখনও তা বর্তমানকেও ঢেলে সাজায়। বাবরি মসজিদের ইতিহাস যেন তারই জীবন্ত উদাহরণ।








