সিনেমা কিংবা সিরিজ দেখতে গিয়ে ভয় পাওয়া নতুন কিছু নয়। হরর ছবিতে অতিপ্রাকৃত দানব বা ক্রাইম থ্রিলারে নিষ্ঠুর খুনিরা সাময়িক আতঙ্ক তৈরি করে। আবার কখনো রোমান্টিক ড্রামা দেখার সময়ও একধরনের ভয় কাজ করে- প্রধান চরিত্রগুলো শেষ পর্যন্ত একসঙ্গে থাকতে পারবে তো?
কিন্তু এসব ভয় সাধারণত ক্ষণস্থায়ী। কোনো দৃশ্য দেখার পর ভয় দীর্ঘ সময় ধরে রয়ে গেছে, এমন সিনেমার নাম বললে হয়তো আপনি একটি দৃশ্যের কথাও মনে করতে পারবেন না। তবে আশ্চর্যজনকভাবে, সেই দীর্ঘস্থায়ী ভয় পাওয়ার অভিজ্ঞতা হবে ‘দ্য হ্যান্ডমেইডস টেল’ দেখার সময়!
প্রকৃত ভয় কী, তা বুঝতে চাইলে এমন একটি সিরিজ দেখুন- যেখানে একটি অগণতান্ত্রিক, ধর্মনির্ভর কর্তৃত্ববাদী রাষ্ট্র পরিকল্পিতভাবে ধর্ষণ ও দাসত্বকে বৈধতা দেয়। আর ঠিক তখনই যদি খবর আসে যে স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা ধ্বংসের পথে এবং রাজনৈতিক ক্ষমতা পাচ্ছে ধর্ম! নিঃসন্দেহে সেটা হবে ভয়াবহ। আসলে এই ভয়ই সিরিজটির পরতে পরতে।
কানাডিয়ান ঔপন্যাসিক ও কবি মার্গারেট অ্যাটউডের পুরস্কারপ্রাপ্ত উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত হুলুর একই নামে ‘দ্য হ্যান্ডমেইডস টেল’ এমন এক ভবিষ্যৎ দেখায়, যেখানে জন্মহার কমে যাওয়ায় সমাজ ভেঙে পড়ে এবং শেষ পর্যন্ত একটি ধর্মভিত্তিক খ্রিস্টান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়। ধর্মগ্রন্থের আক্ষরিক ব্যাখ্যার মাধ্যমে সেখানে প্রতিষ্ঠিত হয় দাসপ্রথা, চরম পিতৃতন্ত্র এবং প্রাতিষ্ঠানিক ধর্ষণ-এর মতো ভয়াবহ বিষয়!
এই দুঃস্বপ্নের কেন্দ্রে আছে অফরেড- একজন হ্যান্ডমেইড (সন্তানদানে সক্ষম নারী), যার একমাত্র কাজ তার ‘কমান্ডার’-এর সন্তান ধারণ করা। এলিজাবেথ মস অভিনীত অফরেডের চোখ দিয়েই দর্শক এই ভয়ংকর পৃথিবীকে দেখে। এই পৃথিবী এতটাই আতঙ্কজনক, কারণ এর ভেতরে বাস্তবতার ছায়া স্পষ্টভাবে ধরা পড়ে।
খুব কম সিরিজই আছে, যেগুলো সবারই দেখা উচিত; ‘দ্য হ্যান্ডমেইডস টেল’ নিঃসন্দেহে তার একটি। প্রথমেই বলতে হয় এর অভিনয়শিল্পীদের কথা। অফরেড চরিত্রে এলিজাবেথ মস অসাধারণ। বিশেষ করে যখন দর্শক তার আগের স্বাধীন জীবনের সঙ্গে পরবর্তী দমন-পীড়নের জীবনের তীব্র পার্থক্য দেখতে পায়! সেরেনা জয় চরিত্রে ইভন স্ট্রাহোভস্কি (ডেক্সটার খ্যাত) একই সঙ্গে নির্মমতা ও দ্বিধা দারুণভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। আর সমিরা ওয়াইলি (অরেঞ্জ ইস দ্য নিউ ব্ল্যাক) মোইরা চরিত্রে এক ধরনের জটিলতা সৃষ্টি করেন, যা দর্শকদের ভাবতে বাধ্য করে!
তবে অভিনয় যতই শক্তিশালী হোক, এই সিরিজের প্রকৃত শক্তি এসেছে বর্তমান যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে এর ভয়ংকর সাদৃশ্য থেকে! অনেকেই বলেন, জর্জ অরওয়েলের বিখ্যাত উপন্যাস ‘১৯৮৪’ বর্তমান সময়কে সবচেয়ে ভালোভাবে ব্যাখ্যা করে। সে যুক্তিতে কিছু সত্যতা থাকলেও, ‘দ্য হ্যান্ডমেইডস টেল’ সমানভাবে কিংবা আরও বেশি আজকের সমাজের প্রতিচ্ছবি।
এই সিরিজে নারীবাদ স্পষ্টভাবে উপস্থিত। এটি এমন এক বিকল্প বাস্তবতা দেখায়, যেখানে প্রো-লাইফ মতবাদ, ধর্ষণ সংস্কৃতি এবং পুরুষতান্ত্রিক ক্ষমতা কাঠামো চরমভাবে বিকশিত হয়েছে। অফরেডের বাস্তবতা আর আমাদের বাস্তবতার পার্থক্য মূলত মাত্রার, নীতিগত দিক থেকে নয়। মূলত নারীর অধিকার হরণ ও কর্তৃত্ববাদী শাসনের ভয়াবহ ভবিষ্যৎ দেখিয়ে গণতন্ত্রের ভঙ্গুরতা তুলে ধরে জনপ্রিয় এই সিরিজ।
তবে এটাও বলা দরকার, ‘দ্য হ্যান্ডমেইডস টেল’ মোটেও সহজে দেখার মতো সিরিজ নয়। এতে সহিংসতা আছে, যদিও অতিরিক্ত গ্রাফিক নয়। প্রতিটি পর্ব মানসিকভাবে ক্লান্তিকর, ফলে একটানা অনেক পর্ব দেখা কঠিন। কিন্তু এই মানসিক চাপই সিরিজটির গুরুত্ব আরো বাড়িয়ে দেয়!
এটি কোনো সুখী গল্প নয়; এখানে শান্তি নেই, স্বস্তি নেই। এটি অন্ধকার, নির্মম ও বিধ্বংসী বাস্তবতার প্রতিফলন। আর সবচেয়ে বড় কথা, এটি ভয় তৈরি করে। তবে সেই ভয় মন্দ কিছু নয়; কারণ কখনো কখনো মানুষকে জাগিয়ে তুলতে একটু ভয়ই যথেষ্ট।- ডিবিকেনিউজ








